বিশেষ প্রতিবেদক
আসন্ন গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পর্যবেক্ষক সংস্থার তালিকা প্রকাশ হওয়ার পর নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রথম ধাপের তালিকায় মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্র করে স্বার্থের সংঘাত ও ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের অভিযোগ উঠেছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রথম ধাপে ১২ নম্বরে রয়েছে ‘অধিকার’। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা আদিলুর রহমান খান বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা। একই সঙ্গে ‘অধিকার’-এর বর্তমান নির্বাহী পরিচালক তাসনিম আরেফা সিদ্দিকী—যিনি শিক্ষা উপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল (সিআর) আবরারের স্ত্রী।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—সরকারের উপদেষ্টাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতায় থাকা একটি সংস্থা কি আদৌ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের মতো সংবেদনশীল দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষ থাকতে পারে?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক নির্বাচন কমিশনার বলেন, “নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কোনো প্রতীকী কাজ নয়। পর্যবেক্ষকের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দূরত্বের ওপর। এখানে সেই দূরত্ব বজায় আছে—এটা বলা কঠিন।”
বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে এ কারণে যে সরকার নিজেই গণভোটে প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অর্থাৎ নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী সরকার একটি নির্দিষ্ট ফলাফলের পক্ষে রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করার পর, সেই একই সরকারের উপদেষ্টা ও তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আবার ভোট ও গণভোটের স্বচ্ছতা মূল্যায়ন করবে—এমন পরিস্থিতিকে অনেকেই স্বার্থের সংঘাতের ক্লাসিক উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নির্বাচন বিশ্লেষক বলেন, “যে সরকার ফলাফলের পক্ষে প্রচার করছে, তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লোকজন যদি পর্যবেক্ষক হয়—তাহলে পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট আগেই অনুমান করা যায়। এটি পর্যবেক্ষণ নয়, বরং বৈধতার সিল দেওয়ার প্রক্রিয়া।”
আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা রয়েছে, পর্যবেক্ষক সংস্থাকে রাজনৈতিক পক্ষপাত, পারিবারিক স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে হবে। কিন্তু বর্তমান তালিকায় সরকার → উপদেষ্টা → উপদেষ্টার প্রতিষ্ঠিত সংস্থা → আরেক উপদেষ্টার পরিবারের সদস্য—এই সংযোগ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ করে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
নাগরিক সমাজের একজন প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এখানে শুধু একজন বা দুটি নামের প্রশ্ন নয়। এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা। ক্ষমতার বলয়ের বাইরে থাকা কোনো প্রতিষ্ঠানকে কি ইচ্ছাকৃতভাবে দূরে রাখা হয়েছে—সেই প্রশ্নও ওঠে।”
বিশ্লেষকদের মতে, এমন পর্যবেক্ষক তালিকা নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থাকে আরও দুর্বল করতে পারে। বিশেষ করে যখন নির্বাচন ও গণভোট একই সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে গণভোটের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, তখন পর্যবেক্ষকদের নিরপেক্ষতা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
একজন সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, “যদি পর্যবেক্ষক নিয়োগই বিতর্কিত হয়, তাহলে নির্বাচন শেষে ফলাফল যতই ‘আইনসম্মত’ বলা হোক, রাজনৈতিক ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে।”
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখন আর শুধু ‘অধিকার’ বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ঘিরে নয়। প্রশ্নটি হলো—এই নির্বাচন কি সত্যিই ক্ষমতার বাইরে থাকা নিরপেক্ষ নাগরিকদের নজরদারিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, নাকি ক্ষমতার ভেতর থেকেই তার বৈধতার কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে?
নির্বাচন বৈধতা দিতে এক ব্যক্তির সাইনবোর্ডসর্বস্ব কাগুজে প্রতিষ্ঠান ‘পাশা’, একাই সাপ্লাই দিচ্ছে ১০ হাজার পর্যবেক্ষক!
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনুমোদিত ১০ হাজার ৫৫৯ জন পর্যবেক্ষক মূলত PASA (People’s Association for Social Advancement) নামের একটি সংস্থার মাধ্যমে মাঠে মোতায়েন হবে। সংস্থাটি কার্যত একজন ব্যক্তির নেতৃত্বে পরিচালিত, কোনো বড় স্টাফ বা স্থায়ী প্রকল্প নেই।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, সংস্থার সঙ্গে উপদেষ্টা রেজওয়ানারও সম্পৃক্ত রয়েছেন। এতে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, সংস্থার পর্যবেক্ষক সংখ্যা ও বাস্তব কার্যক্রমের মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে। একজন ব্যক্তির সিদ্ধান্ত এবং উপদেষ্টা রেজওয়ানার সম্পৃক্ততার প্রভাবের কারণে, এত বড় সংখ্যক পর্যবেক্ষক স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গতভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
এদিকে নিরপেক্ষ জনগণের ভোট নাকি আগেই লেখা একটি চিত্রনাট্যের আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়ন—এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আসন্ন নির্বাচন ও গণভোটের ভবিষ্যৎ বিশ্বাসযোগ্যতা।





