সারা বছরই গ্যাস সংকট: চরম ভোগান্তিতে রাজধানীবাসী, চাপের মুখে বিদ্যুৎকেন্দ্র

সারা বছরই গ্যাস সংকট: চরম ভোগান্তিতে রাজধানীবাসী, চাপের মুখে বিদ্যুৎকেন্দ্র
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীতে গ্যাস সংকট এখন আর ঋতুভেদে সীমাবদ্ধ নেই, প্রায় সারা বছরই চুলা জ্বলে না বহু এলাকায়। গত কয়েক মাস ধরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিয়েছে। রান্না-বান্না, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা শিল্প—সব ক্ষেত্রেই গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। সম্প্রতি গ্যাসের অভাব প্রকট হয়ে ওঠছে। রান্নাবান্না ও প্রয়োজনীয় কাজ সারতে পারছেন না রাজধানীবাসী।

ঢাকার লালমাটিয়া, রায়েরবাজার, রামপুরা, পুরান ঢাকা, শংকর, জিগাতলা, মালিবাগ, মগবাজারসহ অসংখ্য এলাকায় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। এটা নিয়মিত হয়ে গেছে। কেউ ভোরে রান্না সেরে নেন, কেউ আবার ইলেকট্রিক চুলা বা এলপিজির ওপর নির্ভর করছেন। এতে গ্যাস বিলের পাশাপাশি বিদ্যুৎ খরচও বেড়ে গেছে। আর ভোগান্তি বেড়েছে বেশি।

লালমাটিয়ার বাসিন্দা হুসনেয়ারা বেগম বলেন, ভোরে রান্না করে রাখতেই হয়। অতিথি আপ্যায়ন দূরের কথা, সময়মত বাচ্চাদের খাওয়ানোটাও এখন বড় দুশ্চিন্তার বিষয়।

একই এলাকার বেণুবর্ণা ধর বললেন, আগে শীতকালে সমস্যা হতো, এখন সারা বছরই একই অবস্থা। দুপুরে রান্না করতে পারি না। রাত জেগে বসে থাকতে হয় কখন গ্যাসের চাপ বাড়বে। বিকল্প হিসেবে অনেকেই গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। একদিকে গ্যাস বিল অন্যদিকে সিলিন্ডার- দুদিকেই খরচ টানতে আমরা দিশেহারা।

রায়েরবাজারের রেশমা আক্তারের কথা আরও কষ্টকর। তিনি বলেন, রাতে ১১টার পর সামান্য গ্যাস পাই। বাধ্য হয়ে ইলেকট্রিক চুলা কিনেছি। দুই বিল দিয়েই চলতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলএনজির সরবরাহ দৈনিক ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে এলেই সংকট দেখা দেয়। গত ২৪শে নভেম্বর সরবরাহ হয়েছে মাত্র ৮৮২ মিলিয়ন ঘনফুট। এই ঘাটতি মোকাবিলায় বিদ্যুৎকেন্দ্রেও গ্যাস কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, তবুও বাসাবাড়িসহ সবখাতেই সংকট নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পেট্রোবাংলার সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের মোট দৈনিক চাহিদা: ৩,৮০০-৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সরবরাহ: ২,৬১৬ মিলিয়ন ঘনফুট। দৈনিক ঘাটতি: ১,২০০-১,৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চাহিদা ছিল ২,৪৮৭ মিলিয়ন ঘনফুট, সরবরাহ হয়েছে মাত্র ৭৬৬ মিলিয়ন ঘনফুট।

জানা গেছে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১,৭৩৪ মিলিয়ন ঘনফুট। সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন কমে গেছে অনেক। ভোলা গ্যাসক্ষেত্র বড় আবিষ্কার হলেও জাতীয় গ্রিডে আনা সম্ভব হয়নি। সাবসী পাইপলাইন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ভোলা বরিশাল সেতু নির্মিত হলে পাইপলাইন যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে, এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পেট্টোবাংলা জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ সালে ৫০টি এবং ২০২৬-২৮ সালে আরও ১০০টি কূপ খনন ও অনুসন্ধানের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরোনো কূপে গ্যাস মিললেও তা অল্প পরিমাণে হবে, আর নতুন কূপ থেকে গ্যাস সরবরাহ পেতে বছর লেগে যাবে।

তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ জানান, গত বছরের তুলনায় উৎপাদন প্রতিদিন ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট কম। চাহিদা ২,১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও আমরা পাই মাত্র ১,৫০০ মিলিয়ন। বাধ্য হয়েই রেশনিং করতে হচ্ছে।

আবাসিক খাতে সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, চাহিদা-সরবরাহের ফারাক যত কমবে, ততই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

Visited 24 times, 1 visit(s) today