বিশ্লেষণ || ইউনূসসহ তার উপদেষ্টারা ও বর্তমান সরকারের মন্ত্রীরা বঙ্গবন্ধু হত্যা-মামলার আসামি হবেন যে কারণে

বিশ্লেষণ || ইউনূসসহ তার উপদেষ্টারা ও বর্তমান সরকারের মন্ত্রীরা বঙ্গবন্ধু হত্যা-মামলার আসামি হবেন যে কারণে
শেয়ার করুন

গোলাম হোসেন


অপরাধকর্মের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন প্রদানই অপরাধী মর্মে স্বীকারোক্তি। ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তথাকথিত অন্তর্বর্তী সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রের ঘোষিত ১৫ই আগস্টের সাধারণ ছুটি বাতিল করে। তৎমর্মে ২০২৪ সালের ১৩ই আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি-৪ শাখা স্মারক নং- ০৫.০০.০০০০.১৭৩.০৮.০১৩.২৩-১১৭ প্রজ্ঞাপন জারি করে। বর্তমান বিএনপি সরকার তথাকথিত অন্তবর্তী সরকার কর্তৃক জাতীয় শোক দিবস পালনে ১৫ই আগস্টের সাধারণ ছুটি বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রেখে ১১ই মার্চ, ২০২৬ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসগুলো পালন নিয়ে নতুন পরিপত্র জারি করে।

প্রশ্ন হলো, শোক দিবস পালনের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বাতিল করে কী বার্তা দিলো? বার্তাটি হলো, তাদের দৃষ্টিতে ১৫ই আগস্ট শোকের দিন নয়। অতএব শোক দিবস পালনের নিমিত্তে সাধারণ ছুটি বাতিল।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট প্রত্যুষে দেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়, রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যার ঘটনার দিনটিকে যারা শোক দিবস মানতে নারাজ, তারা হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করে মর্মে স্বীকৃতি প্রদানকারী হিসেবে বিবেচিত হবে।

এখন প্রশ্ন হলো, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণ করা খুনের অপরাধ, সমর্থন করাটাও অপরাধ কি-না?

অপরাধের স্বীকারোক্তির বিষয়টি ফৌজদারি আইনের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় বিধৃত হয়েছে। একজন ব্যক্তি কোন অপরাধ সংঘটন করেছে মর্মে স্বীকারোক্তি করলে একজন ম্যাজিস্ট্রেট তার জবানবন্দি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় রেকর্ড করেন, যা বিচারে সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

প্রশ্ন হলো, শোক দিবসকে অস্বীকার করে সাধারণ ছুটি বাতিল করে যারা প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, তারা হত্যাকাণ্ডের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন ঘোষণা করেছে মর্মে প্রজ্ঞাপনটি অপরাধেরই স্বীকারোক্তি বিবেচিত হয়ে বিজ্ঞ আদালতের সামনে বিচারিক কার্যক্রমে জবানবন্দি ও সাক্ষ্য মর্মে গৃহীত হবে কি-না?

দেখুন, পেনাল কোডের ৩০২ ধারা মোতাবেক হত্যা মামলার আসামির বিচার করা হয়। পেনাল কোডের ৩৪ ধারায় “কতিপয় ব্যক্তি কর্তৃক একই অভিপ্রায় পূরণকল্পে কৃত কার্যাবলী” সম্পর্কে বলা আছে। হত্যার অপরাধে একাধিক আসামিকে অভিযুক্ত করার সময়ে পেনাল কোডের ৩০২ ধারার সাথে একই অভিপ্রায়ের বিষয়টিকে ধর্তব্যে আনার জন্যে ৩৪ ধারাকে সংযুক্ত করা হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করে আদালত যাদের সাজা দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ গঠনে উল্লিখিত দুটি ধারারই উল্লেখ রয়েছে।

বিচার সম্পন্ন হওয়ার অনেক বছর পর আজ যারা রাষ্ট্রীয় শোক দিবস অস্বীকার করে এবং রাষ্ট্রীয় শোক পালনে বাধা প্রদান করে রাষ্ট্রপতির হত্যাকাণ্ডের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করলো, তারা কিন্তু খুনিদের অভিপ্রায়ের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করলো।

অতএব, বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের প্রতি সমর্থন জানিয়ে খুনিদের অভিপ্রায়ের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে রাষ্ট্রীয় শোক পালনে বাধা প্রদানকারী ইউনূসের নেতৃত্বাধীন উপদেষ্টা পরিষদের উপদেষ্টারা এবং বর্তমান সরকারের মন্ত্রীরা বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামি হবেন।

প্রজ্ঞাপনের আলোকে উপদেষ্টা ও মন্ত্রীদের নামে একটি সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারকে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে একটি আইন করা যেতে পারে, কোন বিচার সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার শত বছর পরও যদি কেউ ঐ অপরাধে সম্পৃক্ততার স্বীকারোক্তি প্রদান করে বা অপরাধীর অভিপ্রায়ের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে, তাহলে সে বিচারের আওতায় আসবে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানতে পেরেছি, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা, ইউনূসকে প্রধান আসামি করে সারাদেশে নেতাকর্মীদের বাড়ি পোড়ানো ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন।

এ মুহূর্তে তা সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করছি না, কারণ দেশে কোনো আইনের শাসন নাই। বর্তমান সময়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলা করলে ইউনূসের আশীর্বাদপুষ্ট বর্তমান সরকার মামলার বাদীকে উল্টো ফাঁসিয়ে দেয়ার জন্যে পেনাল কোডের ২১১ ধারা ও ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫০ ধারার প্রয়োগ করতে পারে। এই দুটি ধারায় মিথ্যা অভিযোগ দায়েরকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিধান আছে।

অতএব, বঙ্গবন্ধু কন্যা যদি ইউনূসের বিচার করতে চান, দেশে সত্যিকার অর্থেই আইনের শাসন ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা উত্তম হবে।

আইনের শাসন ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে জরুরি কাজ হবে বিশ্বের যেসকল দেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলো এবং সরাসরি সহযোগিতা করেছিলো, সেই বিশ্ব শক্তির সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা। স্বাধীনতার পূর্বে বাঙালি যখন শোষণ, বঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলো, বঙ্গবন্ধু তখন সোচ্চার হয়েছিলেন, বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রই তখন বঙ্গবন্ধুর পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, বঙ্গবন্ধুকে সমর্থন দিয়েছিল, আবার অনেককেই শোষকগোষ্ঠী পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “বিশ্ব আজ দু’ভাগে বিভক্ত, শোষক এবং শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।” সেই দুটি বিভক্তি আজও বিদ্যমান আছে। ১৯৭১ সালে শুধু পাকিস্তানের পরাজয় হয়নি, যারা পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল তারা সবাই পরাজিত হয়েছিল। বিশ্বের সেই সম্মিলিত পরাজিত শক্তিই আজ বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

বিশ্ব শক্তির মদদে দেশের অভ্যন্তরের স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি আজ নিয়ম-নীতি, সংবিধান ও আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে দেশের সরকার পরিচালনা করছে, তাদের রোষানলে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি চরম অপমানিত হচ্ছে, বর্বরোচিত হামলা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, বেআইনিভাবে কারাগারে বন্দী থাকছে।

পরিস্থিতি এমনই যে, ৭১-এ গণধর্ষণ ও গণহত্যাকাণ্ডের মানবতাবিরোধী অপরাধে দন্ডিত খুনিদের নামে সংসদে শোক প্রস্তাব পাঠ করানো হচ্ছে।

এমতাবস্থায় ১৯৭১ সালে বিশ্বের যেসকল শক্তি শোষিতের পক্ষাবলম্বন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে সাহায্য করেছিল, তাদের কাছে পুনরায় সাহায্য প্রার্থনা করার আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। বর্তমান বর্বরোচিত শাসনের অবসান ঘটিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে সকল অন্যায়, অনিয়ম ও অপরাধের বিচার নিশ্চিত করণ বিবেক ও মনুষ্য বোধের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

লেখক পরিচিতি: গোলাম হোসেন, আইনজীবী।
মার্চ ১৭, ২০২৬।

Visited 23 times, 1 visit(s) today