পুতিনের প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর; ডিসেম্বরের জি-২০ সম্মেলনে সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে অনিশ্চয়তা, ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতে আটলান্টায় পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার উত্তেজনা
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যদি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করতে চান, তাহলে তাঁকে মস্কোতে যেতে হবে। সেখানে তাঁর নিরাপত্তার সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা দেবে রাশিয়া এবং বৈঠক আয়োজনের প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা করবে মস্কো। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টায় অনুষ্ঠিত জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের প্রথম দিনের আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় লাভরভ এ কথা বলেন।
তিনি জানান, জেলেনস্কি সরাসরি বৈঠকের আহ্বান জানানোর পর পুতিন বলেছিলেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট যদি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চান, তাহলে মস্কোতে আসতে পারেন। রাশিয়া তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
লাভরভ বলেন, ‘তিনি (পুতিন) বলেছিলেন, জেলেনস্কি যদি দেখা করতে চান, তাহলে তাঁকে মস্কোতে আসতে হবে। আমরা তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করব। আবারও বলছি, তিনি দেখা করতে চাইলে মস্কোতে আসুন।’ রুশ সংবাদমাধ্যমের বরাতে তাঁর এই বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে।
আসন্ন ডিসেম্বরের জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের সময় পুতিন ও জেলেনস্কির সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে প্রশ্ন করা হলে লাভরভ জানান, ইউক্রেন জি-২০-এর সদস্য নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি আবারও স্পষ্ট করেন, পুতিনের প্রস্তাবিত বৈঠকের স্থান মস্কো; অন্য কোনো স্থান নয়।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে জি-২০ বৈঠকেও মতবিরোধ
লাভরভের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন আটলান্টায় জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের দুই দিনের বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।
৩০ ও ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকের শুরুতেই ইউরোপীয় দেশগুলোর কয়েকজন প্রতিনিধি রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভের উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি জানান। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস লাভরভের বক্তব্যকে ‘মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বর্ণনা’ বলে সমালোচনা করেন।
এমনকি লাভরভের সঙ্গে একই ছবিতে থাকতে আপত্তি জানান কয়েকজন ইউরোপীয় প্রতিনিধি। এ পরিস্থিতিতে রুবিও জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের প্রচলিত আনুষ্ঠানিক গ্রুপ ফটো বাতিল করেন।
অন্যদিকে, লাভরভ ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থানকে ‘অহংকারী বয়কট’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ইউক্রেনকে রাশিয়ার বৈধ নিরাপত্তাস্বার্থের জন্য সামরিক হুমকি হয়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া মস্কোর পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়।
বৈঠক শেষে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যুতে ঐকমত্য না হওয়ায় কোনো যৌথ ঘোষণাপত্র প্রকাশের সম্ভাবনা নেই। এর পরিবর্তে মার্কো রুবিওর পক্ষ থেকে একটি চেয়ারম্যানের বিবৃতি দেওয়ার কথা রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইরান পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শুল্কনীতি এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে মতবিরোধ বৈঠকে প্রাধান্য পেয়েছে।
ডিসেম্বরে পুতিন-জেলেনস্কি বৈঠকের সম্ভাবনা কতটুকু?
জি-২০-এর পরবর্তী নেতৃপর্যায়ের শীর্ষ সম্মেলন আগামী ১৪ থেকে ১৬ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মায়ামিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে পুতিনের সম্মেলনে অংশগ্রহণের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়।
এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন ডিসেম্বরের সম্মেলনকে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক অগ্রগতির একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে পুতিন ও জেলেনস্কির সম্ভাব্য বৈঠকের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে দুই নেতার সরাসরি বৈঠক কিংবা কোনো শান্তিচুক্তির বিষয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেই।
এরই মধ্যে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানিয়েছেন, আগামী ৬ থেকে ১০ নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা আয়োজনের সম্ভাবনা রয়েছে। আলোচনায় ইউরোপকেও অন্তর্ভুক্ত করতে চায় কিয়েভ। অন্যদিকে, লাভরভ জানিয়েছেন, নতুন আলোচনা শুরুর ক্ষেত্রে রাশিয়ার অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।
ফলে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক উদ্যোগ চললেও পুতিনের মস্কোতে বৈঠকের শর্ত এবং জেলেনস্কির নিরপেক্ষ স্থানে আলোচনার আগ্রহ দুই দেশের মধ্যে সরাসরি শীর্ষ বৈঠকের সম্ভাবনাকে এখনো অনিশ্চিত করে রেখেছে।
