বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতি: সোশ্যালিস্ট ও কমিউনিস্ট কারা?

বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতি: সোশ্যালিস্ট ও কমিউনিস্ট কারা?
শেয়ার করুন

লেখা: হাসান মোরশেদ, মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা গবেষক


বামপন্থী মানেই কমিউনিস্ট নয়। সমাজতন্ত্রীরাও বাম, আবার সমাজতন্ত্রী আর কমিউনিস্টও এক নয়। এ দুইয়ের বাইরেও বামপন্থী হওয়া যায়। সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য কমানো, ক্ষমতা ও সম্পদের অসম বণ্টন বদলানো এবং নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণে দায়িত্ব নেওয়া রাষ্ট্র ও সরকারের কাজ, এমন মনে করা সব রাজনৈতিক শক্তিই বাম।

ষাটের দশকের শুরুতে সোভিয়েত–চীন দ্বন্দ্বে কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হয়। একাত্তরে চীন পাকিস্তানের পক্ষ নিলে চীনপন্থী ধারার বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধ থেকে সরে যায়। এটি ছিল গণবিরোধী সিদ্ধান্ত, প্রতিক্রিয়াশীল ডানপন্থী পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান। পঁচাত্তরের পর সামরিক শাসনের ডানপন্থী মন্ত্রিসভাতেও সাবেক চীনপন্থীদের দেখা গেছে। এরশাদের প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ তাঁদের একজন। মস্কোপন্থীরা সোভিয়েত পতনের পর নানা উপদলে ভেঙেছে। আমার বিবেচনায় অনেকের ঠাঁই হয়েছে নিওলিবারেল এনজিও আর প্রথম আলোর মতো পশ্চিমা স্বার্থঘেঁষা গণমাধ্যমে। ২০২৪-এর সংকটে এদের শক্তিশালী অংশ পশ্চিমের সমর্থনপুষ্ট নিওলিবারেল আইকন ইউনূসের ক্ষমতায় আসার সহযোগী হয়েছে এবং ডানপন্থার সবচেয়ে শক্তিশালী উত্থানে ভূমিকা রেখেছে।

এবার দেখা যাক আওয়ামী লীগের অবস্থা।
১৯৪৯ সালে সামন্তবাদী ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধেই আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম। প্রথম সম্মেলনের (২৩–২৪ জুন) খসড়া ঘোষণাপত্রেই ছিল বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি ও মধ্যস্বত্ব বিলোপ আর জমি পুনর্বণ্টনের মতো দাবি। ১৯৫৪-র যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার প্রথম দফাও তাই, সঙ্গে পাটব্যবসা জাতীয়করণ। ছয় দফা ছিল মুলত: রাষ্ট্রীয় বৈষম্যবিলোপ করে ক্ষমতাহীনের অধিকার আদায়ের দাবি। ১৯৭০-এর জুনের কাউন্সিল ও নির্বাচনী ইশতেহারে গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির অঙ্গীকার স্পষ্ট হয়। একচেটিয়া পুঁজি ও সামন্তবাদ উচ্ছেদ এবং ব্যাংক-বিমা-বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণ ছিল তার অংশ। ১৯৭২-এ তা রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হলো। রাষ্ট্রপতির আদেশে ব্যাংক-বিমা-শিল্প জাতীয়করণ হলো, জমির মালিকানার সর্বোচ্চ সীমা বাঁধা হলো।

১৯৭৫-এর বাকশাল। স্থানীয় অভিজ্ঞতায় সমাজতন্ত্রের পথে আরও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। টিটো, নাসের ও মুজিব এর মতো তৃতীয় বিশ্বের নন কমিউনিস্ট সোশ্যালিস্ট প্রত্যেকে নিজ বাস্তবতায় সমাজতন্ত্রের চেষ্টা করেছেন। সোভিয়েত পতনের পর নব্বইয়ের শুরুতে দলটি বাজার অর্থনীতির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে, কিন্তু মূলনীতি থেকে সমাজতন্ত্র বাদ দেয়নি। গঠনতন্ত্রে তা আজও আছে।

ক্ষমতার শেষ বছরগুলোর সমালোচনাও প্রাপ্য। অলিগার্কির উত্থান ঘটেছে, ক্যাপিটাল ফ্লাইটের অভিযোগ উঠেছে। সিভিল-মিলিটারি আমলাতন্ত্র অতিশক্তিশালী হয়েছে, রাজনীতির মান নেমেছে, চরম ডানদের সঙ্গে আপসও হয়েছে।
তবু ঘোষিত না হলেও আচরণে বামপ্রবণতা ছিল। বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতাসহ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বিস্তার ঘটেছে। মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি ও সুযোগ বেড়েছে, কমিউনিটি ক্লিনিকে গ্রামে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা গেছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পে জমির মালিকানাসহ আধাপাকা ঘর পেয়েছে কয়েক লক্ষ ভূমিহীন-গৃহহীন মানুষ। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের চাপ সামলে কৃষিতে ভর্তুকি ধরে রাখা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ঋণ বাতিল করার পরও নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন বেড়েছে, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে, কোভিডের মতো বৈশ্বিক দুর্যোগে সরকার ও রাষ্ট্র দায়িত্ব নিয়েছে৷ বিদেশি এনজিও-দূতাবাসের মাতব্বরি নিয়ন্ত্রণে ছিল। আগের দশকগুলোর চেয়ে দারিদ্র্য কমে এসেছিলো উল্লেখযোগ্য হারে। করের বোঝা অসহনীয় ছিলো না। বামপন্থার ন্যুনতম বৈশিষ্ট এইসব।

২০২৪ এর আগষ্টের পর ছবিটা পাল্টে গেছে। শিশুদের ভ্যাক্সিন দেয়ার দায়িত্ব পালন করেনি ক্ষমতাসীনরা। এখন পর্যন্ত ১২০০+ শিশু মারা গেছে। বিপুল সংখ্যক মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছে। আমন মৌসুমে মাঠে সারের সংকট। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে দারিদ্র্য ২০২২-এর ১৮.৭ থেকে ২০২৬-এ ২২.৫ শতাংশে উঠেছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেওয়ার প্রবণতা কমেছে। নির্বাচনের তিন দিন আগে একপেশে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি সই হয়েছে, নির্বাচিত সরকার তা “উত্তরাধিকার” বলে মেনে নিয়েছে। প্রথম বাজেটেই ভর্তুকি কমানোর পথ আর মুদিদোকানসহ ১৬ খাতে ভ্যাটের জাল। ধর্মীয় শক্তিরও উত্থান ঘটেছে, আর ঐতিহাসিকভাবে ধর্মকে রাজনৈতিক মূলধন বানানো দলগুলো ডানপন্থী, কারণ পরিচয়ের রাজনীতি শ্রেণিবৈষম্যের প্রশ্ন আড়াল করে।

বাংলাদেশে যারা নিজেদের বামপন্থী দাবি করে, তারা বাম নয়, বরং ডানপন্থীদের সহযোগী। আওয়ামী লীগের মধ্যে বামপন্থার প্রবণতা আছে, কিন্তু নেতাকর্মীদের তা স্বীকার করতে অস্বস্তি। সে অস্বস্তি মূলত অজ্ঞতাজনিত। “আওয়ামী লীগ একটি সোশ্যালিস্ট পার্টি”- এটা বললে এর কর্মীরা তো বটেই নেতারাও আঁতকে উঠবে। অথচ সোশ্যালিজমের বাংলা সমাজতন্ত্র, সমাজতন্ত্র আওয়ামী লীগের দলীয় মুলনীতির একটি। আর সমাজতান্ত্রিক মানে বামপন্থীই।

বিএনপি, জামায়াত ও অন্যরা এই আলোচনায় নেই কারন তারা দ্বিধাহীনভাবেই ডানপন্থী

Visited 41 times, 2 visit(s) today