শামীম মোল্লা-তোফাজ্জল হত্যা মামলা: দায়সারা চার্জশিট, আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে

শামীম মোল্লা-তোফাজ্জল হত্যা মামলা: দায়সারা চার্জশিট, আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গত ১৮ সেপ্টেম্বরির দুই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এক বছর পেরিয়ে এখনও শেষ হয়নি। একটি মামলায় অভিযোগপত্রকে দায়সারা দাবি করে পুনঃতদন্ত চাওয়া হয়েছে। অন্য মামলার বেশ কয়েকজন আসামি ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছেন। দুইটি মামলার তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

রিপোর্টে বলা হয়, ঢাকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফজলুল হক মুসলিম হলে ছাত্রদের মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগে মানসিক ভারসাম্যহীন তোফাজ্জল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় শাহবাগ থানায় মামলা হয়ে তদন্তে নামেন পুলিশ। তদন্ত শেষে গত ডিসেম্বরে পুলিশ ২১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দায়ের করে। পরে বাদী ঢাবির এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ আদালতে চার্জশিটের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করেন। আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেয়।

বাদীর নারাজি আবেদনে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের জবানবন্দিতে যে আটজনের নাম এসেছে তাদেরই চার্জশিটে বাদ পড়েছে। এছাড়া ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইলে ধারণ করা ছবি ও ভিডিও এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে লাশ নেয়ার কনস্টেবলকে সাক্ষী হিসাবে রাখা হয়নি বলে অভিযোগ আছে। বাদীর দাবি, তদন্ত সঠিকভাবে হলে চার্জশিটে আরও অনেকের নাম উঠে আসতে পারত।

পিবিআই দক্ষিণের স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশন ইউনিট এই মামলার ডকেট এপ্রিলে পেয়েছে বলে জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হান্নানুল ইসলাম। তিনি দাবি করেন, “ডকেট পেয়েছি। তদন্ত চলছে।” মামলার চার্জশিটে বর্তমানে কারাগারে থাকা ছয়জন আসামির নাম রয়েছে—জালাল মিয়া, আহসান উল্লাহ ওরফে বিপুল শেখ, আল হোসাইন সাজ্জাদ, মোত্তাকিন সাকিন শাহ, সুমন মিয়া ও ওয়াজিবুল আলম। আর বাকি ১৫ জন পলাতক আসামির মধ্যে ফিরোজ কবির, আবদুস সামাদ, সাকিব রায়হান, ইয়াছিন আলী গাইন, ইয়ামুজ্জামান ইয়াম, ফজলে রাব্বি, শাহরিয়ার কবির শোভন, মেহেদী হাসান ইমরান, রাতুল হাসান, সুলতান মিয়া, নাসির উদ্দিন, মোবাশ্বের বিল্লাহ, শিশির আহমেদ, মহসিন উদ্দিন সাফি ও আবদুল্লাহিল কাফি রয়েছেন।

তোফাজ্জলের পরিবারের সদস্য আসমা আক্তার সমকালকে বলেন, ‘তোফাজ্জল হত্যায় জড়িতদের একজনও যেন চার্জশিটের বাইরে না থাকে। দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’ তিনি আরও বলেন, এক বছরেও তদন্ত শেষ না হলে বিচার কীভাবে হবে, তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।

অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও শিক্ষার্থী শামীম মোল্লাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ওই ঘটনায় আট শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করে এবং তাদের মধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একজন নিজে আত্মসমর্পণ করেন। বহিষ্কারাদেশ থাকলেও বহিষ্কৃতদের মধ্যে পাঁচজন সময়ের পর ক্যাম্পাসে ফিরে এনেছেন। তাদের মধ্যে আহসান লাবিব জাকসুর সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যরা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের শাখা ও সংগঠনের বিভিন্ন পদে সক্রিয় রয়েছেন।

পিবিআই ঢাকা বিভাগের একটি ইউনিট জাবির হত্যা মামলাটিও তদন্ত করছে। পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার কুদরত-ই খুদা সমকালকে বলেন, ‘তদন্ত চলছে। হত্যাকাণ্ডে কার কী ভূমিকা ছিল ঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।’

নিহত শামীম মোল্লার ভাই শাহীন মোল্লা অভিযোগ করেন, ‘বিনা দোষে আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। এক বছর পার হলেও তদন্ত শেষ হয়নি। অনেক আসামি বাইরে ঘোরাফেরা করলেও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। আমরা ন্যায্য বিচার চাই।’

আদালত থেকে পিবিআইকে দু’টি মামলায় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি ও আদালতের নির্দেশনার পরও তদন্ত দীর্ঘায়িত হওয়ায় নিহতদের পরিবার ও সমাজে হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। তারা দ্রুত ও কার্যকর তদন্ত শেষে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।

Visited 14 times, 1 visit(s) today