নিজস্ব প্রতিবেদক
কয়েক মাসের তুলনামূলক স্থিতিশীলতার পর আবারও ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দাম। আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে তেল, চিনি, ছোলা ও ডালের মতো পণ্যের পাইকারি দাম কেজিতে ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা এর জন্য চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রিতাকে দায়ী করলেও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো বলছে, বাজারে কার্যকর তদারকির অভাবেই দাম বাড়ানোর সুযোগ নিচ্ছে অসাধু চক্র।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রমজানের আগেই যদি সরবরাহ ব্যবস্থার জট খুলে বাজার তদারকি জোরদার করা না যায়, তবে মূল্যবৃদ্ধির এই চাপ খুচরা বাজারে আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে, যার ভোগান্তি পড়বে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রাম মহানগরের খাতুনগঞ্জে ইতিমধ্যে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব স্পষ্ট। গত এক সপ্তাহে প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। দেশি পেঁয়াজ কেজিতে বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৩৪ থেকে ৩৮ টাকা। ভারতীয় পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৩ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়।
রসুন কেজিতে ১৩০ টাকা, আদা ১১০ থেকে ১১৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা দুই সপ্তাহ আগেও ছিল ১০০ থেকে ১০৫ টাকা। ছোলার দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ৭০ থেকে ৭৫ টাকায় উঠেছে। ডালের বাজারেও চাপ দেখা যাচ্ছে—অ্যাংকর ডাল কেজিতে ২ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৪৮ টাকায়।
পাইকারি পর্যায়ে চিনি ও ভোজ্যতেলের দামও বেড়েছে। প্রতি মণ (৪০ কেজি) চিনি ১০০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় এবং পাম অয়েলের দাম দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯৯০ টাকা। রমজানের অন্যতম অনুষঙ্গ সেমাইয়ের দামও প্রতি মণে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়ে বর্তমানে ১ হাজার ৯৫০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য খালাসে জটিলতা। বন্দরের বহির্নোঙর ও কুতুবদিয়া চ্যানেলে বর্তমানে শতাধিক পণ্যবাহী জাহাজ অপেক্ষমাণ অবস্থায় রয়েছে।
বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ই জানুয়ারি পর্যন্ত এসব জাহাজে ৪৫ লাখ টনের বেশি ভোগ্যপণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০টি জাহাজে রয়েছে ১২ লাখ টন রমজান-সংশ্লিষ্ট খাদ্যপণ্য—গম, ভুট্টা, সয়াবিন, ছোলা, ডাল ও ভোজ্য তেল। পাশাপাশি পাঁচটি জাহাজে রয়েছে দুই লাখ টনের বেশি চিনি। এছাড়া সার ও সিমেন্টের কাঁচামালবাহী জাহাজও দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে।
স্বাভাবিক সময়ে একটি বড় জাহাজ থেকে সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস করা সম্ভব হলেও বর্তমানে লাইটার জাহাজের সংকটে সেই সময় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ থেকে ৩০ দিনে। ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডব্লিউটিসি) জানিয়েছে, লাইটার জাহাজের চাহিদা সরবরাহের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে অনেক মাদার ভেসেল দিনের পর দিন পণ্য খালাস শুরুই করতে পারছে না।
এ অবস্থায় বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন।
তিনি বলেন, কার্যকর তদারকির অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা রমজানকে সামনে রেখে অতিরিক্ত মুনাফা লোটার সুযোগ নিচ্ছে।
তার ভাষায়, দুই-তিন মাস আগেই বাজার মনিটরিং জোরদারের দাবি জানানো হলেও বাস্তবে তেমন তদারকি দেখা যাচ্ছে না। এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে রমজানে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ভোক্তাদের জিম্মি করা হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তবে ব্যবসায়ীদের বক্তব্য ভিন্ন। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, বাজারে পণ্যের সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে এবং বেচাবিক্রিও স্বাভাবিক।
তার দাবি, মাঝখানে দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় এখন কিছুটা সমন্বয় হচ্ছে মাত্র।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক মো. আনিছুর রহমান বলেন, বর্তমানে চাহিদার তুলনায় মজুত বেশি এবং আমদানি খরচও তুলনামূলক কম। তাই অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই।
কেউ যদি দাম বাড়ানোর চেষ্টা করে, তবে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।


