বাংলাদেশের সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯৯৬ সালের ২৬শে মার্চ ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। এই ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১২ দিন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের পটভূমি
মূলতঃ দীর্ঘ ১০ বছর জেনারেল এরশাদ শাসনের পরে দেশের সবগুলো রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের যুগপৎ আন্দোলনের ফলে রাষ্ট্রপতি এরশাদ ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন। তখনই মূলতঃ প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কথা রাজনৈতিক মাঠে আসে।
এরপর বিএনপি আমলে ১৯৯৪ সালের ২০শে মার্চ মাগুরার উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি জোরালো হয়। ১৯৯৪ সালের ৬ই ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিরোধীদল আওয়ামী লীগ এবং জামায়াত পৃথক সমাবেশে করে বিএনপিকে ২৭শে ডিসেম্বর-এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেওয়ার জন্য সময় বেঁধে দেন।
কিন্তু তৎকালীন বিএনপি সরকার এই দাবি না মানায় ২৮ তারিখ সংসদে তৎকালীন বিরোধীদলের (আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দল) ১৪৭ সাংসদ একযোগে পদত্যাগ করেন।
এভাবে ভাঙা সংসদ নিয়ে বিএনপি তার কার্যকাল অতিবাহিত করে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরাকার ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরিবর্তে ৫ম সংসদ ভেঙে দিয়ে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি একটি একতরফা ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করায়।
আওয়ামী লীগের তুমুল আন্দোলনের কারণে খালেদা জিয়া বাধ্য হয়ে ১৯৯৬ সালের ৩রা মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল সংসদে আনার ঘোষণা দেন। ১৯শে মার্চ ষষ্ঠ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে, ২১শে মার্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল সংসদে উত্থাপন করা হয়, ২৬শে মার্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল সংসদে পাশ হয় এবং আওয়ামী লীগের তুমুল আন্দোলনের কারণে মাত্র ১২ দিনের মাথায় বিএনপি ৩০শে মার্চ ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ ভেঙে দিতে বাধ্য হয়।
মাননীয় সাবেক প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হন এবং ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে এবং শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হন।
সপ্তম সংসদের মেয়াদ শেষ হবার পর শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন যথাযথ নিয়মে সাবেক প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হন। ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং বিএনপি সরকার গঠন করে, খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন। মওদুদ আহমেদ তার আইনমন্ত্রী হন।
বিএনপি ২০০৪ সালের ১৭ই মে সংসদে সংবিধানের ১৪ তম একটি সংশোধনী আনে। এই সংশোধনীর একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিলো সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বয়স ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ করা।
মাননীয় বিচারপতি মহোদয়দের বয়স বাড়ানোও কোনো সমস্যা না, কিন্ত সমস্যা হলো তৎকালীন সময়ের সদ্যবিদায়ী প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান- যিনি অবসর গ্রহণ করেন ২০০৪ সালের ২রা জানুয়ারি। তবে নতুন করে অবসরের বয়সসীমা বাড়ানোর কারণে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত মাননীয় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেনের অবসরের তারিখ পুনঃনির্ধারিত হয় ২০০৭ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি। অর্থাৎ সংবিধানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অনুযায়ী কে এম হাসান সাহেবই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্বটা পাওয়ার উপযুক্ত হন।
তৎকালীন প্রধান বিরোধীদল আওয়ামী লীগের আপত্তি ছিলো সাবেক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানকে নিয়ে। কারণ কে এম হাসান এক সময় বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন।
সুতরাং মওদুদ আহমেদ বুঝে-শুনেই সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় বিচারপতিদের বয়স বাড়ানোর ব্যবস্থা করলেন, যেন কে এম হাসানকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বানানো যায় এবং নির্বাচনকেন্দ্রীক নীল নকশা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়। এখানেই মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যাবস্থার কবর রচিত হয়।
কে এম হাসান যেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে না পারেন সে ব্যাপারে আওয়ামী লীগ ব্যাপক জনমত গঠনের মাধ্যমে ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে। অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াতও কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বানানোর জন্য উঠেপড়ে লাগলো। ফলাফল হলো ২০০৬ সালের ২৮শে অক্টোবর পল্টনে ৪০ জনের মৃত্যু।
এই প্রাণহানির পর কে এম হাসান সাহেব তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে বিব্রতবোধ করলেন। কিন্তু তিনি যদি ২৮শে অক্টোবরের আগে বিব্রত হতেন, তবে হয়তো ৪০ জন নিরীহ মানুষের জীবন রক্ষা পেত।
এরপর তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির দলীয় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের দায়িত্ব নিয়ে নিলেন! আওয়ামী লীগ এবং দেশের জনগন ইয়াজউদ্দিনের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলে ইয়াজউদ্দিন বাধ্য হলেন পদত্যাগ করতে এবং দেশে সামরিক আইন জারি হয়। তখন ফখরুদ্দীন আহমেদ নতুনভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হলেন।
ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বে দেশে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় এবং আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের সামনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন আসে। অর্থাৎ এই ব্যবস্থা সংবিধানে উল্লেখিত সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক কিনা? তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সাথে সাংঘর্ষিক কিনা?
কারণ সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অনির্বাচিত প্রতিনিধি কখনই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে না, তাহলে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা কি সংবিধানের মূল গঠনতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক কিনা?
দ্বিতীয়তঃ বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেন প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন যে দল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় সেই দল থেকে। সুতরাং বলা যায় প্রধান বিচারপতি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ইচ্ছা অনুযায়ীই নিয়োগ পান।
এরকম রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে যদি সংবিধানে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়ার স্থায়ী একটা বিধান থাকে তাহলে প্রধান বিচারপতির পদটি সম্পূর্ণ একটি রাজনৈতিক পদে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার তার নিরপেক্ষতা হারাবে। যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে।
আমি ধন্যবাদ জানাই মাননীয় সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হককে। তিনি সব লোভ-লালসা পরিত্যাগ করে বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগের ভয়াল থাবার হাত থেকে রক্ষা করে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
খায়রুল হক যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বৈধ ঘোষণা করতেন তাহলে বাংলাদেশ সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অনুযায়ী বিচারপতি খায়রুল হকই হতে পারতেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান। কারণ তিনি অবসর গ্রহণ করেন ২০১১ সালের ১৭ই মে। তার উত্তরসুরি মাননীয় প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন নিয়োগ পান ২০১১ সালের ১৮ই মে এবং অবসরে যান ২০১৫ সালের ১৬ই জানুয়ারি।
যদি খায়রুল হক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হতেন তাহলে দেশে ২৮শে অক্টোবরের মত আরেকটি সংঘাত হতো এবং বিচার বিভাগ আবারও প্রশ্নবিদ্ধ হতো। কারণ খায়রুল হক সাহেবই সাহস করে মার্শাল ল সরকারের সমস্ত কাজকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন। খায়রুল হক হয়তো এগুলো সব বিচার-বিশ্লেষণ করে বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগের কাছে থেক দুরে রাখতে চেয়েছিলেন।
অথচ আজ তাকেই জেল খাটতে হচ্ছে এবং কতিপয় রাজনৈতিক দলের বিরাগভাজন হতে হচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস একদিন তাকে ঠিকই স্মরণ করবে।
আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা আমাদের পরবর্তী জেন জি এবং আলফা প্রজন্মকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইতিহাস জানাতে পারিনি। তাই যারা বরাবরই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিপক্ষে ছিলো, যাদের হাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কবর রচিত হয়েছিলো এবং যারা এখনও সাবমিশন রাখছে যে ‘আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে’ অথচ আগামী নির্বাচন হতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে এবং এর পরের নির্বাচন হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে! এর অর্থ তাহলে কী দাঁড়াল? আমারা নির্বাচন করবো আমাদের ডিজাইন অনুযায়ী আর পরের নির্বাচনটি হবে নিরপেক্ষভাবে! তাই না?
ব্যাপারটা কিন্তু ভারী অদ্ভূত!
জনৈক আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ
৮ই নভেম্বর, ২০২৫
