মব-সহিংসতা-দখলবাজি, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দায় টান পড়েছে রাজস্ব-কর আদায়েও

মব-সহিংসতা-দখলবাজি, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দায় টান পড়েছে রাজস্ব-কর আদায়েও
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

গত বছরের ৫ই আগস্টের পর থেকে দেশজুড়ে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি এবং ধারাবাহিক বিক্ষোভ-আন্দোলনের ফলে অর্থনীতি থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য পর্যন্ত সবখানেই নেমে এসেছে স্থবিরতা। বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে, মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার বেড়েছে, আর এসবের প্রভাবে অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে অর্থনৈতিক মন্দা। আয় কমে গেছে মানুষের, ব্যবসায়ীরা লাভ তো দূরের কথা টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। বহু কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, চাকরি হারাচ্ছেন অসংখ্য শ্রমিক।

এই অবস্থায় চলতি বছর রাজস্ব-কর আদায়ে টান পড়েছে। বিশেষ করে ইউনূস সরকার ক্ষমতা দখলের পর রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও নিজেদের লোক দিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর করে বিপুল ক্ষতি করা হয়েছে। বিনা বিচারে জেলে আটকে রাখা হয়েছে শিল্পপতিদের। তাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে জাতীয় অর্থনীতিতেই প্রভাব পড়েছে।

এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে সরকারের রাজস্ব আয়ে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২২০ কোটি টাকায়। ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতার কারণে করদাতারাও কর দিতে পারছেন না।

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, যারা রিটার্ন দিয়েছেন তাদের মধ্যে প্রায় ৮৮ শতাংশই শূন্য রিটার্ন জমা দিয়েছেন। গত করবর্ষে ৪৫ লাখ মানুষ আয়কর দিলেও এবার এখন পর্যন্ত মাত্র ১৪ লাখ ৮৫ হাজার মানুষ রিটার্ন জমা দিয়েছেন।

উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে তাত্ত্বিকভাবে বেশি ভ্যাট পাওয়ার কথা থাকলেও ভ্যাট আদায়েও দেখা দিয়েছে ঘাটতি। অক্টোবর পর্যন্ত ভ্যাট আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা কম। মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভ্যাটের হিসাব বৃদ্ধি পেলেও ভোগ কমে যাওয়ায় মোট আদায় কম হয়েছে।

আমদানি খাতেও বড় ধরনের পতন দেখা যাচ্ছে। চার মাসে আমদানি শুল্ক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা। নতুন বিনিয়োগ বন্ধ, উৎপাদন কমে যাওয়া এবং এডিপি বাস্তবায়ন শ্লথ হয়ে পড়ায় আমদানি কমছে। একই কারণে উৎস কর, ভ্যাট ও অন্যান্য পরোক্ষ করও কমে গেছে। এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ৮.৩৩ শতাংশ।

বিশ্লেকদের মতে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ নেই, উৎপাদন কমছে, কারখানা বন্ধ হচ্ছে, উচ্চ সুদের চাপে ব্যবসা প্রসার থমকে গেছে। মানুষের আয় কমায় ভোগও কমে গেছে। এসব মিলেই আমদানি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতি কমে গেছে। রিজার্ভ কিছুটা বাড়লেও তা আমদানি কমারই প্রতিফলন।

২০২৫ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ী দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা কয়েক বছর ধরেই ৬ শতাংশের ওপরে ছিল। আগামী অর্থবছরেও এটি ৪.৮ শতাংশের বেশি হবে না বলেই বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস।

বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি মনে করেন, রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতেই হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, আর ব্যাংকিং খাত থেকে নিলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি আরও কমে যাবে যা বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, বড় ঘাটতি অব্যাহত থাকলে দেশ ঋণচক্রে পড়ে যেতে পারে।

রাজস্ব ঘাটতি কমাতে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সুশাসন নিশ্চিত করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না ফিরলে অর্থনীতিও চাঙ্গা হবে না।

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও একই কথা বলছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অর্ডার কম, উৎপাদন কমে যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অর্ডার দিতে দ্বিধায় রয়েছেন। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু অভিযোগ করে বলেন, বড় শিল্প খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা না হলেও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক হচ্ছে—যা হতাশাজনক।

বিকেএমইএ ও বিটিএমএ নেতারাও দ্রুত রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, নির্বাচন ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক সরকারই অর্থনীতিকে আবার গতি দিতে পারে। তাদের মতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে চাঞ্চল্য ফিরলে রাজস্ব আদায়ও পুনরুদ্ধার হবে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকট একে অপরকে আরও গভীর করছে। রাজস্ব ঘাটতি, বিনিয়োগহীনতা, উৎপাদন কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থান সংকটের এই চক্র ভাঙতে হলে জরুরি ভিত্তিতে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ও ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রয়োজন।

Visited 12 times, 1 visit(s) today