তেহরানের আকাশসীমা বন্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন: কাতারে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের সেনা হ্রাস

তেহরানের আকাশসীমা বন্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন: কাতারে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের সেনা হ্রাস
শেয়ার করুন

মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে ইরান রাজধানী তেহরানসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ আকাশসীমা ব্যাপকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ চীন সাগর থেকে একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তর করছে এবং কাতারের আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তাদের সেনা সংখ্যা কমাচ্ছে। এসব পদক্ষেপ একত্রে ইরান ঘিরে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ নতুন একটি নোটাম জারি করে তেহরান ফ্লাইট ইনফরমেশন রিজিয়ন প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। এই নির্দেশনার ফলে সব ধরনের ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে, কেবলমাত্র ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি সাপেক্ষে সীমিতসংখ্যক আন্তর্জাতিক বেসামরিক আগমন ও প্রস্থান অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, এই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরও বাড়ানো হয়েছে, যদিও আকাশসীমা পুরোপুরি কবে খুলবে সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। জার্মানি ও ইউরোপের অন্যান্য দেশ ইতোমধ্যে তাদের বিমান সংস্থাগুলোকে ইরানি আকাশসীমা এড়িয়ে চলার নির্দেশ দিয়েছে।

এই উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য কাতারের আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে তাদের সামরিক উপস্থিতি কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আল-উদেইদ ঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম মার্কিন সামরিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, যেখানে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার মার্কিন এবং প্রায় ১০০ ব্রিটিশ কর্মী অবস্থান করছেন। ঠিক কতজন সেনা প্রত্যাহার করা হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এই আংশিক সেনা প্রত্যাহারকে “প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা” হিসেবে দেখা হচ্ছে। কাতারের সরকার জানিয়েছে, বর্তমান আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটেই যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং দেশটি নাগরিক ও প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা অব্যাহত রাখবে।

এদিকে যুক্তরাজ্য তেহরানে তাদের দূতাবাস সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে এবং কূটনৈতিক কার্যক্রম দূরবর্তীভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। কাতারে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসও আল-উদেইদ ঘাঁটিতে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত সীমিত করার পরামর্শ দিয়েছে।

এই সামরিক ও কূটনৈতিক তৎপরতার পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সরকারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী পদক্ষেপ নেবে। এর জবাবে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করলে তারা পাল্টা প্রতিহত করবে।

তবে সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, তাকে জানানো হয়েছে যে ইরানে হত্যাকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই বক্তব্যকে অনেকেই আপাতভাবে সংযত ও শান্তির ইঙ্গিত হিসেবে দেখলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে সামরিক প্রস্তুতি ও সেনা পুনর্বিন্যাস ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।

ইরানের ভেতরে পরিস্থিতি ক্রমশ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে মুদ্রার মান পতন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেয়। এই আন্দোলন দীর্ঘদিনের ধর্মীয় শাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক অভিযানে বিভিন্ন শহরে কার্যত অলিখিত কারফিউ জারি রয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।

ইরানি কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক দমন অভিযানে ২,৪০০-এর বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে, যদিও সরকারিভাবে এই সংখ্যা অস্বীকার করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সরাসরি গুলি চালানো ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছে। বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে, বহু মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে এবং সাধারণ জনগণ অর্থনৈতিক কষ্ট ও নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে ইতালি, পোল্যান্ডসহ একাধিক দেশ তাদের নাগরিকদের ইরান ত্যাগের পরামর্শ দিয়েছে। জি–৭ দেশগুলোও ইরানের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। সব মিলিয়ে, তেহরানের আকাশসীমা বন্ধ, কাতারে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সেনা হ্রাস, এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি পুনর্বিন্যাস ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরানকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক সংকট দ্রুত একটি বড় সংঘাতের দিকে এগোতে পারে।

Visited 4 times, 1 visit(s) today