নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা, ১ জানুয়ারি ২০২৬: বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামী বিদেশী কূটনীতিক ও সংস্থাগুলোর সাথে ব্যাপক যোগাযোগ রক্ষা করছে। সূত্রমতে, গত ছয় মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কর্মকর্তা, ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই), ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের প্রতিনিধি এবং পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের সাথে জামায়াতের অন্তত অর্ধ শতাধিক টির বেশি বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে নির্বাচনী পরিস্থিতি, দলের ম্যানিফেস্টো, ভিশন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
জামায়াত এই পশ্চিমা ও পাকিস্তানি প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎগুলোকে ব্যাপকভাবে প্রচার করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের আগস্টে আইআরআই-এর একটি প্রতিনিধিদল জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বৈঠক করে, যা দলটি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছে। একইভাবে, মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা সিলেটসহ বিভিন্ন স্থানে জামায়াত নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন, যা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখিত হয়েছে। পাকিস্তানি প্রতিনিধিদের সাথেও যোগাযোগ প্রকাশ্যে প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎগুলোতে জামায়াতের অবস্থান একেবারেই বিপরীত।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক সাক্ষাৎকারে জামায়াতের আমির ড. শফিকুর রহমান স্বীকার করেছেন যে, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে একজন ভারতীয় কূটনীতিকের সাথে তাঁর বৈঠক হয়েছে। তবে ওই বৈঠক গোপন রাখার অনুরোধ এসেছিল ভারতীয় পক্ষ থেকে। জামায়াত এই সাক্ষাৎকে প্রকাশ্যে প্রচার করেনি, যা পশ্চিমা ও পাকিস্তানি বৈঠকগুলোর সাথে স্পষ্ট বৈপরীত্য।
এই গোপনীয়তার পেছনে জামায়াত-শিবিরের সোশ্যাল মিডিয়ায় দীর্ঘদিনের ভারত-বিদ্বেষী প্রচারণাই পায়ে কুড়াল মারার কারন হয়েছে, বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। জামায়াত ও তার ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদ’, ‘দিল্লির দাসত্ব’ এবং ভারত-বিরোধী ন্যারেটিভ ব্যাপকভাবে প্রচার করে আসছে। এ ধরনের প্রচারণা তাদের সমর্থকদের মধ্যে ভারত-বিদ্বেষী সেন্টিমেন্টকে চাঙ্গা রেখেছে। ভারতীয় প্রতিনিধিদের সাথে সমঝোতামূলক বৈঠকের খবর প্রকাশ পেলে এই ভারত-বিদ্বেষী সমর্থকদের কাছে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হতে পারে—এই আশঙ্কা থেকেই গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন প্রকাশের পর জামায়াতের আমির বলেছেন, “গোপনীয়তার কিছু নেই” এবং এটিকে ড্যামেজ কন্ট্রোলের অংশ হিসেবে দেখছেন অনেকে। তবে বৈঠকের কথা প্রকাশ্যে না আনার চেষ্টা এবং অন্যান্য বিদেশী যোগাযোগের সাথে সমার্থকদের “আই ওয়াশ” এর এই চেষ্টা থেকে স্পষ্ট যে, জামায়াতের পক্ষে গোপন করার যথেষ্ট কারণ ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই দ্বিমুখী নীতি নির্বাচনী কৌশলের অংশ। একদিকে পশ্চিমা সমর্থন লাভের জন্য প্রকাশ্য যোগাযোগ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সমর্থকদের ধরে রাখতে ভারতের সাথে গোপনীয়তা। এতে দলের ভারত-বিরোধী ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে, যা আসন্ন নির্বাচনে তাদের ইসলামপন্থী ভোটব্যাঙ্ককে মজবুত করতে সাহায্য করবে। তবে এ ধরনের গোপনীয়তা বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
