নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের ছয়টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বন্ধ বা অবসায়নের উদ্যোগ নেওয়ায় প্রায় ৪৫০ কর্মকর্তা–কর্মচারীর চাকরি অনিশ্চয়তায় পড়েছে। বয়স ও বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় নতুন কর্মসংস্থান পাওয়া কঠিন হবে—এই আশঙ্কায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
প্রয়োজনে আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন কেউ কেউ।
তাদের মতে, প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ না করে আর্থিক সহায়তা ও পর্যাপ্ত সময় দিলে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হতো। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা না থাকায় অবসায়ন ছাড়া বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ফাস ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, অ্যাভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অবসায়নের প্রক্রিয়ায় যাচ্ছে।
যদিও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রয়োজনীয় সময় ও সহায়তা পেলে প্রতিষ্ঠানটি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। এ দাবির পক্ষে আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছে তারা।
বার্ষিক প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এই ছয় প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় সাড়ে চারশ কর্মকর্তা–কর্মচারী কর্মরত। এর মধ্যে অ্যাভিভা ফাইন্যান্সে ২০৪ জন, প্রিমিয়ার লিজিংয়ে ৮০ জন, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৫৪ জন, পিপলস লিজিংয়ে ৩৯ জন, ফাস ফাইন্যান্সে ৩৮ জন এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্সে ৩০ জন রয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন আমানত ফেরত দিতে না পারায় প্রতিষ্ঠানগুলোর অফিসে গ্রাহকের উপস্থিতি খুব কম। দিলকুশায় ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও মতিঝিলে অ্যাভিভা ফাইন্যান্সের কার্যালয়ে কার্যত অচলাবস্থা বিরাজ করছে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর তাঁদের অর্থ আটকে আছে; এখন কেবল আসল টাকা ফেরতের আশায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অ্যাভিভা ফাইন্যান্সের এক গ্রাহক রাশেদুল করিম জানান, দুই বছর আগে ১২ শতাংশ সুদে আড়াই লাখ টাকা জমা রাখলেও এখন তা তুলতে পারছেন না। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটিকে দেউলিয়া ঘোষণা করেছে বলে শুনেছেন এবং গ্রাহকদের সুদ না দিয়ে শুধু মূলধন ফেরত দেওয়া হবে—এমন কথাও জানানো হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইমদাদুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, অবসায়নের সিদ্ধান্তের ফলে বড় ঋণখেলাপিরা দায় এড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে।
তার মতে, শুধু আমানত ফেরত দিলেই চলবে না; ঋণ আদায় ও দায়ীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।
তিনি দাবি করেন, তাদের বক্তব্য না শুনেই প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত সময় পেলে প্রতিষ্ঠান ঘুরে দাঁড়াতে এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে সক্ষম হবেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, ছয় প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন প্রক্রিয়া চলমান। কীভাবে এবং কত সময়ের মধ্যে আমানত ফেরত দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ কাজ করছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে তা জানানো হবে।
উচ্চ খেলাপি ঋণ, দীর্ঘদিনের অনিয়ম এবং আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থতার কারণে গত বছর ২০টি এনবিএফআইকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যায়নে ৯টি প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা সন্তোষজনক না হওয়ায় অবসায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের হার ৭৫ থেকে ৯৮ শতাংশ।
এর মধ্যে জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স ও বিআইএফসি—এই তিন প্রতিষ্ঠানকে তিন থেকে ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছে; নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অগ্রগতি না হলে সেগুলোকেও অবসায়নের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
