বিশেষ প্রতিবেদক
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক ঘোষণায় দেশের সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে (প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত) ভর্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান লটারি পদ্ধতি চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সোমবার (১৬ মার্চ) সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।
আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে এটি কার্যকর হবে।
এর ফলে প্রাথমিক স্তরের শিশুদের ভর্তি প্রক্রিয়ায় আবারও পরীক্ষা-ভিত্তিক মেধা যাচাই ফিরে আসছে, যা ২০১০-এর দশকের শেষভাগ থেকে শিক্ষাবিদদের প্রস্তাবনায় শুরু হওয়া লটারি ব্যবস্থার অবসান ঘটাচ্ছে।
২০১০ থেকে প্রাথমিকের সকল স্তরে লটারি পদ্ধতিতে সকল স্কুলে ভর্তি পদ্ধতি শুরু হলেও করোনা মহামারির সময় ২০২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে মাধ্যমিকের সকল শ্রেনীটে লটারি পদ্ধতি চালু করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রাথমিক স্তরের (বিশেষ করে প্রথম শ্রেণি) শিশুদের ওপর অকাল প্রতিযোগিতামূলক চাপ কমানো।
শিক্ষাবিদরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ৫-৬ বছর বয়সী শিশুরা পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়নের জন্য প্রস্তুত নয়। লটারি সবাইকে সমান সুযোগ দিয়ে কোচিং-বাণিজ্য, অভিভাবকদের টেনশন এবং শিশুদের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করবে।
কিন্তু বাস্তবে এ পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক ছিল—কিছু অভিভাবক মনে করতেন এতে মেধাবী শিশুরা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, আবার কোচিং সেন্টারগুলো গোপনে ‘প্রস্তুতি’ ক্লাস চালিয়ে যাচ্ছিল।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “লটারি কোনো শিক্ষা ব্যবস্থায় থাকতে পারে না। লটারি মেধার মাপকাঠি হতে পারে না।”
তিনি জানান, অংশীজনদের (শিক্ষাবিদ, অভিভাবক, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি) সঙ্গে আলোচনার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভর্তি প্রক্রিয়ায় সিম্পল টেস্ট (মৌলিক যাচাই) চালু হবে।
আবেদনকারীর সংখ্যা আসনের চেয়ে বেশি হলে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, কোচিং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেবে।
সুবিধা-অসুবিধা ও সম্ভাব্য প্রভাব
সুবিধা: পরীক্ষা-ভিত্তিক ভর্তি মেধাবী ও প্রস্তুত শিশুদের জন্য ন্যায্যতা আনতে পারে। ভালো স্কুলে মানসম্মত শিক্ষার্থীদের সমাবেশ ঘটাতে সাহায্য করবে। লটারির ক্ষেত্রে যেখানে ভাগ্যের ওপর নির্ভর করতে হতো, সেখানে এখন যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ মিলবে।
অসুবিধা ও আশঙ্কা: শিক্ষাবিদরা (যেমন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ) মনে করেন, এতে পুরোনো সমস্যা ফিরে আসবে—কোচিং সেন্টারের দৌরাত্ম্য বাড়বে, অভিভাবকদের টেনশন ও অর্থ ব্যয় বাড়বে। ৫-৬ বছরের শিশুরা আবার প্রতিযোগিতার চাপে পড়বে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
অকৃতকার্যতার হতাশা, অসম প্রস্তুতি (অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারের শিশুরা) এবং অসমতা বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড তৈহিদুল ইসলাম বলেন প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা শিশুদের বিকাশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। লটারি অন্তত চাপমুক্ত ছিল। এখন কোচিং-নির্ভরতা বাড়লে শিক্ষার মানোন্নয়নের পরিবর্তে বাণিজ্যিকীকরণ বাড়তে পারে।
আর একইসাথে সেরা ছাত্ররা হাতে গোণা ভালো কিছু স্কুলে আর বাকি মাঝারি ও কম মেধাবিরা কম মানের স্কুলে ঢুকবে, এতে অল্প বয়স থেকেই শিক্ষার্থীর বৈষম্যের শিকার হবে ও স্কুলগুলোর মধ্যে শুরু হবে আভিজাত্যের অসুস্থ প্রতিযোগীতা।
লটারি বাতিলের সিদ্ধান্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় মেধাকেন্দ্রিকতা ফিরিয়ে আনার প্রয়াস হলেও, এর সফলতা নির্ভর করবে কোচিং নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষার ধরন (শিশু-বান্ধব কি না) এবং অভিভাবক-শিক্ষকদের সচেতনতার ওপর।
শিক্ষাবিদদের মতে, ভর্তি প্রক্রিয়া যেন শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সমতা রক্ষা করে—সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে এখন কঠোর নজরদারি ও বিকল্প ব্যবস্থা (যেমন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন) নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সিদ্ধান্তটি শিশুদের জন্য আশীর্বাদ হয়, অভিশাপ নয়।
