তেহরানে ল্যাভরভ: জ্বালানির দামের অস্থিরতা, ইউরোপ, ইরান ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে অবস্থান স্পষ্ট

তেহরানে ল্যাভরভ: জ্বালানির দামের অস্থিরতা, ইউরোপ, ইরান ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে অবস্থান স্পষ্ট
শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক। ২১ অক্টোবর ২০২৬।


রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছেন, বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা মস্কো শুরু করেনি। তিনি এর দায় দিয়েছেন ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বাইডেন প্রশাসনকে। সোমবার তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

জ্বালানির দাম

ইউরোপের কর্মকর্তারা অভিযোগ করছেন, রাশিয়া ও ইরান তেলের দাম বাড়াচ্ছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ল্যাভরভ বলেন, রুশ জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ইউরোপ ও বাইডেন প্রশাসনই আগে নিয়েছে। ইইউ আজও সেই নীতিতে অটল আছে।

তাঁর দাবি, দাম বাড়লে রাশিয়ার লাভ হচ্ছে, এই ধারণা ঠিক নয়। প্রেসিডেন্ট পুতিন বারবার বলেছেন, দামের ওঠানামা মস্কো চায় না। রাশিয়া স্থিতিশীল দাম চায়, কারণ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য তা দরকার। সংসদে বিবেচনাধীন নতুন বাজেটও স্থিতিশীল দামের ধারণার ওপর তৈরি।

 

ইউক্রেন যুদ্ধ

ল্যাভরভ বলেন, ইউক্রেন সংকটে ইরানের নিরপেক্ষ অবস্থানের জন্য তিনি ধন্যবাদ জানিয়েছেন। রাশিয়া চায় সামরিক অভিযানের লক্ষ্য পূর্ণ হোক, বিশেষ করে আলোচনার মাধ্যমে। তাঁর মতে, কিয়েভ বা তার ইউরোপীয় সমর্থকেরা, কেউই আলোচনায় প্রস্তুত নয়।

ইউক্রেনের যুদ্ধে ধর্মীয় মাত্রা আছে কি না, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ইউক্রেনীয় অর্থোডক্স চার্চের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। রুশ ভাষাকে স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, রুশ ভাষার গণমাধ্যমও বন্ধ। রাশিয়া ভাষা ও ধর্মসহ নিজেদের মানুষের অধিকারের জন্য লড়ছে বলে তিনি দাবি করেন। ইরানের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে কোনো ভাষা নিষিদ্ধ নয় এবং সিনাগগ খোলা আছে। তাই ইরানের পক্ষও ন্যায্য।

ইউক্রেনের বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য, শুধু যেসব স্থাপনা ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকে সরবরাহ দেয়, সেগুলোই লক্ষ্য হয়েছে।

ইরানের সাথে বৈঠকের সামগ্রিক মূল্যায়ন

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই ল্যাভরভ আরাঘচির মূল্যায়নের সঙ্গে একমত হন। তাঁদের আলোচনা ছিল কার্যকর, ফলপ্রসূ এবং পারস্পরিক আস্থার পরিবেশে অনুষ্ঠিত। বর্তমান কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও রুশ-ইরান সহযোগিতা গতিশীল আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, এই সহযোগিতার ভিত্তি মজবুত। ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর কার্যকর হওয়া হালনাগাদ মৌলিক আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তিতে প্রথমবারের মতো দুই দেশের সম্পর্ককে ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারত্ব হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

ল্যাভরভ বলেন, রাশিয়া এই চুক্তির প্রতি প্রতিশ্রুতি কাজে দেখাচ্ছে। জাতিসংঘে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উস্কানিহীন আগ্রাসনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা রাশিয়া ঠেকিয়ে দিয়েছে। ইরানি জনগণের কাছে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে মানবিক সহায়তা পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ছিল ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম। খাদ্যসামগ্রীও নিয়মিত পাঠানো হচ্ছে।

দুই দেশের নেতাদের নিয়মিত বৈঠককে তিনি অপরিহার্য বলেছেন। গত দেড় মাসে প্রেসিডেন্ট পুতিন ও প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান দুবার সাক্ষাৎ করেছেন এবং নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। তেহরানে যখন এই আলোচনা চলছিল, তখন তাজিকিস্তানের রাজধানী দুশানবেতে দুই দেশের সরকারপ্রধানরাও বৈঠকে বসেছিলেন। আন্তঃসরকার বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিশনের ধারাবাহিক কাজ, সরকারি পর্যায়ের যোগাযোগ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি কোম্পানিগুলোর পারস্পরিক কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন তিনি।

ফিলিস্তিন

ল্যাভরভের মতে, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক আলোচ্যসূচির একেবারে নিচে ঠেলে দেওয়া হয়েছে এবং এর সারবস্তু কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের জাতিসংঘ প্রস্তাবগুলো ফাঁপা করে ফেলা হচ্ছে। রাশিয়া ও ইরান সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পক্ষে দৃঢ়, একই সঙ্গে লেবানন নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের পক্ষেও। ইয়েমেন প্রসঙ্গে তিনি ২০২৩ সালে সৌদি আরবে তৈরি রোডম্যাপে ফেরার আহ্বান জানান।

দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য

ল্যাভরভ দুই দেশের বাণিজ্যের জোরালো প্রবৃদ্ধির কথা তুলে ধরেন। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২১ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেও বৃদ্ধি ১০ শতাংশের বেশি। এই প্রবৃদ্ধির পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তিনি ২০২৫ সালের মে মাসে কার্যকর হওয়া ইরান ও ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কথা বলেন। মাত্র পাঁচ দিন আগে, ১৪ অক্টোবর, ইরান-ইউরেশীয় অর্থনৈতিক কমিশনের যৌথ কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক হয়েছে।

বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

ল্যাভরভ স্পষ্ট করেন, কঠিন পরিস্থিতির কথা বারবার উল্লেখ করা সত্ত্বেও রাশিয়া ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ চুক্তি বাস্তবায়ন ছেড়ে দেওয়ার কোনো ইচ্ছা রাখে না। এরই অংশ হিসেবে রুশ বিশেষজ্ঞরা ধীরে ধীরে বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফিরে আসছেন। এর বাইরে তিনি হাইড্রোকার্বন উত্তোলন ও পরিবহনে সহযোগিতার যথেষ্ট সম্ভাবনা দেখছেন বলে জানান।

রাশ্ত-আস্তারা রেলপথ

রাশ্ত-আস্তারা রেলপথ প্রকল্প নিয়ে ল্যাভরভ জানান, রুশ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যৎ রেলপথের পথ ধরে প্রকৌশল জরিপ চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানের পক্ষ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কাজ শেষ করলেই নির্মাণ শুরু হবে। অর্থাৎ বর্তমানে প্রকল্পের পরবর্তী ধাপ আটকে আছে ইরানের দিকের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার অপেক্ষায়।

শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক

মানবিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে ল্যাভরভ বলেন, সেপ্টেম্বরের শেষে রাশিয়ার কয়েকটি শহরে ইরানি সংস্কৃতি উৎসবের অংশ হিসেবে নানা অনুষ্ঠান হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে তেহরানে রুশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র চালু হয়েছে। ১৯৮০-র দশকের শুরুর পর এই প্রথম ইরানের সাংস্কৃতিক ও মানবিক পরিসরে রাশিয়া স্থায়ী উপস্থিতি ফিরে পেল। শিক্ষা ক্ষেত্রেও সহযোগিতা চলছে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান থেকে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী এখন রাশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন।

গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোর ফোরাম

ল্যাভরভ বলেন, অক্টোবরের শেষে মস্কোয় অনুষ্ঠেয় গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোর ফোরামে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের অংশগ্রহণের অপেক্ষায় আছে রাশিয়া। নেতাদের নিয়মিত বৈঠক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার জন্য অপরিহার্য বলে তাঁর মত। এই সফর হলে এক মাস আগে দুই নেতার দুবার সাক্ষাতের পর আরেকটি সরাসরি বৈঠকের সুযোগ তৈরি হবে।

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়

ল্যাভরভ জানান, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অনেক বিষয়ে দুই দেশের অবস্থান মিলে যায় বা কাছাকাছি। দুই দেশ জাতিসংঘ সনদের নীতির ওপর ভিত্তি করে ন্যায্য ও বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে। এর মধ্যে রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম সমতা এবং বল প্রয়োগ বা বল প্রয়োগের হুমকি থেকে বিরত থাকার নীতি রয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একতরফা নিষেধাজ্ঞা চাপানোকে তিনি অগ্রহণযোগ্য ও ধ্বংসাত্মক বলেন, কারণ এটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।

জাতিসংঘ, এসসিও, ব্রিকস, ইএইউ ও ওআইসির মতো বহুপাক্ষিক মঞ্চে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মস্কোয় আরাঘচির সফরের সময় স্বাক্ষরিত ২০২৬-২০২৮ সালের মন্ত্রী পর্যায়ের পরামর্শ পরিকল্পনা নির্ধারিত ছকে মসৃণভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে বলে তিনি জানান। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের পরিণতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ল্যাভরভ আবারও জানান, এই কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট সংকট পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে সহায়তা করতে রাশিয়া প্রস্তুত। স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় কূটনীতি ব্যবহারের ব্যাপারে তেহরানের অঙ্গীকারকে তিনি স্বাগত জানান।

কাস্পিয়ান অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়েও কথা হয়েছে। আরাঘচি এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রে নিরাপত্তা দুর্বল করার চেষ্টার কথা তুলেছেন বলে ল্যাভরভ জানান। দক্ষিণ ককেশাসে “৩+৩” ফরম্যাট এগিয়ে নিতে রাশিয়া ও ইরানের একসঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনাও তিনি দেখছেন। এতে আর্মেনিয়া, আজারবাইজান ও জর্জিয়ার সঙ্গে তাদের প্রতিবেশী ইরান, রাশিয়া ও তুরস্ক থাকবে। ইউরেশীয় সহযোগিতার উদ্যোগে ইরান “একবিংশ শতাব্দীর ইউরেশীয় বৈচিত্র্য ও বহুমেরুকতার সনদ” তৈরির প্রাথমিক অংশগ্রহণকারীদের মূল দলে যোগ দিয়েছে। ৩-৪ নভেম্বর মিনস্কে ইউরেশীয় নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ইরানি কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণও চেয়েছে রাশিয়া।

ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলাকে তিনি অনুসৃত আগ্রাসন বলেছেন। জাতিসংঘে সেই হামলার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা রাশিয়া ঠেকিয়ে দিয়েছে বলে তিনি জানান। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে সংকটের আগের অবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

উপসাগরীয় যৌথ নিরাপত্তার রুশ ধারণা নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে ল্যাভরভ বলেন, এতে উপকূলীয় ছয় আরব দেশ ও ইরান থাকবে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য, আরব লীগ ও ওআইসি সহায়ক ভূমিকা রাখবে। আগস্টে গঠিত পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের “মক্কা চুক্তি”-কে তিনি স্বাগত জানান। ইরান ওই জোটে যোগ দিতে চাইলে রাশিয়া তাদের সিদ্ধান্তকে সম্মান করবে।

ল্যাভরভআরও জানান, ৩-৪ নভেম্বর মিনস্কে ইউরেশীয় নিরাপত্তা সম্মেলনে ইরানি কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ চাওয়া হয়েছে।

[সূত্র: রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুবাদ করা প্রেস বিবৃতি। সব বক্তব্য ল্যাভরভের নিজের।]

 

Visited 2 times, 2 visit(s) today