নিজস্ব প্রতিবেদক
সৌদি আরবে একজন প্রবাসী জামায়াত নেতার ঠিকানায় একসঙ্গে বড় পরিমাণ পোস্টাল ব্যালট পাঠানোর অভিযোগ ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আগে বিদেশে পাঠানো ব্যালট নিয়ে নানা অনিয়মের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এরইমধ্যে সৌদির এই ঘটনা নির্বাচন কমিশন (ইসি) বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে কি না—এ প্রশ্ন তুলছে সংশ্লিষ্টরা।
নতুন একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সৌদি আরবে লিয়াকত নামে এক প্রবাসীর ঠিকানায় কয়েকশ পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন প্রবাসীরা।
ভিডিওতে অভিযোগ করা হয়, ব্যালটগুলো জামায়াতের স্থানীয় নেতার নিয়ন্ত্রণে গিয়ে পড়ছে, যা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।
ইসির হিসাব অনুযায়ী, সৌদি আরবেই সবচেয়ে বেশি প্রবাসী ভোটার নিবন্ধিত—২ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি। এই বিপুল সংখ্যার মধ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তির ঠিকানায় শতাধিক ব্যালট যাওয়ার অভিযোগে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বাহরাইনের হিদ এলাকার একটি ঘরে পোস্টাল ব্যালটের খাম গুনতে দেখা যায় কয়েকজনকে। ভিডিওতে খামের ওপর বাহরাইনের ঠিকানা স্পষ্ট দেখা যায়। দুই ধাপে গণনায় সেখানে ৪৯০টি ব্যালট পাওয়া যায়। সেখানে যিনি বাস করেন তিনি স্থানীয়ভাবে জামায়াতে ইসলামীর এক নেতা বলে জানানো হয়। ভিডিওতে একজনকে বলতে শোনা যায়— “ভিডিও কইরেন না… ফেসবুকে ছাইড়েন না।”
বাহরাইন জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি জয়নাল আবেদীন জানান, প্রবাসী শ্রমিকদের অনেকের ঠিকানা ঠিকঠাক না থাকায় তারা নিজেদের অথবা আশপাশের দোকানের ঠিকানা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ভোট কারসাজির উদ্দেশ্যে তারা কিছু করেননি।
কুয়েত থেকেও একই ঠিকানায় একাধিক ব্যালট পাঠানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে প্রবাসীরা জানাচ্ছেন। এসব দেশে পোস্টাল ব্যালট কার্যক্রম শুরুর পরই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় কর্মীদের তৎপরতা বাড়ে।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অবশ্য এসব অভিযোগ নাকচ করেছে। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, বাহরাইনে জামায়াতের কোনো কমিটি নেই এবং ভিডিওটির সঙ্গে দলের সংশ্লিষ্টতা নেই।
নির্বাচন কমিশন বলছে, বিদেশে পোস্টাল ব্যালট পরিবহন পুরোপুরি স্থানীয় ডাক বিভাগের ওপর নির্ভর করে। কোন ঠিকানায় কীভাবে ব্যালট গেছে—তা যাচাই করে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, নিয়ম ভঙ্গ হয়েছে কি না তা তদন্তের পরই বলা যাবে। সৌদির ডাক ব্যবস্থায় ব্যালট বিতরণ কীভাবে হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদন আনা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে বাহরাইন ও কুয়েতেও একই ঠিকানায় বহু ব্যালট যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পর নির্বাচন কমিশনের ওপর বিশেষ সুবিধার প্রশ্ন তুলছে রাজনৈতিক দলগুলো।
বিএনপি পোস্টাল ব্যালট বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে। দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান বলেন, ব্যালট নিয়ে কারচুপির চেষ্টা হচ্ছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিএনপি অভিযোগ করেছে, ব্যালটে প্রতীকের অবস্থান এমনভাবে রাখা হয়েছে যে ভাঁজ করলে ‘ধানের শীষ’ মাঝামাঝি পড়ে এবং কম চোখে পড়ে। এখনো যেসব দেশে ব্যালট পাঠানো হয়নি, তা সংশোধন করার দাবি জানিয়েছে দলটি।
ইসি বলছে, নিয়ম ভঙ্গ হয়েছে কি না খতিয়ে দেখা হচ্ছে
ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, ভিডিওতে ১৬০টি ব্যালট দেখা গেছে এবং কোনো খাম খোলা হয়েছে—এমন কিছু দেখা যায়নি। তিনি বলেন, বাহরাইনে ডাক বিভাগ কী প্রক্রিয়ায় ব্যালট সরবরাহ করেছে, তা তদন্ত করে জানাবে। ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নের নিয়মে এসব ব্যালট পাঠানো হয়; একেক দেশে ডাক ব্যবস্থার পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে বলেও জানান তিনি।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছেন, এ বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থায় কিছু সমস্যা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। অনিয়মের তথ্য পেলে তা যাচাই করা হবে।
