৮৮ বছরের রেকর্ড ভেঙে বিপুল মুনাফা অর্জন কেরু অ্যান্ড কোম্পানির

৮৮ বছরের রেকর্ড ভেঙে বিপুল মুনাফা অর্জন কেরু অ্যান্ড কোম্পানির
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের বেশিরভাগ চিনিকল যখন লোকসানে লোকসানে জর্জরিত, টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছে, তখন চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় অবস্থিত দেশের ঐতিহ্যবাহী কেরু অ্যান্ড কোম্পানির চিনিকল তার ঐতিহ্য ধরে রাখছিল প্রতিবছর। তবে এবার ছাপিয়ে গেল অতীত ইতিহাস, মুনাফা অর্জনের ইতিহাস রচনা করল প্রতিষ্ঠানটি। ৮৮ বছরের ইতিহাসে এবারের মুনাফা ভাঙল সকল রেকর্ড। এবারও লাভের বড় একটি অংশ এসেছে ডিস্টিলারি বা মদ উৎপাদন বিভাগ থেকে।

তবে চিনি বিভাগ এখনো লোকসানে ডুবে থাকায় সেটিই বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কেরুর হিসাব বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গেল ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ৬টি বিভাগের মধ্যে ৫টিতে লাভের মুখ দেখেছে কেরু। সর্বাধিক আয় এসেছে ডিস্টিলারি বিভাগ থেকে। সেখানে উৎপাদিত হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ২২০ কেস বিদেশি মদ (ফরেন লিকার), ২৪ লাখ ৮৯ হাজার প্রুফ লিটার কান্ট্রি স্পিরিট এবং ২১ হাজার লিটার ভিনেগার। এসব পণ্যের বাজারমূল্য ১৯০ কোটি ২৬ লাখ ৭৭ হাজার টাকা।

সব মিলিয়ে সরকারকে রাজস্ব ও ভ্যাট বাবদ প্রদান করা হয়েছে ১৪০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।

এ ছাড়া লোকসানে ডুবে থাকা চিনি কারখানার ৬২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ করেও কেরু ১২৯ কোটি ৪৪ লাখ ৭৪ হাজার টাকার মোট মুনাফা করেছে, যা প্রতিষ্ঠার পর থেকে সর্বোচ্চ। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মুনাফা ছিল ১১২ কোটি ৭ লাখ ৯১ হাজার টাকা।

চিনি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবার ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৭০ হাজার টন আখ মাড়াই করে চার হাজার ৪৫২ টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১৫০ টন আখ মাড়াই করেছে কেরু চিনিকল, যা শতকরা ৫.১০ ভাগ আহরণ হারে চিনি উৎপাদনে সহায়ক হয়েছে।

অন্যদিকে ডিস্টিলারি বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, ৯ ধরনের দেশিয় মদ তৈরি হয় কেরুর এই বিভাগে। ইয়েলো লেবেল হুইস্কি, গোল্ড রিবন জিন, ফাইন ব্র্যান্ডি, চেরি ব্র্যান্ডি, ইম্পেরিয়াল হুইস্কি, অরেঞ্জ কুরাকাও, জারিনা ভদকা, রোসা রাম এবং ওল্ড রাম।

 

চলতি অর্থবছরের জুন পর্যন্ত স্পিরিট উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬০ লাখ প্রুফ লিটারে, যা পূর্বের বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছে কারখানা কর্তৃপক্ষ।

কেরু অ্যান্ড কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (কারখানা) সুমন কুমার বলেন, পুরনো যন্ত্রপাতির কারণে চিনিকল বিভাগে লোকসান বাড়ছে। এজন্য চিনি কারখানাকে আধুনিকায়ন করতে বিএমআর প্রকল্পের কাজ চলমান আছে। কাজ শেষ হলে লোকসান অনেকটা কমে আসবে।

মহাব্যবস্থাপক (কৃষি বিভাগ) আশরাফুল আলম ভূঁইয়া জানান, আধুনিক প্রযুক্তি, আখের সঙ্গে সাথি ফসল ও উচ্চ ফলনশীল জাতের আখ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে চিনি উৎপাদনের কাঁচামালের পর্যাপ্ততা থাকবে এবং উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে।

মহাব্যবস্থাপক (ডিস্টিলারি বিভাগ) রাজিবুল হাসান বলেন, অটোমেশন ও আধুনিক বোতলজাতকরণের কারণে কেরু অ্যালকোহলের উৎপাদন এবং বিক্রি বেড়েছে। তাই মুনাফাও রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান বলেন, ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর এবারই প্রথম কেরু ১২৯ কোটি টাকার বেশি মুনাফা অর্জন করেছে। আখের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে, উন্নতমানের বীজ ও সার সরবরাহ এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আখ চাষিদের আগ্রহী করে তোলা হয়েছে। যার ফলে চাষি ও কেরু উভয়ই লাভবান হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কেরুর জৈব সার ব্যবহারে কৃষকরা ইতিবাচক ফল পাচ্ছেন এবং এটি সারা দেশে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। কোম্পানির অন্যান্য পণ্য যেমন ভিনেগার, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, জৈব সার এবং স্পিরিট বিক্রিতেও প্রবৃদ্ধি এসেছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যখন দেশের অন্য চিনিকলগুলো মিলিয়ে প্রায় ৬০০ কোটি টাকারও বেশি লোকসানে রয়েছে, সেখানে কেরুই একমাত্র লাভজনক প্রতিষ্ঠান।

Visited 24 times, 1 visit(s) today