নিজস্ব প্রতিবেদক
জানুয়ারি ১২, ২০২৬: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের (ইউনূস সরকার) অধীনে দেশের অর্থনৈতিক চিত্রে রাজস্ব আয় আশানুরূপ না হওয়া সত্ত্বেও সরকারি ব্যয় বেড়েছে, যার ফলে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা এই প্রবণতাকে ব্যাংকিং খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম কয়েক মাসে (জুলাই-নভেম্বর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ২৪,০০০ কোটি টাকা পিছিয়ে রয়েছে। এই সময়ে সংগ্রহ হয়েছে প্রায় ১.৪৯ লাখ কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি হলেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম। আমদানি কম হওয়ায় কাস্টমস রাজস্বে বড় ধাক্কা লেগেছে। এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা বর্তমানে ৫.৬৪ লাখ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭.৬ শতাংশ বেশি। কিন্তু প্রথম পাঁচ মাসের প্রবণতা দেখে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
অন্যদিকে, পরিচালন ব্যয় (অ-উন্নয়ন ব্যয়) বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে (৭.৯০ লাখ কোটি টাকা) পরিচালন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৫.৬০ লাখ কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনায় ২৮,০০০ কোটি টাকা বেশি। এর মধ্যে বেতন-ভাতা, ভর্তুকি, ঋণের সুদ পরিশোধ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মতো বাধ্যতামূলক খাতগুলোতে ব্যয় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, কিন্তু সামগ্রিক পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। উন্নয়ন ব্যয় (এডিপি) কমানো হয়েছে ৩৫,০০০ কোটি টাকা করে ২.৩০ লাখ কোটি টাকায়, যা বাজেটের সংকোচনমূলক দিক প্রকাশ করে।
এই রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ায় বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর ৮ তারিখ পর্যন্ত সরকারি ঋণ নেওয়া হয়েছে ৪৫,২৩৯ কোটি টাকা, যা আগের সময়ের নেট নেগেটিভ ঋণের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। অক্টোবর ২০২৫-এ সরকারি খাতের ক্রেডিট গ্রোথ ২৪.১১ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে বেসরকারি খাতের ক্রেডিট গ্রোথ কমে ৬.২৩ শতাংশে নেমেছে—২৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই প্রবণতা ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট সৃষ্টি করছে এবং সুদের হার বাড়িয়ে বেসরকারি বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বাজেট ঘাটতি ২.২৬ লাখ কোটি টাকা (জিডিপির ৩.৬ শতাংশ), যার মধ্যে ১.২৫ লাখ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস (ব্যাংকসহ) থেকে এবং বাকি বিদেশি ঋণ থেকে মেটানোর পরিকল্পনা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজস্ব সংগ্রহে দুর্বলতা অব্যাহত থাকলে ব্যাংক থেকে আরও বেশি ঋণ নেওয়া হবে, যা বেসরকারি খাতকে ‘ক্রাউড আউট’ করে ফেলবে।
অন্তর্বর্তী সরকার রাজস্ব বৃদ্ধি, সংস্কার এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই চাপ কমানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু রাজস্ব ঘাটতি অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছেন।
