আজারবাইজানের সাথে ইউনূস সরকারের এলএনজি চুক্তি: ‘ড্রিল বেইবি ড্রিল’ ধারার আরেক পাবলিসিটি স্টান্ট?

আজারবাইজানের সাথে ইউনূস সরকারের এলএনজি চুক্তি: ‘ড্রিল বেইবি ড্রিল’ ধারার আরেক পাবলিসিটি স্টান্ট?
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত—সুইজারল্যান্ডভিত্তিক SOCAR Trading SA-এর সাথে স্বল্পমেয়াদি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির জন্য জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) পদ্ধতিতে চুক্তি প্রক্রিয়াকরণ—নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা উঠেছে।

এই চুক্তিকে অনেকে “লোক দেখানো পাবলিসিটি স্টান্ট” এবং অপ্রয়োজনীয় বলে অভিহিত করছেন। কারন SOCAR সুইস কোন কোম্পানি নয় বরং চরম দুর্ণিতি ও মানিলন্ডারিং এর দায়ে অভিযুক্ত আজারবাইজান এর একটি রাষ্ট্রয়াত্ব প্রতিষ্ঠান।

গত ৩০শে ডিসেম্বর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদের সভায় এই প্রস্তাব নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে। SOCAR Trading SA আজারবাইজানের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল-গ্যাস কোম্পানি SOCAR-এর বাণিজ্যিক শাখা, যার সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়। সুইজারল্যান্ড কোনো তেল-গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ নয়, ফলে জিটুজি চুক্তি সরাসরি আজারবাইজানের সাথে নয় বরং একটি বাণিজ্যিক ট্রেডিং কোম্পানির সাথে হচ্ছে—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি থার্ড-পার্টি সোর্সিংয়ের মতোই, যা স্পট মার্কেট থেকে সরাসরি কেনার সমতুল্য, কিন্তু অতিরিক্ত মার্জিন যোগ করে খরচ বাড়াতে পারে।

সমালোচকদের মতে, এই চুক্তি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অপ্রয়োজনীয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা বাংলাদেশের বিদ্যমান লং-টার্ম চুক্তি (কাতার ও ওমান থেকে) ২০২৬ সাল থেকে যথেষ্ট সরবরাহ নিশ্চিত করবে, এবং বর্তমান স্পট মার্কেটে এলএনজি দাম তুলনামূলক কম (প্রায় ৯-১০ ডলার/MMBtu)। এ অবস্থায় নতুন স্বল্পমেয়াদি চুক্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে।

এছাড়া SOCAR-এর বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী দুর্নীতি, ঘুষ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে, যা চুক্তির ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।

আরও গুরুতর সমালোচনা উঠেছে চুক্তি প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে যুক্ত না করা নিয়ে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রস্তাব হলেও পেট্রোবাংলা বা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পূর্ণাঙ্গ সম্পৃক্ততা ছাড়াই এগোনো হয়েছে বলে অভিযোগ। এতে চুক্তির বৈধতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের স্বল্প মেয়াদ বিবেচনায় এমন দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে এমন চুক্তি করা উচিত নয় বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

চুক্তির পটভূমিতে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো—গত ৭ই ডিসেম্বর আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের দুই কন্যা লেইলা আলিয়েভা ও আরজু আলিয়েভা প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাতে বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতার কথা উঠলেও পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এলএনজি চুক্তি নিয়েই মূল আলোচনা হয়েছে। এটি চুক্তির পিছনে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রভাবের সন্দেহ জাগিয়েছে।

এর আগেও আশিক চৌধুরি যুক্তরাষ্ট্রের আর্জেন্ট এলএনজি (Argent LNG) কোম্পানির সাথে বছরে ৫০ লাখ মেট্রিক টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির একটি বড় নন-বাইন্ডিং (বাধ্যতামূলক নয়) চুক্তি করে, যা ট্রাম্প প্রসাশনের সাথে করা প্রথম “বিগ ডিল” দাবি করে অন্তর্বর্তী সরকার। যদিও আর্জেন্ট এলএনজি বর্তমানে কোন এলএনজি প্ল্যান্ট নাই, কোম্পানিটি ২০৩০ সাল নাগাদ এলএনজি প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগই জ্বালানি নিরাপত্তার স্থায়ী সমাধান। এ ধরনের অস্বচ্ছ ও অপ্রয়োজনীয় চুক্তি বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বাড়াবে এবং দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত এই চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় জ্বালানি নীতি নির্ধারণ করা।

Visited 41 times, 1 visit(s) today