মতামত || পরের দৃশ্য দেখার অপেক্ষায়

মতামত || পরের দৃশ্য দেখার অপেক্ষায়
শেয়ার করুন

হরিনারায়ণ দাস

বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে গেল। দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। কিন্তু নির্বাচনের কয়েকদিন আগ থেকে সোশ্যাল মিডিয়া পুরোপুরি জামায়াতর দখলে ছিল। অনেকেই উৎকণ্ঠায় ছিল, জামায়াত এবার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় যাবে। এ ধারণার ভিত্তি শুধু সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না, গত বছর বাংলাদেশের যেসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে, তার সবগুলোতেই জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ছাত্র শিবিরের ভূমি ধস বিজয় হয়েছে।

জামায়াত বিএনপিকে মোটামুটি ‘চাঁদাবাজের দল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছে। প্রার্থী নির্বাচনে জামায়াত বিএনপি থেকে অনেক বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। সর্বোপরি জামায়াতর রয়েছে নিজস্ব একটি অর্থনৈতিক শক্তি। যা আওয়ামী লীগের ১৭ বছর শাসন আমলেও প্রায় অক্ষুণ্ণ ছিল। উপরন্তু ইউনূসের দেড় বছর শাসনামলে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বিকশিত হয়েছে পুষ্প পল্লবে। তাদের অনুগত কর্মকর্তা বসেছে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে।

নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে জামায়াত দলীয় সুশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক শক্তির প্রদর্শন দেখাতে তারা সমর্থ্য হয়েছে। তদুপরি জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের প্রধান শফিকুর রহমান এমন সব মধ্যপন্থী কথাবার্তা বলছিলেন, তাদের কট্টর ইসলামী রূপ অনেকটা হালকা হয়ে ধরা দিচ্ছিল সকলের কাছে। ফলে জামায়াতর নিরঙ্কুশ বিজয় নিয়ে অনেকে আশাবাদী, অনেকে শংকিত হয়ে উঠেছিল।

আমি শংকিতদের দলে ছিলাম। কারণ, জামায়াত বিশ্বাসঘাতক ও লক্ষ্যস্থির গোঁড়াদের একটি দল। তারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য সব রকম ছল চাতুরী করতে অভ্যস্ত। ক্ষমতায় গেলে তাদের রূপ হবে ভয়ঙ্কর। তারা মূলত একটি গোষ্ঠীবদ্ধ সম্প্রদায়। এরা ক্ষমতায় গেলে সংখ্যালঘুরা তো দূর, তাদের সংগঠনের বাইরে কেউ রাষ্ট্রের সুনজরে থাকবে না।

কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে জামায়াতর মুখোশ খুল যাওয়ায় শেষ মুহূর্তে তা নির্বাচনে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এর মধ্যে মেয়েদের কর্মঘন্টা ৫-এ নামিয়ে আনা, নির্বাচনের আগে আগে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে আপত্তিকর টুইট, আর শেষে নির্বাচনের আগের দিন নগদ ৭৪ লাখ টাকাসহ জামায়াতর এক জেলা প্রধানের গ্রেপ্তার হওয়া ছিল জামায়াতর জন্য কাল।

তারপরও জামায়াতর জন্মের পর এ অঞ্চলে জামায়াত এবারের চেয়ে বেশি আসন এর আগে কখনো পায়নি। এর আগে কখনো জামায়াত ১৮টির বেশি আসন পায় নি। জামায়াত এ আসনগুলো কোথায় পেয়েছে একটু বিশ্লেষণ করা দরকার। মজার ব্যাপার, জামায়াত বিচ্ছিন্নভাবে আসন পেয়েছে খুব কম। যেখানে তারা আসন পেয়েছে, প্রায় পুরো জেলার আসন তারা বা তাদের জোট সঙ্গীরা পেয়েছে।

প্রথমেই আসে বাংলাদেশের দরিদ্রপীড়িত ও অশিক্ষিত অঞ্চল বলে পরিচিত উত্তরবঙ্গের জেলাগুলা। কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারি, রংপুর, গাইবান্ধার সবগুলো আসন পেয়েছে জামায়াত জোট। এসব অঞ্চলের মানুষকে সহজ-সরলতার কারণে অন্য অঞ্চলের মানুষকে ‘মফিজ’ বলে ডাকে। তারা দরিদ্র হতে পারে, কিন্তু সৎ। এসব অঞ্চলে বেহশত বা স্বর্গের টিকেটের প্রলোভন দেখিয়ে বেশ ভালো করেছে জামায়াত। এ অঞ্চলে একসময় শুষ্ক মৌসুমে ভয়াবহ খরা হত। যাকে মঙ্গা বলা হয়। তাতে মানুষ বড়ো কঠিন জীবন যাপন করত। তার থেকে মুক্তি দিয়েছে হাসিনা সরকার। রংপুর আবার হাসিনার শ্বশুর বাড়ি।

এ অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নয়ন করেছিলেন সাবেক সেনা শাসক হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের মাধ্যমে। এ অঞ্চলের সবগুলো আসন একসময় তার দল জাতীয় পার্টি পেত। তাই হাসিনা এসব আসনের দিকে খুব একটা হাত দিতেন না। আর এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টি দুর্বল হয়ে পড়ে। এই শূন্য স্থান দখল করে কৌশলী জামায়াত।

এরপর রয়েছে পশ্চিমের সীমান্তবর্তী জেলাগুলা। এসব জেলার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের যোগাযোগ বেশ ভালো। এসব অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকা চোরাচালান। কিন্তু আশ্চর্য্যজনকভাবে এরা ভয়াবহ ভারতবিদ্বেষী। এ ভারতবিদ্বেষী মনোভাবের জন্য এসব অঞ্চলে বিএনপি ভালো করত। জামায়াত মনোভাবাপন্নরাও বিএনপিকে ভোট দিত আওয়ামী লীগকে ঠেকানোর জন্য। এখন আওয়ামী লীগ না থাকায় ভোটগুলো গেছে জামায়াতর বক্সে। জেলাগুলো হলো মুর্শিদাবাদের ওপারে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, গেদে সীমান্তের ওপারের চুয়াডাঙা, বশিরহাটের ওপারের সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙা লাগোয়া ঝিনাইদাহ ও যশোর, নদীয়ার ওপারের কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর।

জামায়াতর উত্থানের সাথে সাথে আওয়ামী লীগের বি-টিম বলে পরিচিত জাতীয় পার্টি দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে গেল। সাবেক সেনা শাসক এরশাদ ৯০-এ গণঅভ্যুত্থানে পদত্যাগের পর জেলে বসে ৯১-এর নির্বাচনে ৩৫টি আসন পেয়েছিল। সেই জাতীয় পার্টি এবার একটিও আসন পায়নি। পক্ষান্তরে ২৪-এর দাঙ্গায় নেতৃত্বদানকারী দল এনসিপির তরুণা পেয়েছে ৬টি আসন। অবশ্য নির্বাচনের আগে এদের বাগাড়ম্বর দেখে মনে হয়েছিল এরাই সরকার গঠন করবে। তারা তাদের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীর নাম প্রকাশও করেছিল।

এদের নিয়ে দারুণ বলেছেন কবি ও গীতিকার মারজুক রাসেল লিখেছেন, এনসিপি নেতারা হলো কুত্তার বাচ্চার মতো। হওয়ার সময় ছিলো অনেকগুলো, ভোটের সময় আছে কয়েকটা!

তবে এই নির্বাচনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক নিয়ে জাহিদ রায়হান ফেসবুকে লিখেছেন, ধন্যবাদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার জনাব এ এম এম নাসির উদ্দীন সাহেব। সর্বজনগ্রহনযোগ্য ভূমিধ্বস বিজয়ের সাথে বাংলাদেশের ইতিহাসে এই কথাটাও স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে যে, জিরো ক্যাজুয়ালটীতেও একটা জাতীয় নির্বাচন পার করা যায়।

দিনাজপুরের বীরগঞ্জে হিন্দু গ্রামে অগ্নিসংযোগ ছাড়া তেমন কোনো অঘটনের খবর আসেনি। সেখানে তৎক্ষণাৎ বিএনপির নবনির্বাচিত সাংসদ ছুটে গেছেন। বিএনপি প্রধান তারেক জিয়া সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, বিজয়ীর কাছে পরাজিতরা নিরাপদ থাকলে বিজয়ে আনন্দ মহিমান্বিত হয়।

অথচ ২০০১ সালের ১লা অক্টোবর যখন বিএনপি শেষবার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে, সে রাতে সারাদেশে নারকীয় তাণ্ডব শুরু হয়েছিল। সেই চিতার আগুন জ্বলেছিল কয়েক মাস। শত শত গ্রাম হিন্দুশূন্য হয়ে গিয়েছিল।

অনেকে বলছেন যে সহিংসতা হওয়ার ২০০৪-এর ৫ই আগস্টের পরই হয়ে গেছে। আর কিছু অবশিষ্ট নেই। এটা তো একটা দিক, আরেকটা দিক এবার বিএনপি হিন্দু ভোট পেয়েছে। আওয়ামী লীগের এই ভোট ব্যাংক মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে রক্ষা করতে দলবেধে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। ফলে সংখ্যালঘুদের উপর চড়াও হওয়ার কিছু ছিল না।

নির্বাচন শেষ হলেও নির্বাচনের খেলা কিন্তু শেষ হয়নি। দুই তৃতীয়াংশ ভোট কিন্তু জুলাইয়ের সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে পড়েছে। এটা বাস্তবায়নের কথা বলে ইউনূস সরকার চাইলে আরো ৬ মাস থাকতে পারে। এই সংস্কার প্রস্তাব অনুসারে মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতি পরিবর্তন করার কথা। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ হবে। ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষ গঠিত হলে জামায়াত কিন্তু নিম্নকক্ষ থেকে উচ্চকক্ষে ভালো অবস্থায় চলে যাবে। তখন তারা জুলাই সনদ নিয়ে কী নাটক করে তা দেখার অপেক্ষা।

নির্বাচনের উৎসবে বাংলাদেশের মানুষ সাময়িক দেশের সবচেয়ে বড়ো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে হয়ত সাময়িক ভুলে বসে আছে। তাই বলে দলটি অপ্রাসঙ্গিক হয়নি। এবারের নির্বাচনে এ দলের ভোটাররাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভোট দেয়ায় বিএনপির এই অভাবনীয় উত্থান। নতুন গণতান্ত্রিক পরিবেশে আওয়ামী লীগ কী করে তাও দেখতে হবে।

সবমিলে আরো অনেক খেলা বাকি আছে।

লেখাটি শেষ করছি সুদীপ্ত বিশ্বাস বিভুর একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে, এখন বলার সময় এসেছে। হিন্দুরা বেইমানি করেনি। এটা ওদের রক্তে নেই। হিন্দু অধ্যুষিত আসনগুলোতে বিএনপি ভূমিধস বিজয় পেয়েছে। বিএনপি এর প্রতিদান কিভাবে দেয় তা দেখার অপেক্ষায় রইলাম। বিএনপি ভুলে যেতে পারে কিন্তু বাংলাদেশের হিন্দুরা ভোলেনি ২০০১ সালে নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর বিএনপি-জামায়াত জোট জয়োৎসব করেছিল হিন্দুদের উপর সীমাহীন নির্যাতন চালিয়ে। তখন ছিল দুর্গাপূজার মওসুম। বাংলাদেশের এমন কোন থানা বাকি ছিল না যেখানে প্রতিমা ভাঙ্গা হয়নি।

এইগুলো ইতিহাস থেকে, হিন্দুদের স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা যাবে না। অথচ বিএনপির সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত মির্জা ফখরুল আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই প্রসঙ্গটা বেমালুম অস্বীকার করলেন। সাম্প্রদায়িক নির্যাতনকে বললেন রাজনৈতিক হামলা।

এমনকি তারেক জিয়া তাঁর বহুল আলোচিত নির্বাচনী ইশতেহারে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের আশ্বস্ত করে, অভয় দেয় এমন কোন একটা বাক্য উচ্চারণ করলেন না।

এগুলো বার বার বলে যাবো।

বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা হলো গরীবের বৌ। সবার ভাবি। একটু নিশ্চয়তা পাওয়ার আশায়, একটু সুরক্ষা পাওয়ার আশায় সবার মুখের পানে চেয়ে থাকে।
১৩.০২.২০২৬

Visited 7 times, 1 visit(s) today