বিশেষ প্রতিবেদক
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠায় বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে গভীর সংকট দেখা দিয়েছে। প্যানিকের কারণে দ্রুত ক্রয়, মজুদ এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে সরকারকে জ্বালানি বিক্রিতে দৈনিক লিমিট আরোপ করতে হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের মিত্রদেশ ভারতের দ্বারস্থ হয়েছে।
পররাষ্ট্র ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে ভারতের সঙ্গে জরুরি জ্বালানি সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে এবং ভারত ইতিমধ্যে অতিরিক্ত ডিজেল ও এলএনজি সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছে।
সংকটের মাত্রা
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮২ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ, যার জ্বালানির ৯৫% আমদানিনির্ভর, মাসিক আমদানি বিলে অতিরিক্ত ৮০-১০০ মিলিয়ন ডলারের চাপে পড়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, পেট্রোল ও ডিজেলের মজুত মাত্র ২ সপ্তাহের জন্য যথেষ্ট।
ফলে সরকার দৈনিক ক্রয়সীমা নির্ধারণ করেছে:
- মোটরসাইকেলে ২ লিটার
- প্রাইভেট কারে ১০ লিটার
- এসইউভিতে ২০-২৫ লিটার এবং
- ট্রাকে ২০০-২২০ লিটার
এছাড়া গ্যাস সংকটে চারটি সার কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে লোডশেডিং বেড়েছে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (অপারেশন) মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, “প্রধানমন্ত্রীকে সার্বিক পরিস্থিতি অবহিত করা হয়েছে। তিনি প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন। মার্চ মাসের জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল আমদানি নিশ্চিত করা হয়েছে।”
ভারতের সহায়তা: আওয়ামীলীগ আমলের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানী চুক্তির ধারাবাহিকতা
বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে ২০২৬ সালে ১.৮ লাখ মেট্রিক টন লো-সালফার ডিজেল আমদানির চুক্তি ইতিমধ্যে কার্যকর। এই চুক্তির আওতায় নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড (এনআরএল) থেকে ডিজেল সরবরাহ চলছে, যা ২০১৬ সালের ১৫ বছর মেয়াদী চুক্তির অংশ। সংকটের কারণে সরকার এই চ্যানেল দিয়ে অতিরিক্ত সরবরাহ বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাম্প্রতিক যোগাযোগে জরুরি জ্বালানি সহায়তার বিষয়টি উত্থাপন করেছেন।
ভারত অতিরিক্ত ডিজেল (প্রায় ৫০,০০০-১,০০,০০০ টন) এবং এলএনজি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া ত্রিপুরা থেকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
বিএনপি সরকারের এই পদক্ষেপকে বিশ্লেষকরা “বাস্তববাদী কূটনীতি” হিসেবে দেখছেন। দলটি নির্বাচনী ইশতেহারে ভারতের সঙ্গে “পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক” গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
তবে জামায়াতে ইসলামীসহ কিছু রক্ষণশীল মহল ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাকে “জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক” বলে সমালোচনা করছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ভারতের সহায়তা স্বল্পমেয়াদী স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি (সৌর, বায়ু) এবং অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বর্তমান রিজার্ভ দিয়ে ঝুঁকিমুক্তভাবে মাত্র ৫-৬ মাস চলা সম্ভব।জনমতের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে বলছেন, “সংকটে ভারতই প্রথম সাড়া দেয়—এটাই বাস্তবতা।” অন্যরা বলছেন, “নিজস্ব শক্তি বাড়ানোর পরিকল্পনা দরকার, না হলে নির্ভরতা আরও বাড়বে।”সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সব সম্ভাব্য উৎস থেকে সহায়তা নেওয়া হচ্ছে—ভারতের সহায়তা তারই অংশ।
