নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন নিয়ে অসন্তোষ, রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা
কয়েকটি পর্যবেক্ষক সংস্থার নাম থাকলেও বাস্তব অস্তিত্ব নেই, নামের অধীনে চলছে বিউটি পার্লার
❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক
নিজ বসতবাড়ির এক কক্ষের অফিস সাজিয়ে কার্যত কোনো স্থায়ী জনবল বা চলমান প্রকল্প ছাড়াই নামসর্বস্ব সংস্থাকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণে ১০ হাজারের বেশি পর্যবেক্ষক নিয়োগের অনুমতি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংস্থাটির নাম—পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট (পাশা)।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এক ব্যক্তিনির্ভর এই সংস্থার সক্ষমতা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন থাকলেও ইসি অভূতপূর্ব উদারতায় তাদের সর্বাধিক সংখ্যক পর্যবেক্ষকের অনুমোদন দিয়েছে।
নজিরবিহীন অনুমোদন
ইসির তথ্য অনুযায়ী, এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণে অনুমতি পাওয়া ৮১টি দেশি সংস্থার মোট পর্যবেক্ষক সংখ্যা ৫৫ হাজার ৪৫৪। এর মধ্যে একাই পাশার অনুমোদিত পর্যবেক্ষক ১০ হাজার ৫৫৯ জন—মোট দেশি পর্যবেক্ষকের প্রায় ১৯ শতাংশ।
কোনো একক সংস্থার জন্য এত বিপুল সংখ্যক পর্যবেক্ষক অনুমোদনের নজির বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে নজিরবিহীন।
পাশার পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চসংখ্যক পর্যবেক্ষক অনুমোদন পেয়েছে কমিউনিটি অ্যাসিস্ট্যান্স ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট (কার্ড)—৩ হাজার ৫৬১ জন। অর্থাৎ পাশার অনুমোদন পরবর্তী বৃহত্তম সংস্থার প্রায় তিন গুণ।
কার্যালয় নেই, কর্মী নেই—তবু ১২৭ আসনে পর্যবেক্ষক
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাশার নিজস্ব কোনো স্থায়ী কর্মী নেই, নেই কার্যকর সাংগঠনিক কাঠামোও। তবু ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৭টি আসনে তাদের পর্যবেক্ষক মোতায়েনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ে ১০ হাজার ২৫০ জন পর্যবেক্ষক ছাড়াও কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকের অনুমোদন পেয়েছে সংস্থাটি।
ইসির প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, ৪১টি আসনে পাশার ১০০ বা তার বেশি পর্যবেক্ষক রয়েছে। মৌলভীবাজার জেলার চারটি আসনেই সর্বাধিক পর্যবেক্ষক পাশার। মৌলভীবাজার-১ আসনে অনুমোদিত ২৮৬ জনের মধ্যে ২৭৩ জনই পাশার।
মৌলভীবাজার-২ আসনে ২৭৭ জনের মধ্যে ২৪১ জন, আর মৌলভীবাজার-৩ আসনে এককভাবে ৩০৫ জন পর্যবেক্ষক রয়েছে পাশার। সিলেট, হবিগঞ্জ, নওগাঁ, লালমনিরহাটসহ উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও একই চিত্র।
‘কার্যালয়’ বলতে নির্বাহী পরিচালকের বসতবাড়ি
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বরমপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, একটি একতলা বাড়ির গায়ে ‘পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট (পাশা)’ লেখা সাইনবোর্ড।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি পাশার নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ হুমায়ুন কবীরের বসতবাড়ি। বাড়ির একটি কক্ষকেই তিনি কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করেন।
সরাসরি গিয়ে দেখা যায়, দুপুরেও মূল ফটকে তালা ঝুলছে।
প্রতিবেশীরা জানান, এখানে কোনো নিয়মিত অফিস কার্যক্রম চোখে পড়ে না। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও পাশার কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত নন।
অতীতের বিতর্ক ও অভিযোগ
সমাজসেবা অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে নিবন্ধিত হলেও পাশা কখনোই কার্যকরী কমিটির অনুমোদনের জন্য আবেদন করেনি। কাগজে-কলমে বৃক্ষরোপণ, যৌতুকবিরোধী আন্দোলন ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ তাদের কর্মসূচি হলেও বাস্তব কার্যক্রমের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না।
স্থানীয়ভাবে পাশা নিয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের বিতর্ক। বিভিন্ন সময়ে হবিগঞ্জ শহর ও আশপাশের উপজেলায় অফিস খোলা ও বন্ধের ঘটনা ঘটেছে।
অভিযোগ রয়েছে, অতীতে পর্যবেক্ষক কার্ড বিক্রি করে অর্থ আদায়েরও। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারকে ক্ষমতায় বসানো ২০০১ সালের বিতর্কিত নির্বঅচনে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা দিয়ে কার্ড বিতরণের কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
প্রশিক্ষণহীন পর্যবেক্ষক, অর্থের উৎস অনিশ্চিত
পাশার নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ হুমায়ুন কবীর স্বীকার করেছেন, তাদের পর্যবেক্ষকদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই; কেবল দলনেতাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পর্যবেক্ষণের অর্থায়ন নিয়েও অনিশ্চয়তা স্পষ্ট।
তার ভাষ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছে অর্থ চাওয়া হয়েছে; না পেলে ‘স্বেচ্ছাশ্রমে’ কাজ করবেন পর্যবেক্ষকেরা।
নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল প্রক্রিয়ায় প্রশিক্ষণহীন ও অর্থনৈতিকভাবে অনিশ্চিত পর্যবেক্ষক মোতায়েনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সুশীল সমাজে।
ইসির যাচাই–বাছাই কতটা কার্যকর?
বর্তমান ইসি গত বছর সব পুরোনো নিবন্ধন বাতিল করে নতুন করে আবেদন নেয়। প্রথম ধাপে ৬৬টি সংস্থা নিবন্ধন পায়, যেখানে পাশার নাম ছিল না। পরে ডিসেম্বরে পাশাসহ আরও ১৫টি সংস্থাকে নিবন্ধন দেওয়া হয়।
ইসির নিজস্ব অনুসন্ধানেই দেখা গিয়েছিল, অনেক সংস্থার কার্যালয় কার্যত নেই, কর্মীসংখ্যা নগণ্য। তবু শেষ পর্যন্ত তাদের বড় একটি অংশ নিবন্ধন ও পর্যবেক্ষক অনুমোদন পেয়েছে।
এ বিষয়ে ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেন, শর্ত পূরণ করায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে তথ্যপ্রমাণ দিলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন তিনি—যা ইসির পূর্ববর্তী যাচাই প্রক্রিয়ার ওপরই প্রশ্ন তোলে।.
রাজনৈতিক দলগুলোর তুমুল সমালোচনা
ইতিমধ্যে কয়েকটি রাজনৈতিক দল এমন নাম-সাইনবোর্ডসর্বস্ব পর্যবেক্ষক সংস্থা নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছে।
হবিগঞ্জে জাতীয় পার্টি-জাপা’র একজন জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘পাতানো’ নির্বাচনকে বৈধতা দিতেই ইসি আগের সব পর্যবেক্ষক সংস্থার অনুমোদন বাতিল করে এসব ভুঁইফোড় সংস্থাকে অনুমোদন দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রশ্নবিদ্ধ সরকার ও প্রশাসনের কারণে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের অনাগ্রহ দেখা গেছে এই নির্বাচন নিয়ে। তাই এসব আজগুবি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ডামি পর্যবেক্ষকের উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে।
একইসাথে তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছেন বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ এর সুনামগঞ্জের একজন দায়িত্বশীল নেতাও। তবে তিনি আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে অসম্মতি জ্ঞাপন করেছেন এ বিষয়ে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার বলেন, পর্যবেক্ষক অনুমোদনে প্রয়োজনীয় যাচাই–বাছাই হয়নি। পক্ষপাতদুষ্ট ও সক্ষমতাহীন সংগঠনকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তার মতে, প্রার্থী বাছাই থেকে শুরু করে আপিল নিষ্পত্তি—সব ক্ষেত্রেই ইসি শিথিলতার পরিচয় দিয়েছে, যা কমিশনের সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে আস্থাহীনতা বাড়াচ্ছে।
গণতন্ত্রের প্রহরী নাকি অনুমোদনের ফাঁক?
নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থেকে গণতন্ত্রের প্রহরীর ভূমিকা পালন করেন। সেখানে যদি নামসর্বস্ব, প্রশিক্ষণহীন ও প্রশ্নবিদ্ধ সংস্থার হাতে বিপুলসংখ্যক পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়, তবে তা নির্বাচনকে স্বচ্ছ করার বদলে উল্টো আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
এক ব্যক্তিনির্ভর একটি সংস্থার হাতে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পর্যবেক্ষক দেওয়ার সিদ্ধান্ত—ইসির সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়া, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
পর্যবেক্ষকের তালিকায় আছে ঝিনাইদহের নামসর্বস্ব তিন প্রতিষ্ঠানও, নামের অধীনে চলভে বিউটি পার্লার
নির্বাচন কমিশনের ৭৩টি স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থার তালিকায় রয়েছে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার তিনটি সংস্থার নামও। তবে সরেজমিনে এসব সংস্থার অস্তিত্ব মেলেনি। কোথাও অফিসই নেই, আবার কোথাও তথাকথিত অফিসের একটি কক্ষ দীর্ঘদিন ধরে বিউটি পার্লার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তালিকাভুক্ত আলোকিত সমাজ কল্যাণ সংস্থার কার্যালয় বিষয়খালী এলাকায় দেখানো হলেও বাস্তবে সেখানে বহু বছর কোনো কার্যক্রম নেই।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ১৭ বছর আগে সংস্থাটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রতিষ্ঠাতাও পরে লোকসানের কারণে বন্ধ করার কথা স্বীকার করেছেন।
ইউপি চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় প্রতিনিধিরা নামসর্বস্ব ও নিষ্ক্রিয় এমন সংস্থার নাম নির্বাচন পর্যবেক্ষকের তালিকায় থাকা নিয়ে বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।
এ ছাড়া জেলা শহরের চাকলাপাড়ায় অ্যাসোসিয়েশন ফর সোসিওইকোনোমিক অ্যাডভান্সমেন্ট (এসিয়া) ও হ্যাভেন সামাজিক উন্নয়ন সংস্থাও ইসির তালিকায় রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, এসব সংস্থার কার্যালয় মূলত নির্বাহী প্রধানের নিজস্ব বা আবাসিক ভবনের এক-দুটি কক্ষে সীমাবদ্ধ। কোথাও একটি কক্ষ আবার বাণিজ্যিকভাবে বিউটি পার্লার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দুটি সংস্থারই নির্বাহী প্রধান ও সভাপতি একই ব্যক্তি, এবং তিনি ছাড়া অন্য কোনো সদস্যের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা নেই।
ইসি’র নীতিমালায় বলা হয়েছে, গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বিষয়ে নাগরিকদের উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম এমন সংস্থারাই কেবল পর্যবেক্ষক হওয়ার যোগ্য। তবে তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলোর বাস্তব চিত্র সেই মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহ সদর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জানান, পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন ও তালিকা প্রণয়ন পুরোপুরি কেন্দ্রীয়ভাবে হয়; জেলা পর্যায়ের কোনো ভূমিকা এতে নেই।

