নিপাহ ভাইরাসে ৫ মৃত্যু, কিন্তু নীরব সরকার: নির্বাচনী ভিড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানোর অভিযোগ

নিপাহ ভাইরাসে ৫ মৃত্যু, কিন্তু নীরব সরকার: নির্বাচনী ভিড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানোর অভিযোগ
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রচারণা ও গণভোটকে ঘিরে যখন দেশজুড়ে জনসমাগম চরমে, ঠিক তখনই নিপাহ ভাইরাসে সাম্প্রতিক পাঁচজনের মৃত্যুর তথ্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে এ বিষয়ে সরকারের নীরবতা ও দায়িত্বশীল মহলের বক্তব্য না পাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে এখন পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাসে মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।

এর মধ্যে ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত একজনের মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে।

তবে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি বলে জানা গিয়েছে।

আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, নওগাঁ জেলার ৪০–৫০ বছর বয়সী এক নারী গত ২১ জানুয়ারি জ্বর, মাথাব্যথা, বমি, খিঁচুনি ও আচরণগত অস্বাভাবিকতা নিয়ে অসুস্থ হন এবং ২৮ জানুয়ারি মারা যান। পরীক্ষায় নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয়। ওই নারী নিয়মিত কাঁচা খেজুরের রস পান করতেন, যা নিপাহ সংক্রমণের প্রধান ঝুঁকি হিসেবে পরিচিত।

এর আগে ২০২৫ সালের শেষ দিকে আরও চারজন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ফলে শীতকালীন মৌসুমে (ডিসেম্বর–এপ্রিল) নিপাহ ভাইরাসের ঝুঁকি নতুন করে সামনে এসেছে।

ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, বর্তমানে নতুন কোনো নিপাহ সংক্রমণ শনাক্ত হয়নি এবং রোগীর সংস্পর্শে থাকা ৩৫ জনের পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এসেছে। আন্তর্জাতিকভাবে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কম বলা হলেও সংস্থাটি জনসমাগম এড়িয়ে চলা এবং স্বাস্থ্যবিধি মানার পরামর্শ দিয়েছে।

নির্বাচনী ভিড় ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

এমন পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রচারণা, জনসভা, মিছিল এবং ভোটের জন্য এক জেলা থেকে আরেক জেলায় মানুষের যাতায়াত বেড়ে গেছে। বিশেষ করে নওগাঁ, রাজশাহী, ফরিদপুর, লালমনিরহাটসহ নিপাহপ্রবণ এলাকায় জনসমাগম বাড়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

নিপাহ ভাইরাস মূলত বাদুড় দ্বারা দূষিত কাঁচা খেজুরের রস পান এবং আক্রান্ত ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। জনসভা, হাত মেলানো, খোলা খাবার গ্রহণ এবং অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরকারের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন

এত গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ইস্যুতে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট নয় বলে অভিযোগ উঠেছে। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। একইভাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র জনসংযোগ কর্মকর্তা (পিআরও) শাহাদাত হোসাইন এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

সরকারের দায়িত্বশীল মহলের এমন নীরবতা নিপাহ ভাইরাসের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নির্বাচনী সময় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান সচেতনতামূলক বার্তা বা নির্দেশনা না থাকাও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

প্রতিরোধই একমাত্র উপায়

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, নিপাহ ভাইরাসের কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। প্রতিরোধই একমাত্র উপায়। কাঁচা খেজুরের রস পান না করা, বাদুড়ে কামড়ানো বা খোলা ফল এড়িয়ে চলা, হাত ধোয়ার অভ্যাস এবং অসুস্থতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন কেন্দ্রিক ব্যস্ততার মধ্যেও সরকার যদি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিকে গুরুত্ব না দেয়, তবে ছোট আকারের সংক্রমণও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে। এ কারণে নিপাহ ভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের স্পষ্ট অবস্থান ও জনসচেতনতামূলক উদ্যোগ জরুরি হয়ে উঠেছে।

Visited 6 times, 1 visit(s) today