মতামত।। পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ-এর বাকশাল সংক্রান্ত অসত্য দাবি কি শুধুই বিএনপি সরকারের অনুকম্পা পাবার জন্য?

মতামত।। পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ-এর বাকশাল সংক্রান্ত অসত্য দাবি কি শুধুই বিএনপি সরকারের অনুকম্পা পাবার জন্য?
শেয়ার করুন

– মৃন্ময় সেন

(রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক)

প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফের একটি ফেসবুক পোস্ট ঘিরে অনলাইনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যেখানে তিনি দাবি করেছিলেন, বর্তমান পিআইবি ভবনের জায়গাতেই এক সময় ছিল বাকশালের দপ্তর।

পোস্টে ফারুক ওয়াসিফ লেখেন, “আপনি কি জানতেন আজকের PIB ভবনটির জায়গাতেই ছিলো বাকশালের দপ্তর? আর যার বুদ্ধিতে প্রেসিডেন্ট জিয়া PIB বানালেন, তিনি ছিলেন ‘দ্য সুপ্রিম টেস্ট’ শিরোনামে সম্পাদকীয় লেখার ‘অপরাধে’ ১৯৭২ সালে বরখাস্ত হওয়া বাংলাদেশের প্রথম সম্পাদক আব্দুস সালাম। কি দারুণ পোয়েটিক জাস্টিস।”

১১৬তম জন্মবার্ষিকীতে পিআইবি এর প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক, ভাষাসৈনিক এবং পাকিস্তান/বাংলাদেশ অবজার্ভারের প্রতিষ্ঠাতা সাংবাদিক আব্দুস সালামের ওপর নির্মিত শর্ট ডকুমেন্টারি দেখানো হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সালাম সাহেবের কন্যা রেহানা সালাম, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান ও বিএনপির মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী

পিআইবির প্রধান কার্যালয় বর্তমানে ঢাকার ৩ সার্কিট হাউস রোডে অবস্থিত।

যদিও ফারুক ওয়াসিফ ১৮ই সেপ্টেম্বর পিআইবি মহাপরিচালক হিসাবে দায়িত্ব গ্রহন করার পরে ২০২৫ সালেও দ্যা ডেইলি অবজারভার বাংলাদেশের প্রথম সম্পাদক আব্দুস সালাম এর একটা জন্মবার্ষিকী গিয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ বা ২০২৫ এ আব্দুস সালাম এর কোন জন্মবার্ষিকী পালন না করে, হঠাত ২০২৬ এ কেন তিনি আব্দুস সালাম এর জন্মবার্ষিকী পালন করতে এসে ইতিহাসের বিকৃতি করলেন?

অনেকেই এটাকেই বর্তমানের সরকারের অনুকম্পা পাবার  চেস্টা হিসাবে দেখছেন। কারন পিআইবি গঠন ও এই ভবনে পিআইবি কার্যালয় দুটোই জিয়ার শাসনামলে হয়েছে। এই সুযোগে জিয়ার প্রশংসা করে, সাথে বঙ্গবন্ধু ও বাকশাল কে জড়িয়েও একটু মিথ্যার রঙ ও মশালা যোগ করলেন।

তবে পোস্টের মন্তব্যে এই দাবির বিরোধিতা করেন একজন মন্তব্যকারী। তিনি লেখেন, “বাকশাল ভবনটি ছিল এখন যেখানে তথ্য কমপ্লেক্স হয়েছে বা তথ্য ভবন হয়েছে সেই জায়গাটাতে… দোতলা হলুদ বিল্ডিং ছিল। তখন শামীম ভাই ছিল ডিএফপির ডিজি।”

তবে ঐতিহাসিক দলিলের দাবি অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে তৎকালীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে বাকশালের অস্থায়ী প্রধান কার্যালয় করা হয়েছিল, যা ছিল ঢাকার ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে।

 

জবাবে ফারুক ওয়াসিফ তার তথ্যের স্বপক্ষে দুটি সূত্রের কথা উল্লেখ করেন—
তার অফিসে কর্মরত তৎকালীন বাকশালের এক দপ্তরির ছেলে এবং আব্দুস সালামের মেয়ে রেহানা সালামের অনুরূপ দাবি।

 

ঐতিহাসিক দলিলে যা পাওয়া যায়

গবেষক আবুল ফজল হকের “বাংলাদেশের রাজনীতি: সংঘাত ও পরিবর্তন” গ্রন্থে উল্লেখ আছে, ১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বাকশাল গঠনের পর অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়া অন্যান্য সকল কমিটিকে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে বাকশালের কমিটিরূপে কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় বাকশালের অস্থায়ী কার্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। এই ব্যবস্থা ১৯৭৫ সালের ৭ জুন পর্যন্ত বলবৎ ছিল, যেদিন রাষ্ট্রপতি বাকশালের নিজস্ব গঠনতন্ত্র জারি করেন এবং দলের পৃথক কমিটি ঘোষণা করেন।

এই তথ্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, বাকশাল প্রাথমিকভাবে তার নিজস্ব কোনো নতুন কার্যালয়ে নয়, বরং বিদ্যমান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়কেই অস্থায়ীভাবে দপ্তর হিসেবে ব্যবহার করেছিল।

আবদুস সালামের বরখাস্ত সম্পর্কিত তথ্য

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তান অবজার্ভার ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ The Observer এবং ২৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ The Bangladesh Observer নামে পুনর্নামকরণ হয়। জানুয়ারি ১৯৭২-এ পত্রিকা সরকারি নিয়ন্ত্রণে (জাতীয়করণ) নেওয়া হয়।

১৫ মার্চ ১৯৭২ তারিখে তিনি “The Supreme Test” শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় লেখেন। এতে তিনি লেখেন যে আওয়ামী লীগ জনগণের কাছ থেকে বিপুল ম্যান্ডেট পেলেও তখন কোনো সংবিধান কার্যকর না থাকায় সরকারের আইনি ভিত্তি নেই; এটি বরং একটি বিজয়ী বিপ্লবী সরকার। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব শক্তির সমন্বয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠনের দাবির পক্ষে যুক্তি দেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে গঠনমূলক পরামর্শ দেন। সম্পাদকীয়ের সমাপ্তি অংশে বলা হয়  “তিনি (মুজিব) হয়তো জানেন না কতটা শক্তিশালী তিনি; তাঁর শক্তি কোনো বিশেষ গোষ্ঠী থেকে নয়, জনগণ থেকে আসে; তিনি এখন সেই মহত্ত্বের চূড়ান্ত পরীক্ষার মুখোমুখি।”

মাত্রই দায়িত্ব নেয়া মন্ত্রীসভা এটিকে সমালোচনা ও অসন্তোষ সৃষ্টির কারণ হিসেবে দেখে। আরেক ভাষা সৈনিক আর প্রথতিযশা সাংবাদিক এ.বি.এম. মুসা মনে করতেন এ সম্পাদকীয় মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে যোগসাজশে লেখা হয়েছিল। যদিও পরের দিন পত্রিকায় প্রতিরক্ষামূলক ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়।

 

সম্পাদকীয় প্রকাশের পরপরই তাকে পদ থেকে সরানো হয় (বাধ্যতামূলক পদত্যাগ/বরখাস্ত)। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন ওবায়দুল হক। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের কোনো পত্রিকার প্রথম সম্পাদক যাকে এভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আবদুস সালাম বাংলাদেশ টাইমসে লেখালেখি চালিয়ে যান। ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে তিনি প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (PIB)-এর প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক হন এবং ১৯৭৬ সালে একুশে পদক পান। তিনি ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭-এ মারা যান।

পিআইবি’র মহাপরিচালক, সাবেক সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ নতুন নয় বলে মন্তব্য করছেন অনেকে। তবে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির কাছ থেকে ঐতিহাসিক তথ্যের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা প্রত্যাশিত বলে তারা মনে করছেন।

 

Visited 7 times, 1 visit(s) today