নির্বাচনের আগে সাংবাদিকদের “স্বাধীন সাংবাদিকতা”র প্রতিশ্রুতি মির্জা ফখরুলের

 নির্বাচনের আগে সাংবাদিকদের “স্বাধীন সাংবাদিকতা”র প্রতিশ্রুতি মির্জা ফখরুলের
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা: বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) এখন সাংবাদিকদের নিজেদের আস্থায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছে, যাতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তাদের সমর্থন পাওয়া যায়। বিএনপির সেক্রেটারি জেনারেল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সোমবার একটি আলোচনা সভায় বলেন, বিভক্ত সাংবাদিকরা রাজনীতিবিদদের সেবায় নামে এবং তারা দলে দলে রাজনৈতিক দলে আটকে যায়। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, নির্বাচনে ক্ষমতায় এলে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গণমাধ্যম নিশ্চিত করবেন।

কিন্তু আগস্ট২৪ উত্তর বাংলাদেশে সাংবাদিকদের উপর অত্যাচার, গ্রেপ্তার এবং মিডিয়া হাউজের দখলের সময় বিএনপি ও মির্জা ফখরুল নীরব ছিলেন, কোনো প্রতিবাদ করেননি।

বর্তমানে (নভেম্বর ২০২৫) বাংলাদেশে কমপক্ষে ২৫ জন সাংবাদিক জেলে আছেন, যাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে সহযোগিতা বা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) এই গ্রেপ্তার ও নির্যাতনকে “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারী প্রবণতা” বলে সমালোচনা করেছে এবং জানিয়েছে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ ও গণহত্যার মতো ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে স্বাধীন সাংবাদিকতাকে দমন করা হচ্ছে; তারা অবিলম্বে সব সাংবাদিকের মুক্তি ও নির্যাতনকারীদের বিচার দাবি করেছে।

ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার (বিজেসি) আয়োজিত ‘মিডিয়া সংস্কার নিয়ে আলোচনা’ শিরোনামের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্ব কনফারেন্স সেন্টারে মির্জা ফখরুল এই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন,

“সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজন থাকায় তারা নিজেরাই রাজনীতিবিদদের পকেটে ঢুকে যায়। বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচিতে আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি, স্বাধীন গণমাধ্যম গড়ে তুলব এবং এর জন্য কমিশন গঠন করব।”

তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মিডিয়া সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন কোথাও আলোচিত হয়নি, কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় এলে এটিকে অগ্রাধিকার দেবে।

কিন্তু এই প্রতিশ্রুতির পটভূমিতে বিএনপির অতীতের নীরবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত এক বছরে বহু সাংবাদিককে হামলা করা হয়েছে, বিচার ছাড়াই দিনের পর দিন জেলে বন্দি করে রাখা হয়েছে এবং বিএনপি-পন্থী সাংবাদিকদের দ্বারা মিডিয়া হাউসগুলো দখল করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মির্জা ফখরুলসহ বিএনপি নেতৃবৃন্দ কোনো প্রতিবাদ করেননি বা সাংবাদিকদের পক্ষে বা “প্রেস ফ্রীডমের” পক্ষে আওয়াজ তোলেননি। বরং, তারা নীরবে এই পরিস্থিতি মেনে নিয়েছিলেন।

এখন, আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে তারা সাংবাদিকদের আস্থায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছেন, যাতে আসন্ন নির্বাচনে সাংবাদিকদের সহযোগিতা পাওয়া যায় রাজনৈতিক ভাবে লাভবান হতে পারেন।

ফখরুল সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “বিএনপির মতো দল চায় না যে সাংবাদিকরা দলীয় হয়ে যাক বা কারো পকেটে থাকুক। কিন্তু আপনারা নিজেরাই বিভক্ত হয়ে ফ্যাসিবাদকে সমর্থন করেছেন গত ১৫ বছরে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, সাংবাদিকদের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে দূরে থেকে পেশাগত নীতি মেনে স্বাধীন সাংবাদিকতা করতে হবে।

বিজেসির প্রস্তাবিত বিষয়গুলো—যেমন ব্রডকাস্ট মিডিয়ার জন্য আলাদা আইন, জাতীয় ব্রডকাস্ট কমিশন, মজুরি বোর্ড, চ্যানেলগুলোকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি—যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে তাহলে অগ্রাধিকার পাবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ফখরুল উল্লেখ করেন, ১৯৭৫ সালে বাকশাল ব্যবস্থায় চারটি ছাড়া সব সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে যায় এবং বাকিগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান স্বাধীন সংবাদপত্রের ব্যবস্থা করে অনেক সংবাদপত্রের উত্থান ঘটান। বিএনপির শাসনকালে মিডিয়া আধুনিকীকরণের অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যা আজকের টিভি চ্যানেলগুলোর ভিত্তি তৈরি করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

কিন্তু এই আশ্বাস সত্ত্বেও, বিএনপির এই অবস্থান নির্বাচনী কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মধ্যে বিএনপি-আওয়ামী লীগের যুক্ত বিভাজনকে তিনি সমালোচনা করলেও, নিজেদের পক্ষপাতদুষ্ট অতীতের দিকে ইঙ্গিত করেননি। সাংবাদিক সম্প্রদায় এবার বিএনপির এই প্রতিশ্রুতিকে কীভাবে গ্রহণ করবে, তা দেখার বিষয়।

 

Visited 11 times, 1 visit(s) today