২০২৫ সালে শক্তিশালী রপ্তানি প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে চীন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়ানো বাণিজ্য উদ্বৃত্তের কথা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর আরোপিত শুল্ক সত্ত্বেও এই সাফল্য এসেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চীনের বাণিজ্য আচরণ, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা (ওভারক্যাপাসিটি) এবং বিভিন্ন দেশের চীনা পণ্যের ওপর অতিনির্ভরতার প্রশ্নকে আরও তীব্র করতে পারে।
চীনের শুল্ক বিভাগ বুধবার প্রকাশিত তথ্যে জানায়, ২০২৫ সালের পুরো বছরে দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ১.১৮৯ ট্রিলিয়ন ডলার। এটি সৌদি আরবের মতো বিশ্বের শীর্ষ ২০ অর্থনীতির একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সমান। গত নভেম্বরেই প্রথমবারের মতো চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত এক ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছিল।
ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর চীনা পণ্যের ওপর নতুন করে উচ্চ শুল্ক আরোপ করেন। উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা পণ্যের প্রবাহ কমানো এবং মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বিকল্প বাজার ও সরবরাহকারী খুঁজতে উৎসাহিত করা। তবে এসব পদক্ষেপের মধ্যেও চীন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক চাপ মোকাবিলায় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রগামী রপ্তানি কিছুটা কমলেও বিশ্ববাজারে চীনের সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হয়নি।
চীনের শুল্ক প্রশাসনের উপমন্ত্রী ওয়াং জুন বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “বিশ্ব বাণিজ্যের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির গতি এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়, এবং চীনের বৈদেশিক বাণিজ্য উন্নয়নের বহির্বিশ্বীয় পরিবেশ জটিল ও কঠিন রয়ে গেছে।” তবে তিনি এটিও বলেন, “বাণিজ্য অংশীদারদের বৈচিত্র্য বাড়ায় ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষেত্রে চীনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। চীনের বৈদেশিক বাণিজ্যের মৌলিক ভিত্তি এখনো দৃঢ়।”
ডিসেম্বর মাসে চীনের রপ্তানি মূল্যভিত্তিক হিসাবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে নভেম্বর মাসে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.৯ শতাংশ। রয়টার্সের জরিপে অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদরা ডিসেম্বরের জন্য মাত্র ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। একই সময়ে আমদানি বেড়েছে ৫.৭ শতাংশ, যা নভেম্বরের ১.৯ শতাংশ বৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশি এবং পূর্বাভাসের (০.৯ শতাংশ) চেয়েও উচ্চ।
এই ইতিবাচক তথ্য প্রকাশের পর চীনের মুদ্রা ইউয়ান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ দেখা যায়। সাংহাই কম্পোজিট সূচক এবং ব্লু-চিপ সিএসআই ৩০০ সূচক উভয়ই সকালের লেনদেনে ১ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
২০২৫ সালে চীনের মাসিক রপ্তানি উদ্বৃত্ত সাতবার ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল, যেখানে ২০২৪ সালে এমন ঘটনা ঘটেছিল মাত্র একবার। দুর্বল ইউয়ানও আংশিকভাবে এই প্রবণতাকে সমর্থন করেছে। এই তথ্যগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, ট্রাম্পের শুল্ক নীতির ফলে যুক্তরাষ্ট্রগামী রপ্তানি কিছুটা সীমিত হলেও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য কার্যত অক্ষত রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা ধারণা করছেন, চলতি বছরও চীন বৈশ্বিক বাজারে তার অংশীদারিত্ব বাড়াতে থাকবে। এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো চীনা কোম্পানিগুলোর বিদেশে উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন, যার মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে তুলনামূলক কম শুল্কে প্রবেশ করতে পারছে। পাশাপাশি নিম্নমানের চিপ ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্যের শক্তিশালী চাহিদাও রপ্তানিকে সহায়তা করছে।
চীনের গাড়ি শিল্পেও রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে মোট গাড়ি রপ্তানি ১৯.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫৭ লাখ ৯০ হাজার ইউনিটে পৌঁছেছে। এর মধ্যে সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) রপ্তানি বেড়েছে ৪৮.৮ শতাংশ। ২০২৩ সালে জাপানকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পর টানা তৃতীয় বছরের মতো চীন বিশ্বের শীর্ষ গাড়ি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে অবস্থান ধরে রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বেইজিং ক্রমশ বুঝতে পারছে যে, দীর্ঘমেয়াদে সাফল্য ধরে রাখতে হলে শিল্পপণ্যের রপ্তানি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা এবং বিপুল রপ্তানি পরিমাণের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হচ্ছে, সে বিষয়ে দেশটির নেতৃত্ব আরও সচেতন ও সরব হয়েছে।
নভেম্বরে ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্তের তথ্য প্রকাশের পর চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে “আমদানি সক্রিয়ভাবে বাড়ানো এবং আমদানি ও রপ্তানির ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন করার” আহ্বান জানান।
এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধের একটি বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত সৌরশক্তি খাতে চীন রপ্তানি কর ছাড় বা ভর্তুকিসদৃশ সুবিধা বাতিল করেছে। ডিসেম্বর মাসে দেশটির আইনপ্রণেতারা স্বাভাবিক তিন দফার পরিবর্তে দুই দফা পাঠের মধ্যেই বৈদেশিক বাণিজ্য আইন সংশোধন পাস করেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত যে, চীন শিল্প ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আরও উন্মুক্ত ও মুক্ত বাণিজ্যের দিকে অগ্রসর হতে প্রস্তুত।
যদিও গত অক্টোবরের শেষ দিকে ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এক বছরের জন্য শুল্ক যুদ্ধ স্থগিত রাখার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছান, তবু বর্তমানে চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের গড় শুল্কহার ৪৭.৫ শতাংশে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই হার প্রায় ৩৫ শতাংশের সীমার অনেক ওপরে, যা চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রে লাভজনকভাবে রপ্তানি করা কঠিন করে তুলছে।
