এজাজ মামুন
বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়েছে, তা দেশের রাজনৈতিক সংকটকে আরও ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এটি শুধু একটি আইনি বিশৃঙ্খলা নয়- এতে প্রতিফলিত হচ্ছে, কীভাবে একটি দেশ বিচারব্যবস্থার নাম করে স্বৈরাচারী পথে এগিয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশে আগে থেকেই রাজনৈতিক বিরোধ আর দ্বন্দ্ব ছিল। তবে ন্যায়বিচার ও প্রতিশোধের সীমা এত প্রকাশ্যে কখনও অতিক্রম করা হয়নি। নির্বাচিত নয় এমন একটি অন্তর্বর্তী সরকার যে তথাকথিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে (আইসিটি) পুনর্গঠন করেছে, তা সংবিধান বা সংসদের অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে।
১৯৭৩ সালের আইন সংশোধনও করা হয়েছে যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া। এখন এই ট্রাইব্যুনাল বিচার নয়, বরং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।
শেখ হাসিনার যে আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, তারা কোনো স্বাধীন আদালতের ন্যূনতম মানও পূরণ করেনি।
সমালোচকদের মতে—এই ট্রাইব্যুনাল বিচার নয়, বরং রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণের জন্য কাজ করছে। বিচার প্রক্রিয়া ছিল অস্বচ্ছ। শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে বিচার চালানো হয়েছে, আর এই ট্রাইব্যুনালের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে আন্তর্জাতিকভাবে। তাই অনেকেই বলছেন—এটি ন্যায়বিচার নয়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও ইন্টারন্যাশনাল বার অ্যাসোসিয়েশন—সবাই বলেছে, এটা ভুল বিচার এবং অন্যায় সিদ্ধান্ত।
তাদের বক্তব্য—এ আদালতে স্বাধীনতা নেই, বিচার ছিল পক্ষপাতদুষ্ট এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই এখানে বড় ভূমিকা নিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার যতই নিজেদের বৈধতা দাবি করুক, এ বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
আজ ঢাকায় যা ঘটছে, তা পাকিস্তানের সবচেয়ে অন্ধকার রাজনৈতিক সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৭৯ সালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল—যা বিশ্বব্যাপী অন্যায় বিচার হিসেবে পরিচিত। যে বাংলাদেশ পাকিস্তানের সেই দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, এখন তারাই সেই ইতিহাস পুনরাবৃত্তি করছে—এটা শুধু রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, নৈতিক ট্র্যাজেডি।
শেখ হাসিনার রায়ের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিশ্বের প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট ও কঠোর। বিচার প্রক্রিয়ায় প্রমাণ দেখার সুযোগ কম ছিল, প্রতিরক্ষা অধিকার সীমিত ছিল, আদালত স্বাধীন ছিল না এবং রাজনৈতিক চাপ ছিল—এমন অভিযোগ উঠেছে। এমন অবস্থায় কোনো রায়ই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না—মৃত্যুদণ্ড তো নয়ই।
এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সুনাম দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—রাজনৈতিক প্রতিশোধ দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ভেঙে দিচ্ছে। এখন ব্যবস্থা না নিলে বাংলাদেশ আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে—যখন অর্থনীতি ও সমাজ আগে থেকেই চাপে রয়েছে।
সংকট আরও জটিল হয়েছে যখন বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতকে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ করেছে।
ভারতের জন্য এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— যদি ভারত তাকে ফেরত দেয়, তবে তা দক্ষিণ এশিয়ায় গণতন্ত্র রক্ষার ভারতের ঘোষিত অবস্থানকে দুর্বল করবে। আর আশ্রয় দিলে—ভারত মানবাধিকার রক্ষার পক্ষেই দাঁড়াবে এবং এই অঞ্চলে তার নৈতিক নেতৃত্ব প্রমাণিত হবে। এটি শুধু দুই দেশের সম্পর্কই নয়—ভারতের নৈতিক অবস্থানও নির্ধারণ করবে।
শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিতর্কের আড়ালে বাংলাদেশের বড় সমস্যা লুকিয়ে আছে— আইনের শাসন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা কমছে এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধ স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।
যখন আদালত রাজনৈতিক অস্ত্র হয়, যখন বিরোধীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড ব্যবহার হয়, যখন আইন স্বাধীনতা হারায়— তখন গণতন্ত্র ভেঙে পড়ে। আর অবশিষ্ট থাকে শুধু ভান করা স্বাধীনতা—ভেতরে দমন-পীড়ন।
একসময় দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান গণতন্ত্র হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ এখন কঠিন প্রশ্নের মুখে— রাজনৈতিক প্রতিশোধ কি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে গিলে ফেলবে?
বাংলাদেশের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত— গণতন্ত্রে ফিরবে, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করবে? নাকি এখনকার বিপজ্জনক পথে চলতে থাকবে—যেখানে নির্বাচনের বদলে ট্রাইব্যুনালে রাজনৈতিক লড়াই হয়?
শেখ হাসিনার বিচার শুধু একটি অন্যায় রায় নয়—এটি একটি সতর্কবার্তাও। বিশ্বের উচিত বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা।
বাংলাদেশকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের অন্ধচক্রে পতিত হতে দেওয়া যাবে না— যা দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতি ও আঞ্চলিক শান্তি—উভয়ই নষ্ট করবে।
ন্যায়বিচারই শেষ কথা হওয়া উচিত, প্রতিশোধ নয়।
আর দক্ষিণ এশিয়ার শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশগুলোর দায়িত্ব—এ বার্তা স্পষ্ট করে দেওয়া যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড আজকের বিশ্বে অগ্রহণযোগ্য।
লেখক পরিচিতি: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ফ্রিল্যান্স লেখক ও কলামিস্ট
