ব্রাজিলে নির্বাচনে হেরে গোপনে দেশত্যাগ ওয়াশিংটনের প্রার্থী ফ্লাভিও’র; পরিবারের সদস্যদেরও ভিসা দেবে ট্রাম্প প্রশাসন

ব্রাজিলে নির্বাচনে হেরে গোপনে দেশত্যাগ ওয়াশিংটনের প্রার্থী ফ্লাভিও’র; পরিবারের সদস্যদেরও ভিসা দেবে ট্রাম্প প্রশাসন
শেয়ার করুন

পাসপোর্ট জমা দিতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচনে পরাজয় মেনে নেওয়ার ঘোষণা না দিয়েই গোপনে ব্রাজিল ছাড়ার অভিযোগ 

 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। ২৮ অক্টোবর, ২০২৬।


ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বামপন্থী বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার কাছে পরাজিত হওয়ার পর দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়েকেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্লাভিও বলসোনারো নির্বাচনে পরাজয় মেনে নেওয়ার ঘোষণা না দিয়েই ব্রাজিল ছেড়েছেন। অর্থ পাচারের একটি তদন্তের অংশ হিসেবে তাঁর পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি পাসপোর্ট জমা না দেওয়ায় সেগুলো বাতিল করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ফ্লাভিও অবশ্য ওই তদন্তে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ফ্লাভিও, তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ের বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরিবারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, ফ্লাভিও যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পৌঁছেছেন। তবে তিনি ঠিক কোথায় অবস্থান করছেন, তা জানাতে রাজি হয়নি সূত্রটি।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন,

“পররাষ্ট্র দপ্তর ফ্লাভিও বলসোনারো ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ভিসা দেবে এবং তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেবে।”

ব্রাজিল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন

ফ্লাভিওর ব্রাজিল ত্যাগের ঘটনা দুই আমেরিকান দেশের মধ্যে বিদ্যমান রাজনৈতিক টানাপোড়েন আরও বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা অভিযোগ করেছেন, বলসোনারো পরিবারকে আবারও ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে ওয়াশিংটন তাদের সঙ্গে সমন্বয় করছে। রয়টার্স এর আগে রোববারের নির্বাচনের আগে বলসোনারো পরিবারকে ক্ষমতায় ফেরানোর লক্ষ্যে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি উদ্যোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে ফ্লাভিওর বাবা ও ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোকে বিচারিক নিপীড়নের শিকার বলে দাবি করেছিলেন। ২০২২ সালে লুলার কাছে নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর জইর বলসোনারোও যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন জো বাইডেন।

পরে ব্রাজিলে ফিরে আসার পর অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের দায়ে জইর বলসোনারোকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁর সমর্থকেরা রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় সরকারি ভবনগুলোতে হামলা চালানোর ঘটনার পর এই মামলা সামনে আসে।

সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প ফ্লাভিওর দেশত্যাগ নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তবে ব্রাজিলের নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভোটটি “আরেকটি কারচুপির নির্বাচন বলে মনে হচ্ছে”।

ব্রাসিলিয়ায় বক্তব্য দেওয়ার সময় লুলা বলেন, ফ্লাভিও দেশ ছেড়েছেন—এ খবর তিনি তখনই শুনেছেন। এ ঘটনাকে লজ্জাজনক উল্লেখ করে লুলা বলেন, ফ্লাভিওর উচিত ছিল ব্রাজিলে থেকে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করা।

পাসপোর্ট জমা দিতে ২৪ ঘণ্টার সময় দিয়েছিল আদালত

রয়টার্সের দেখা সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী, ফ্লাভিও বলসোনারোর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং তাঁর “উল্লেখযোগ্য আর্থিক সামর্থ্যের” বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পাসপোর্ট জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

সোমবার তাঁকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাসপোর্ট জমা দিতে বলা হয়। নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পর পাসপোর্ট বাতিল করা হয়েছে বলে দুটি সূত্র জানিয়েছে।

এর আগে সোমবার ফ্লাভিও বলেছিলেন, দেশ ছেড়ে পালানোর কোনো পরিকল্পনা তাঁর নেই। তিনি বলেছিলেন, “আমি কখনো দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবিনি। আমি আমার পাসপোর্ট জমা দেব এবং এই প্রহসনের বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করব। এটি আমাকে ভয় দেখানোর একটি স্পষ্ট চেষ্টা।”

তবে তাঁর দেশত্যাগের খবর নির্বাচনী প্রচারণা দলের ব্যবস্থাপককেও বিস্মিত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ফ্লাভিওর নির্বাচনী প্রচারণা ব্যবস্থাপক ও সিনেটর রোজেরিও মারিনহো সাংবাদিকদের বলেন, “খবরটি শুনে আমরা বিস্মিত হয়েছি। কারণ, গতকালই আমরা আলোচনা করেছিলাম যে প্রায় ছয় কোটি ভোট পাওয়ার পর ফ্লাভিওর উচিত বিরোধী দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া।”

পরাজয় মেনে নেননি ফ্লাভিও

রোববারের নির্বাচনে পরাজয়ের পরও ফ্লাভিও আনুষ্ঠানিকভাবে হার স্বীকার করেননি। তিনি নির্বাচনে ভোটের অনিয়মের অভিযোগ তুলে ফল বাতিলের আবেদন করার কথা বলেছিলেন। তবে তাঁর দল লিবারেল পার্টি সোমবার লুলার বিজয় মেনে নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

আদালতের নির্দেশ ও পাসপোর্টসংক্রান্ত জটিলতার মধ্যেও ফ্লাভিও কীভাবে ব্রাজিল ছাড়লেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ফ্লাভিও নিয়মিত কোনো অভিবাসন চেকপয়েন্ট দিয়ে দেশ ত্যাগ করেননি।

এদিকে ফ্লাভিওর ছোট ভাই এদুয়ার্দো বলসোনারো, যিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন, নির্বাচনের আগে বলেছিলেন—ভাই নির্বাচনে জিততে না পারলে তাঁর দেশ ছেড়ে যাওয়া উচিত। চলতি মাসে পডকাস্টার স্টিভেন ক্রাউডারের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।

ফ্লাভিওর দেশত্যাগ এখন ব্রাজিলের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তাঁর বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত এবং ওয়াশিংটন-ব্রাসিলিয়া সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

Visited 14 times, 1 visit(s) today