অসহযোগ আন্দোলনঃ একাত্তর (পর্ব-২)

অসহযোগ আন্দোলনঃ একাত্তর (পর্ব-২)
শেয়ার করুন

সংকলনঃ দ ম আহমেদ

কি পেলাম আমরা তার জবাব কোথায়?

সাতই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু দেশবাসীর সামনে, বিশ্ববাসীর কাছে, পাকিস্তানের সামরিক জান্তার নিকট যে প্রশ্ন করেছিলেন, সেই প্রশ্নই বাঙালীর সামনে প্রকট হয়ে উঠলো পয়লা মার্চের পরে। সাধারণ লোকে না বুঝলেও অভিজ্ঞমহল ঠিকই বুঝেছিলো ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে ইয়াহিয়া খানের বেসামরিক মন্ত্রিসভা বাতিলের কি অর্থ: তিরিশে জানুয়ারি ভারতের একটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই কি গুরুত্ব বহন করে। গুরুত্ব পরিষ্কার সামরিক প্রস্তুতি, দেশবাসীয় দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়া, ভারতবিরোধী মনোভাব গড়ে তোলা। প্রেসিডেন্ট গতকালের বেতার বিবৃতিতে ভারতের বিরুদ্ধে যে বক্তব্য রাখেন তাতে বাঙালীর মনোভাব বিন্দুমাত্র বিভ্রান্ত হয়নি; দীর্ঘ তেইশ বছরের শাসন, শোষণ আর বঞ্চনার ইতিহাস থেকে মানুষ বুঝেছে, যখনই বাঙালীর ন্যায্য দাবী উঠেছে তীব্র হয়ে, তখনই নানা কৌশলে ভারতের ষড়যন্ত্র অথবা কমুনিস্টদের চক্রান্ত বলে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেবার চেষ্টা করা হয়েছে। এবারে বাঙালী অনেক বেশি সচেতন।

বাঙালী দেখেছে, ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান ছিলো পুরোপুরি অরক্ষিত, দেখেছে ছয় দফা আন্দোলনকে দমন করার জন্যে, উনসত্তরের নজিরবিহীন গণআন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্যে মানুষ হত্যা করা হয়েছে নির্বিচারে। সর্বোপরি দেখেছে ১৯৭০-এর বারোই নভেম্বরে দক্ষিণাঞ্চলে স্মরণাতীতকালের ভয়াবহ ঝড় ও জলোচ্ছাসে হাজার হাজার লোকের মৃত্যুর বারোদিন পর পর্যন্তও প্রেসিডেন্ট উপদ্রুত এলাকা দেখতে আসেন নি, এসেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাহায্য সহানুভূতি, আসেনি পশ্চিম পাকিস্তানের সামান্য সমবেদনা। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে–কি পেলাম আমরা?

বাঙালী বিভিন্ন সময়ে পেয়েছে গুলি; ১৯৭১-এর পয়লা মার্চেও তার কোনো ব্যতিক্রম ঘটলো না; দোসরা মার্চে দেশবাসী জানলো ঢাকা শহরে সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করা হয়েছে; সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত তিনজন, আহত ষাট। ফার্মগেটে গুলিবর্ষণ। চৌদ্দ বছরের কিশোর আমানুল্লাহ কি জানতো সে আর কোনোদিন মায়ের কাছে ফিরে যেতে পারবে না; আটাশ বছরের তাজুল হক ও ওই বয়সেরই আরেকজন ভুলেও ভাবেনি তাদের কণ্ঠে আর কোনোদিন আকাশ-কাঁপানো ‘জয়বাংলা’ স্লোগান উচচারিত হবে না।

কিন্তু তাদের বিদেহ আত্মা দেখলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের সভায় মানুষ দেখলো, দেশবাসী জানলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে পশ্চিমদিকের প্রবেশপথের মাথায় গাঢ়-সবুজ রংয়ের পটভূমিতে লাল সূর্য ও তার মাঝখানে বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা একটি পতাকা উড়ছে, যে পতাকার সঙ্গে পাকিস্তানের পতাকার কোনো মিল নেই। পতাকা উত্তোলনে নেতৃত্ব দিলেন ছাত্রনেতা আ. স.ম. আবদুর রব ও ছাত্রনেতা শাহজাহান সিরাজ। দোসরা মার্চেই বাংলাদেশ তার পতাকা পেয়ে যায়। এই পতাকাই পাকিস্তানের জাতীয় দিবস ২৩শে মার্চে যখন সারা বাংলাদেশে উড়তে থাকে তখন কারো বুঝতে বাকি থাকে না যে A new flag is born today—a flag with a golden map of Bangladesh implanted on a red circle placed in the middle of deep green rectangle base. This is the latest flag added to the total list of the flags representing various States and Nations of the contemporary world. This is the flag for “Independent Bangladesh”. This is the flag that symbolizes the emancipation 75 million Bengalees.

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের প্রতিবাদ সভা হওয়ার কথা সকাল এগারোটায়। সকাল দশটার মধ্যেই মাঠ ভতি; মানুষ এগারোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি নয়, সভা সাড়ে দশটাতেই শুরু হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরেই রক্তাক্ত জামা গায়ে একজন দৌড়াতে দৌড়াতে এসে ফার্মগেটে গুলির খবর জানায়; মুহূর্তে প্রতিবাদ সভা পরিণত হয় বিক্ষোভ মিছিলে; সভাপতির ভাষণ শোনার অপেক্ষা কেউ করে না। প্রায় প্রত্যেকের হাতে বাঁশের লাঠি; মুখে আপোষহীন সংগ্রামের প্রতিজ্ঞা ও কণ্ঠে ‘জয় বাংলা’, ‘তোমার দেশ আমার দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ’, ‘তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব’ স্লোগান।

দোসরা মার্চের হরতাল থেকেই বঙ্গবন্ধুর স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে- শৃঙ্খলার সাথে হরতাল পালন করুন।

একটি বিবৃতির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হরতাল পালনের নির্দেশ দিয়ে সাথে সাথে দেশবাসীকে হুশিয়ার করে দিয়ে বললেন- পেশাদার উস্কানিদাতাদের সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। মুক্তি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে। ওইদিনই তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে জানালেন ‘যড়যন্ত্র নস্যাৎ করা প্রতিটি বাঙালী সরকারী কর্মচারীর কর্তব্য।’

যে বিমানে নির্বাচিত সদস্যরা জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ করার জন্যে ঢাকায় আসবেন সেই বিমানে আসতে লাগলো সৈনিক। বেসামরিক পোষাকে। আটাশে ফেব্রুয়ারি রাতে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রথম সৈন্যদল ঢাকায় এসে পৌঁছায়। উল্লেখযোগ্য, ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারি থেকেই গণহত্যার প্রস্তুতি শুরু। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে সেনাবাহিনীর নবম এবং ষোড়শ ডিভিশনকে সদা প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছিলো। অন্তত দুই থেকে তিন সপ্তাহ আগে খারিয়ান ও কোয়েটা সেনানিবাসের কিছু সৈন্য পূর্ব পাকিস্তানে আসার নির্দেশ পায়।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, গণতহ্যার পরিকল্পনা শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলোনা, এটা বিস্তৃত ছিলো সুদূর আমেরিকার হোয়াইট হাউস পর্যন্ত। লক্ষ্য করবে: “পরবর্তীকালে প্রকাশিত তথ্যাদি থেকে দেখা যায়, পূর্ববাংলার মানুষের নির্বাচনী রায় সামরিক পন্থায় নস্যাৎ করার জন্য ফেব্রুয়ারি থেকে পাকিস্তানী জান্তা যে প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছিলো, সে সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র অনেক কিছুই অবহিত ছিল এবং এ ব্যাপারে উচ্চবাচ্য না করে পরোক্ষভাবে জান্তাকে সমর্থন করাই তাদের সরকারী নীতি ছিল। মার্চে শেখ মুজিবের সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কয়েক দফা বৈঠকের ঘটনা থেকেও অনুমান করা যায় যে, এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ততটা নিষ্ক্রিয় ছিল না। মার্চ-এপ্রিলে অনুসৃত মাকিন নীতির প্রতিবাদ জ্ঞাপন করার ফলে নিজেদের ঢাকাস্থ কন্সাল জেনারেল আর্চার ব্লাডকে এপ্রিল মাসে রাতারাতি বদলী করে মার্কিন সরকার তাঁদের গোপন সমর্থনের কথা প্রথম প্রকাশ করেন।” (মূলধারা ‘৭১-মঈদুল হাসান পৃ: ৬৫/৬৭)

মার্কিন সরকারের সরকারী নীতি যে ছিলোই তার অকাট্য প্রমাণ রয়েছে ১৯৮০ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত এশিয়ান সার্ভে’-তে, Kissinger convened the SRG (Senior Review Group) meeting (On March 6 ’71), attended by senior representatives from State, Defence and CIA, to review U.S. options in face of mounting tensions between the two West Pakistani leaders, Yahya Khan and Zulfikar Ali Bhutto, and the East Pakistani leader Mujibur Rahman (Mujib). At this first SRG meeting on South Asia, Under-Secretary of State for Political Affairs Alexis Johnson expressed the State Department view that the crisis was neither an issue between the major powers nor a matter of U.S-Indian confrontation. The Soviets, Indian and Americans, Johnson asserted, all considered that their interests were served by continuation of a united Pakistan, Johnson suggested that one option for the U.S. was to try to discourage President Yahya Khan from using force in East Pakistan against Mujib and Awami League followers. But he did not press the point after Kissinger cautioned SRG members to keep in mind President Nixon’s “special relationship” with Yahya a relationship that surprised and perplexed the participants. The President, he said, would be reluctant to suggest that Yahya exercise restraint in East Pakistan…. Following this cautionary note and further discussion at various alternatives, the SRG members concluded that ‘massive inaction’ was the best policy for the U.S.” (Asian survey, April, 1980, p. 340-1).’

দোসরা, মার্চ ঢাকায় হরতাল, সমগ্র বাংলাদেশে তেসরা মার্চ। আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে ছয়ই মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশব্যাপী হরতালে সমস্ত সরকারী অফিস সেক্রেটারিয়েট সমস্ত কোর্টকাচারি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান পি, আই. এ. রেলওয়ে কলকারখানা বাজার বন্ধ থাকবে সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত।

তবে অ্যাম্বুলেন্স, সংবাদপত্র, ওষুধের দোকান, বিদ্যুৎ, পানি হরতালের আওতায় পড়বে না। বঙ্গবন্ধ হরতালের ফলে সৃষ্ট গরীব মানুষের কষ্টের কথা ভুলে যান না বলে জনগণকে রিক্সাওলা, বেবী ট্যাক্সিওলা, মুটে মজুরদের বেশি পয়সা দেবার অনুরোধ করেন তেসরা মার্চে।

– পৃষ্ঠাঃ ২২-২৬, অসহযোগ আন্দোলনঃ একাত্তর, রশীদ হায়দার

 

Visited 14 times, 1 visit(s) today