– দেওয়ান মাবুদ
খেলা যে ড্র হচ্ছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। শেষ-দিনের খেলা শেষ হতে আরো আড়াই ঘণ্টা বাকি, দর্শকরা খেলা দেখছেন পাকিস্তান দ্বিতীয় ইনিংস কতো রানে শেষ করে দেখার জন্য, দেখছেন অষ্টম জুটি কতো রান করেন। ব্যাটিংয়ে তখন ওয়াসিম ও সরফরাজ: পাকিস্তান প্রথম ইনিংসে করেছে ২০০, দ্বিতীয় ইনিংসে আট উইকেটে ৩০৬। খেলা চলছে পাকিস্তান ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড ও কমনওয়েলথ একাদশের মধ্যে। কমনওয়েলথ একাদশের প্রথম ইনিংসে ৩৭৮।
খেলা ড্র, অতএব জয় পরাজয়ের উত্তেজনা নেই, ফাগুনের চড়া রোদ মাথায় নিয়ে দর্শকরা খেলা দেখছেন; ভালো বোলিং হলে, ভালো চার বা ছক্কা মারলে, নয়ন-ভোলানো ফিডিং হলে দর্শকরা উল্লাস করছেন, কিন্তু তখনো কে জানে সেই উল্লাস কিছুক্ষণের মধ্যেই ফেটে পড়বে প্রতিবাদে, সাধারণ প্রতিবাদ নয়, অনিবার্য বিপর্যয়ের হাত থেকে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার মরণপণ বিস্ফোরণ।
দিনটি পয়লা মার্চ ১৯৭১। সোমবার। সময় দুপুর ১টা ৫ মিনিট।
হঠাৎ টেডিয়াম-কাঁপানো প্রতিবাদ; হাজার হাজার বাঙালীর একত্র-প্রতিবাদ সমুদ্রের গর্জনকে, প্রলয়ংকরী ঝড়কেও যেন হার মানায়, পাকিস্তানের খেলোয়াড় দুজন, ফিল্ডিংয়ে কমনওয়েলথ একাদশের এগারোজন ও আম্পায়াররা বিমূঢ় হয়ে দেখলেন, স্টেডিয়ামের গ্যালারী ছেড়ে জলপ্রপাতের মতো মানুষের ধারা নেমে আসছে। তাদের ক্রুদ্ধ চোখ মুখ, উর্ধমুখী বজ্রমুষ্টি আর ‘মানিনা, মানিনা’ গর্জন বুঝি স্টেডিয়ামকে গুঁড়ো করে ফেলবে। না, খেলোয়াড়দের বোঝার কথা নয় কেন খেলার উল্লাস ছেড়ে সংগ্রামী আবেগ, কেন ‘মানিনা, মানি না’। কি মানে না? কি চায় তারা?
দর্শকরা মাঠে ঢোকবার আগেই খেলোয়াড় ও আম্পায়াররা দৌড়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে গেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্যাভিলিয়নে আগুন; খেলোয়াড়রা তাড়াহুড়ো করে ট্রাকে চড়ে সোজা ক্যান্টনমেন্ট। পাকিস্তান নামক একটি দেশের পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে এই তাদের শেষ খেলা অসমাপ্ত।
ঘটনার আকস্মিকতায় ক্রিকেট খেলা অসমাপ্তভাবে শেষ হলেও পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রায় দেড় হাজার মাইল দুরে রাজধানী ইসলামাবাদে যে-খেলা চলছিলো তা অসমাপ্ত রাখার উদ্দেশ্যে নয়, বাঙালী জাতিকে চিরদিনের জন্যে পঙ্গু ও মুখাপেক্ষী করে রাখার জন্যে চলছিলো সুচিন্তিত ঘুঁটি চালাচালি। তারই ফল, তেসরা মার্চে ঢাকায় জাতীয় পরিষদে যে অধিবেশন বসার কথা তা অনির্দিষ্টকালের জন্যে স্থগিত হয়ে গেল; তারই প্রত্যক্ষ ফল: ‘মানিনা, মানিনা’; ‘জয় বাংলা’ গগণবিদারী ধ্বনি।
স্টেডিয়ামে অসংখ্য দর্শক রেডিও নিয়ে খেলা দেখতে গেছেন। উদ্দেশ্য, খেলা দেখা ও ধারাবিবরণী শোনা। হঠাৎ রেডিওতে ঘোষণা: এখন প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের একটি বিশেষ ঘোষণা প্রচার করা হচ্ছে। ঘোষণাটি কে পাঠ করলেন তা বলা হয়নি। মানুষ অবাক হয়ে শুনলো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা প্রেসিডেন্টের কণ্ঠে নয়; শুনলো, ‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কর্তৃক জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত’। ইয়াহিয়ায় বিবৃতির পূর্ণ বিবরণ:
..Today. Pakistan faces her gravest political crisis. I, therefore, consider it necessary to appraise you of the situation and action that propose to take to resolve our present difficulties. But before I do that let me recount to you the steps that I took from the day that the responsibility for the administration of this country devolved on me to transfer power to the elected representatives of the people.
In my very first address to the nation I had indicate the need for the smooth transfer of power. Since then we have moved forward step by step towards the achievement of this aim.
In spite of there being Martial Law in the country I did not ban the political parties and in fact permitted full political activity with effect from first of January 1970. Later in March 1970 the Legal Framework Order under which elections were to be held, was duly notified. All other Work, including delimination of constituencies and preparation of electoral rolls, was completed with speed.
The election campaign which has long and odorous, ended up in, what we may all claim with pride one of the most peaceful and well-organized general elections on the basis of adult franchise. As You know, the elections were finally completed on 17th January 1971.
Just prior to elections in my address of the 3rd of December, 1970, I had suggested to the leaders of the political parties that it would be useful for them to employ the period between the elections and the first session of the National Assembly in meeting each other and arriving at a consensus on the main provisions of our future constitution.
I had, at the time, indicated that to be useful these meetings would call for spirit of give and take, trust in each other and realisation of the extreme importance of this particular juncture in our history. Appreciating the great significance of such exchanges of view between political leaders I tried to facilitate the process by giving them enough time to do so. I, therefore, decided to fix the third of March as the inaugural session of our National Assembly.
In the past few weeks certain meetings between our political leaders have indeed taken place. But I regret to say that instead of arriving at a consensus some of our leaders have taken hard attitudes. This is most unfortunate. The political confrontation between the leaders of East Pakistan and those of the West is a most regrettable situation. This has cast a shadow of gloom over the entire nation. The position briefly is that the major party of West Pakistan, namely, the Pakistan People’s Party, as well as certain other political parties, have declared their intention not to attend the National Assembly session on the third of March, 1971. In addition, the general situation of tension created by India has further complicated the whole position. I have, therefore, decided to postpone the summoning of the National Assembly to a later date.
I have repeatedly stated that a constitution is not an ordinary piece of legislation but it is an agreement to live together. For a healthy and viable constitution, therefore, it is necessary that both East and West Pakistan have in adequate sense of participation in the process of constitution making.
Needless to say I took this decision to postpone the date of the National Assembly with a heavy heart. One has, however, to look at the practical aspects of such problems, I realized that with so many representatives of the people of West Pakistan keeping away from the Assembly if we were to go ahead with the inaugural session on the 3rd of March the Assembly itself could have disintegrated and the entire effort made for the smooth transfer of power that has been outlined earlier would have been wasted.
It was, therefore, imperative to give more time to the political leaders to arrive at a reasonable understanding on the issue of Constitution-making. Having been given this time I have every hope that they will rise to the occassion and resolve this problem. I wish to make a solemn Promise to the people of Pakistan that as soon as the environments onumerated earlier become conducive to Constitution making I will have no hesitation in calling the Session of the Assembly immediately. As for myself, I would like to assure my countrymen that I shall do everything in my power to help the political leaders in achieving our common goal with even handed justice which I have all along been doing.
In the end. I pray to Almighty Allah to guide us all In acting according to the dictum of the Father of the Nation, namely, ‘faith, unity and discipline’, I appeal to the political leaders and all my countrymen to exercise the utmost restraint at this grave hour of our lives.”
কিন্তু হঠাৎ কেন এই স্থগিত ঘোষণা? এমনটা তো হওয়ার কথা নয়। কিছুদিন আগেই কয়েকজন সিনিয়র স্টাফ অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে আলোচনার জন্যে ঢাকা এসে, ইসলামাবাদ ফেরার সময় ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী’ ঘোষণা করে গেছেন; সবাই জানে মার্চে ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন। ১৩ ফেব্রুয়ারী ‘৭১ তারিখে প্রচারিত সংক্ষিপ্ত ঘোষণাও ছিলো: প্রেসিডেন্ট জেনারেল এ. এম. ইয়াহিয়া খান আনন্দের সঙ্গে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র তৈরি করার জন্যেই আগামী ৩ মার্চ ১৯৭১ সকাল ৯টায় প্রাদেশিক গণপরিষদ ভবনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠানের আহ্বান করেছেন। অধিবেশন প্রথমে হওয়ার কথা ছিলো ফেব্রুয়ারির পনর তারিখে, কিন্তু ভুট্টোর অনুরোধে তাএলো মার্চে, তারপরেও স্থগিত কেন?
এখানে আমাদের ইতিহাসের দিকে একটু ফিরে তাকাতে হয়, ফিরে শুনতে হয় কয়েকদিন আগেই জাতীয় পরিষদে যোগদান না-করা সম্পর্কে জুলফিকার আলী ভুট্টো কি বলেছিলেন। ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তিনদিন ব্যাপী আলোচনার পর ৩০ জানুয়ারি ১৯৭১ সাংবাদিকদের কাছে যা বলেন তার মধ্যেই ভবিষ্যৎ-জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের অনিশ্চয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি বলেন: “প্ৰকৃতপক্ষেই আমাদের বিস্তর প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এবং এগুলো দূর করার জন্যে পুরো ফেব্রুয়ারি মাসই লাগতে পারে।”…… “সংলাপ চলবে; একেবারে থেমে যায়নি।” “আমরা একে অপরের সমস্যা বুঝতে পেরেছি। পরবর্তী সময়ে আলোচনায় বসার আগে আমাদের নিজ নিজ অঞ্চলের জনগণের কাছে মনোভাব ব্যাখ্যা করতে হবে। পাকিস্তানের বিগত ২৩ বছরের নানা বিষয়ে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা বিরাট সমস্যা এবং অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। যেসব সমস্যা ২৩ বছর ধরে জমেছে তা মাত্র তিনদিনে সমাধান করা কিভাবে সম্ভব?”
স্পষ্টতই এসব ছিলো টালবাহানা। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের বঞ্চনা সম্পর্কে অত্যন্ত সহানুভূতিশীল এ-কথা যেমন বলতে ভুলছেন না, তেমনি বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা ও ছাত্রদের ১১ দফা, মোট ১৭ দফার মধ্যে ৫টি দফা মেনে নিতে তাঁর প্রবল আপত্তি। ১৫ ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন সম্পর্কে ও তাঁর অস্পষ্ট মনোভাব বিদ্যমান: ‘পুরো ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময় নেবার মধ্যে দোষের কিছু নেই।’ আটাশে ফেব্রুয়ারিতেই লাহোরে ভুট্টো আবার বললেন, ‘পাকিস্তান পিপলস পার্টি ছাড়া অধিবেশন বসলে গণ আন্দোলন শুরু করবো।’ এই পর্যন্ত বললেও তার গণতন্ত্রের প্রতি কিছু শ্রদ্ধাবোধ আছে অনুমান করা যেতো, কিন্তু তিনি যখন আরো বলেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তান থেকে যেসব সদস্য গণপরিষদে যোগ দিতে যাবে তাদের খতম করে দেওয়া হবে। খাইবার থেকে করাচী পর্যন্ত দুর্বার গণ আন্দোলনে সব কিছু বন্ধ করে দেব।’ তখন ভয় হয়, এই হুমকির আড়ালে কার মুখ ভাসে। ভুট্টোর বক্তব্যে কোনো লুকোছাপা নেই—‘বিরোধী দলে বসার জন্যে নির্বাচন করিনি।’ কিন্তু রাষ্ট্রতন্ত্র সম্পর্কে যার সামান্য ধারণা আছে, তিনিই জানেন সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ক্ষমতায় যায়, সংখ্যালঘিষ্ঠরা বিরোধী দলে। গণতন্ত্রের এ অনিবার্য সত্য। কিন্তু হতবাক হয়ে শুনতে হয় আমেরিকায় শিক্ষাপ্রাপ্ত পাকিস্তানের এক সময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো সদম্ভে ঘোষণা করলেন, ‘অধিবেশনের আগে মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত না হলে গুরুতর পরিণাম ঘটতে পারে।’
এখানেই প্রশ্ন, অধিবেশনের আগে মতৈক্য কেন? মতৈক্য মতানৈক্যের জন্যে রয়েছে সংসদ; আলোচনা, বিতর্ক, যুক্তি, পাল্টা যুক্তি দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে যা গৃহীত হবে তাই তো চূড়ান্ত। পাকিস্তানের ইতিহাস-সচেতন প্রত্যেকটি মানুষ জানে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের মার্চ মাসে লাহোরে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠাকল্পে ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি পেশ করেন। ছয় দফাই পাকিস্তানকে রক্ষা করতে পারে ঘোষণা করে তিনি বলেন ‘ছয় দফা বাঙালীর বাঁচার দাবী-শুধু বাঙালীর জন্যই নয় বরং অন্যান্য সব প্রদেশের বৈষম্য দূর করতে হলে ছয় দফার বাস্তবায়ন প্রয়োজন।’ পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এতে প্রথমেই বিচ্ছিন্নতার চিত্র আবিষ্কার করেন। শেখ মুজিবকে হয়রানি করে, জেলে দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এনেও জনগণের প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের মুখে যখন তাঁরা শেষরক্ষা করতে পারেননি তখন বাধ্য হয়েছিলেন সাধারণ নির্বাচন দিতে। সাধারণ নির্বাচনের অনেক আগেই দৃশ্যপটে এসে গেছেন ইয়াহিয়া খান, বিদায় নিয়েছেন আইয়ুব খান। শাসকগোষ্ঠী নিশ্চিত ছিলো শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না, অতএব ছয় দফার অকালমৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু ইতিহাসের সিদ্ধান্ত ছিলো ভিন্নরূপ, সেটা দেখতে তারা প্রস্তুত ছিলো না। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগ ছয় দফা-ভিত্তিক শাসনতন্ত্র পাশ করিয়ে নিলে তাদের পূর্ব পাকিস্তান নামক উপনিবেশটা চিরকালের মতো হাতছাড়া হয়ে যাবে। অতএব অধিবেশনের আগেই মতৈক্য? আমরা এখানেই দুই প্রদেশের দুই নেতার ভিন্ন চরিত্র লক্ষ্য করি—বঙ্গবন্ধু আটাশে ফেব্রুয়ারি ঢাকা শিল্প ও বণিক সমিতির সংবর্ধনা সভায় পশ্চিম পাকিস্তানের নির্বাচিত সদস্যদের সংসদে আসার জন্য আমন্ত্রণ তো জানালেনই, এমন-কথা পর্যন্ত বললেন- ‘বিরোধী দলের একজনও যদি সৎ পরামর্শ দেন গ্রহণ করবো।’ তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন,
“The Six-Point Programme had not been presented for the People of Bangladesh only. Whatever rights and autonomy we want for Bangladesh we want the People of the Punjab, the NWFP, Sind and Baluchistan also to enjoy. He emphatically said the Six-Points were not his property any more-it belonged to the people-and, therefore, he had not the right to amend it in any form whatsoever.
পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত সদস্যরা আসতে শুরু করেছেন; এসে গেছেন পঁয়ত্রিশজন, কেবল সরাসরি ‘যাবো না’ বলে হুমকি ভুট্টো ও কাইয়ুম খানের দলের। ঢাকাতে তখন ন্যাপ কেন্দ্রীয় কমিটির সিন্ধু, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান, উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের সদস্যরা উপস্থিত; তারা শুধু বিস্মিত নন, বিরক্তও। বিরক্ত ও বিস্মিত পিডিপি-র নুরুল আমীন, পাকিস্তান ন্যাশনাল লীগের আতাউর রহমান খান, বাংলা জাতীয় লীগের অলি আহাদ, জামাতে ইসলামীর গোলাম আজম, পূর্ব পাকিস্তান কনভেনশন লীগের শামসুল হুদা। কাইয়ুমপন্থী মুসলিম লীগ থেকে খান আবদুস সবুর তো পদত্যাগই করলেন।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার বেতার-বিবৃতির পর কতো সময় পার হয়েছে? দশ কি পনর মিনিট? স্টেডিয়ামে মানুষ যেমন সহসা আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়ে গেল তেমনি ঢাকা শহরবাসী হাজারে হাজারে ঘর ছেড়ে, অফিস ছেড়ে, ব্যবসাবাণিজ্য ছেড়ে বেরিয়ে এলো রাস্তায়, তাদের মুখে এক শ্লোগান ‘মানি না’। যেন সবাই তৈরি হয়েই ছিলো এমন একটি ঘোষণা শোনার জন্যে, যেন সবাই একতাবদ্ধ হয়েই ছিলো ছুটে বেরিয়ে আসার জন্যে। মুহুর্তে ঢাকা প্রতিবাদ আর মিছিলের নগরী হয়ে যায়।
সঙ্গে-সঙ্গে পটনও হয়ে যায় জনসমুদ্র; কোনোরকম প্রচার হয়নি যে পল্টনে ছাত্রদের মিটিং হবে, কিন্তু যেন হাওয়ায় উড়ে আসে চেয়ার টেবিল, বাতাসে উড়ে আসে মাইক; স্বতঃস্ফুর্ত জনতা অনুষ্ঠিত হয় দুপুর দেড়টায়; সভায় প্রাক্তন ছাত্রনেতা ও নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্য তোফায়েল আহমদ, শ্রমিক নেতা আবদুল মান্নান, প্রাক্তন ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খান, ছাত্রনেতা আ. স. ম. আবদুর রব, নুরে আলম সিদ্দিকী-প্রত্যেকের একটাই অঙ্গীকার “যে-কোনো ত্যাগ স্বীকার করবো।’ মানুষ উত্তেজনা আর ক্রোধে ফেটে পড়ছে, কিন্তু দিক নির্দেশ কই? ওখানেই জানা যায় যে হোটেল পূর্বাণীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আছেন, ওখানে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারী দলেন শাসনতন্ত্র সংক্রান্ত মিটিং চলছে, ওখানেই শ্লোগান ‘চলো চলো, পূর্বাণী চলো’। মিছিল গেল পটন থেকে, মিছিল এলে সমস্ত কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সেক্রেটারিয়েট, ওয়াপদা, ইপিআইডিসি থেকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরাও বসে নেই ; প্রত্যেকের চোখে-মুখে প্রতিজ্ঞা; প্রত্যেকেই বঙ্গবন্ধুর কাছে জানতে চায়—বলুন আমাদের কি করতে হবে? আমরা আপনার নির্দেশের অপেক্ষায় আছি। মানুষ ক্ষোভে ও ঘৃণায় পূর্বাণী হোটেলের সামনে মোহাম্মদ আলী জিন্নার ছবি ও পাকিস্তানী পতাকা পুড়িয়ে ফেলে।
হোটেল পূর্বাণীতেও সাংবাদিক সম্মেলন আকস্মিক। সাংবাদিকরা বুঝতে পেরেছিলেন ইয়াহিয়া খানের আকস্মিক সংসদ অধিবেশন স্থগিত সংক্রান্ত বিবৃতির পর জনগণের মতো জনগণের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিক্রিয়াও হবে তীব্র; কিছুক্ষণের মধ্যেই পার্লামেন্টারী দলের মিটিং সাংবাদিক সম্মেলনে রূপান্তরিত হয়ে যায়।
সাংবাদিকরা জানতে চাইলেন:
প্রশ্ন- বাতিলের আগে কি প্রেসিডেন্ট আপনার সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন?
উত্তর- না। আমি সংখ্যাগরিষ্ঠদলের নেতা, আমার সঙ্গে আলোচনা না করে তিনি আলোচনা করলেন ভুট্টো সাহেবের সঙ্গে।
প্রশ্ন- সংসদ যে স্থগিত হয়ে যেতে পারে, আপনি কি আগেই জানতেন?
উত্তর- খবর পেয়েছিলাম।
প্রশ্ন- সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে কি পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের সহযোগিতা চাইবেন? উত্তর- চাইবো। যড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ জানানোর অনুরোধ করবো।
প্রশ্ন- আপনার দলীয় নেতা ও কর্মীদের গ্রেফতার করা হবে বলে আশংকা করেন?
উত্তর- তারা প্রস্তুত। আমরা যেমন ভালোর জন্যে আশা করি তেমনি খারাপ কিছুর জন্যেও তৈরি। প্রশ্ন- বাইরে উত্তেজিত জনগণ আপনার নির্দেশ চায়। আপনি কি বলবেন তাদের?
উত্তর- সাত তারিখে সব জানতে পারবেন।
বঙ্গবন্ধুর ওই রকম সংযত-ক্রোধ সাধারণত দেখা যায় না। তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, ছয় দফা জনগণের সম্পত্তি; এ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানও সুফল পাবে। ছয় দফা প্রণয়ন করার জন্যে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদের যে অভিযোগ আনা হয়, তার জবাবে তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেন, পাকিস্তানের শাসকরাই দেশের সংহতি নষ্ট করেছে। অন্যায় আর অবিচার আর বৈষম্যের স্রোতে দেশের এই অঞ্চলের জনগণ ভেসে গেছে। ছয় দফা জনগণের মুক্তির সনদ। বঙ্গবন্ধুকে অবাঙ্গালীদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিলো। জবাব দিয়েছিলেন তিনি, অবাঙ্গালীরা এই মাটিরই সন্তান। সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি সরাসরি ঘোষণা করলেন, লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে।
তিনি হিংসাত্মক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে হুশিয়ারি উচচারণ করেছিলেন। তিনি দিয়েছিলেন শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতাঞ্জিক আন্দোলনের আশ্বাস। তবে তিনি এ বলেও সাবধান করে দিয়েছিলেন—কেউ বাধা সৃষ্টি করলে পরিণাম ভালো হবে না। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, আমি মওলানা ভাসানী, আতাউর রহমান খান, নুরুল আমীন, মোজাফফর আহমেদ এদের সঙ্গে আলাপ করবো।’
সময় দ্রুত গড়িয়ে যেতে থাকে। বিক্ষুব্ধ জনগণকে সাত তারিখে ‘সব জানাবো’ বলে তিনি দোসরা মার্চ ঢাকায় ও তেসরা মার্চ সারা পূর্ব পাকিস্তানে হরতালের ডাক দিলেন। মনে হয় বাতাসে বাতাসে সেই আহ্বান ছড়িয়ে পড়লো সারা দেশে; তার আগেই বাংলাদেশের মানুষ জেনে গেছে কী বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছে তারা। দেশবাসী বুঝতে পেরেছে সামনে রয়েছে অগ্নিপরীক্ষা।
পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর পদে অধিষ্ঠিত ভাইস অ্যাডমিরাল এস, এম, আহসানকে সেইদিনই অপসারণ করে লেফটেনেন্ট জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খানকে ওই পদে নিয়োগ করা হয়। আস্তে আস্তে বোঝা যায় এ-সব কী গভীর ষড়যন্ত্রের ফল, বোঝা যায়, বেপরোয়াভাবে বাঙালী না মারতে পারার কারণে গভর্ণর আহসান যেমন অপসারিত হয়েছিলেন তেমনি কয়েকদিন পর সাহেবজাদা ইয়াকুব খানও; যিনি সফল হয়েছিলেন তিনি লেফটেনেন্ট জেনারেল টিক্কা খান; ‘বেলুচিন্তানের কসাই’ নামে যার পরিচয়। টিক্কার প্রকৃত ভূমিকা যখন শুরু হয়, তখন আর অসহযোগ আন্দোলন নেই, তখন রীতিমতো শুরু হয়ে গেছে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রথম স্তর।
পয়লা মার্চে বিক্ষোভ হয় নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহ, খুলনা ও প্রদেশের আরো অনেক জায়গায়। ওই সন্ধ্যাতেই মোজাফফর ন্যাপ মিছিল পথসভা করে ইয়াহিয়া খানের বিবৃতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে; হোটেল পূর্বাণীতে বঙ্গবন্ধুর সাংবাদিক সম্মেলনের পর পল্টনে আবার ছাত্রদের জনসভা। সর্বত্র এক প্রতিজ্ঞা– মানি না। এই দিনেই ১১০ নম্বর সামরিক আইন জারী করে বলা হয়—‘পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো ছবি খবর অভিমত বিবৃতি মন্তব্য প্রভৃতি মুদ্রণ বা প্ৰকাশ থেকে সংবাদপত্রসমূহকে বারণ করা হচ্ছে। এই আদেশ লংঘন করা হলে ২৫ নং সামরিক শাসন বিধি প্রযোজ্য হবে। এর সর্বোচ্চ শাস্তি দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড।’
কিন্তু সমস্ত সংবাদপত্র, অফিস আদালত, কলকারখানা ও মানুষের বুঝতে আর বাকি নেই, পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের জনগণ প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের হুকুম নয়, শুনতে চায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশ।
পৃষ্ঠাঃ ৯–২১
অসহযোগ আন্দোলনঃ একাত্তর
রশীদ হায়দার
