নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকার ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি)-এ পর্দা (বিশেষ করে মুখ ঢাকা/নিকাব) নিয়ে এক শিক্ষকের ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। ‘ধর্ম অবমাননা’র অভিযোগে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও মবের চাপে দুই শিক্ষককে বহিষ্কারের একদিনের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করেছে।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিকাল ৩টার দিকে জরুরি বিজ্ঞপ্তি ও ইমেইলের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এর আগে রোববার (১৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে ব্যাসিক সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীর এবং সহযোগী অধ্যাপক ড. এ. এস. এম. মহসিন-কে বহিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়।
বিতর্কের সূত্রপাত ফেসবুক পোস্টে
গত ১০ ডিসেম্বর লায়েকা বশীর তার ফেসবুক পোস্টে (প্রাইভেসি ‘ফ্রেন্ডস’ সেটিংসে) লেখেন যে, তিনি সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল ঢেকে পর্দা (নিকাব) করার বিপক্ষে। তিনি লিখেছিলেন:
“সারা শরীর ঢাকেন, হাত-মোজা, পা-মোজা পরেন, সমস্যা নাই। কিন্তু মুখমণ্ডল দেখাতেই হবে। ধর্মেও, যতদূর জানি, সারা মুখ মমি বানিয়ে রাখতে বলা হয়নি। “আজকাল ইউনিভার্সিটির ক্লাসে অনেক নারী-শিক্ষার্থী মুখ ঢেকে বসে থাকে। এটাকে আমার কাছে অভদ্রতা বলেই মনে হয়।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, এই মুখ-ঢাকার সংস্কৃতি সমাজে অপরাধ বাড়াতে পারে। পোস্টটি মোহাম্মদপুরের জোড়া খুনের ঘটনার প্রেক্ষাপটে লেখা হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পোস্টের স্ক্রিনশট দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তিনি অসংখ্য হুমকি, গালমন্দ ও আক্রমণের শিকার হন। পরবর্তীতে ১৭ ডিসেম্বর তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করে আরেকটি পোস্ট করেন, যাতে এটি তার ব্যক্তিগত মতামত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বলে স্পষ্ট করেন।
লায়েকা বশীর অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই বহিষ্কার করেছে। তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও তার রিপোর্ট আসার আগেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তিনি ১৭ বছর ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।
অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ দাবি করে, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই একাধিক অভিযোগ ছিল। গতকাল নতুন সেমেস্টার শুরুর দিন শিক্ষার্থীদের একাংশ মাইক-স্পিকার নিয়ে বিক্ষোভ, প্রেস কনফারেন্স ও অবস্থান ধর্মঘটের ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়। রাত ৮টার দিকে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর বহিষ্কারের ঘোষণা দেন।
এই ঘটনা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শিক্ষক নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। একটি ব্যক্তিগত মতামতকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের সংগঠিত মব, হুমকি ও চাপের মুখে কর্তৃপক্ষের দ্রুত আত্মসমর্পণ অনেকের কাছে উদ্বেগজনক। এছাড়া শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ সংগ্রহের জন্য আলাদা গুগল ফর্ম খোলা হয়েছিল বলেও জানা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করছে। এই ঘটনা শিক্ষাঙ্গনে সহনশীলতা, বাকস্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতার প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালোভাবে সামনে এনেছে।
