দীর্ঘ ২০ বছর পর আবারও বসছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের (জেইসি) বৈঠক। আগামীকাল (সোমবার) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে নবম জেইসি বৈঠক, যেখানে দুই দেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করবে। তবে অর্থনৈতিকভাবে টালমাটাল অবস্থায় থাকা পাকিস্তানের সঙ্গে এমন বৈঠকের যৌক্তিকতা নিয়েই এখন প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা।
বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, আর পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকবেন দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী আলী পারভেজ মালিক। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জানিয়েছে, বৈঠকের মূল আলোচ্য হবে বাণিজ্য ভারসাম্য ও সহযোগিতা বাড়ানো।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—পাকিস্তানের অর্থনীতি বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি দুই অঙ্ক ছাড়িয়ে গেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সংকট, শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আইএমএফের কঠোর শর্তে টিকে থাকা—সব মিলিয়ে পাকিস্তান এখন অর্থনৈতিকভাবে দোদুল্যমান এক রাষ্ট্র। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের তুলনামূলক স্থিতিশীল অর্থনীতি পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের বৈঠক করছে কেন—এই প্রশ্ন উঠছে নানা মহলে।
অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় পাকিস্তান এখন বাংলাদেশ থেকে অনেক পেছনে। বাণিজ্য ভারসাম্যও সম্পূর্ণ তাদের পক্ষে। এই বৈঠক থেকে বাংলাদেশ কী পাবে, তা স্পষ্ট নয়।”
ইআরডির তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে ৭৮৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, কিন্তু রপ্তানি করতে পেরেছে মাত্র ৮০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবল ঘাটতি থাকা অবস্থায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানোর আলোচনা অর্থনৈতিক লাভের চেয়ে কূটনৈতিক ইঙ্গিত হিসেবেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, কৃষি গবেষণা, হালাল ফুড, তথ্যপ্রযুক্তি ও নৌপরিবহনসহ কয়েকটি খাতে সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এখনো নিশ্চিত নয়, এসব সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) জেইসি বৈঠকেই স্বাক্ষরিত হবে কি না।
পাকিস্তানের জ্বালানিমন্ত্রী আলী পারভেজ মালিক বৈঠকের পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন বলে জানা গেছে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতার বাইরে রাজনৈতিক সংকেত?
চলতি বছরের শুরুতে ১৫ বছর পর দুই দেশের পররাষ্ট্র দপ্তর পর্যায়ের বৈঠক হয়। এর পর থেকেই সম্পর্ক উষ্ণ করার ধারাবাহিক পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তানের কয়েকজন মন্ত্রী সম্প্রতি ঢাকা সফর করেছেন, আবার বাংলাদেশের এক উপদেষ্টা গিয়েছেন ইসলামাবাদে।
তবে অর্থনৈতিকভাবে নাজুক পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার এই উদ্যোগকে অনেকে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখছেন। ঢাকা কি আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন ভারসাম্য খুঁজছে—এ প্রশ্নও উঠছে।
এক সাবেক কূটনীতিক বলেন, “পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল। বরং এটি দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির নতুন কৌশলগত অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এই সম্পর্ক কতটা বাস্তব সুফল বয়ে আনবে, তা সন্দেহজনক।”
অন্যদিকে, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছেন, “আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক চাই। অর্থনৈতিক সহযোগিতা আমাদের জাতীয় স্বার্থেই প্রয়োজন।”
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে—যে দেশ নিজ অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে আন্তর্জাতিক ঋণনির্ভর, সেই পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের বৈঠকে বাংলাদেশ কী বাস্তব লাভ দেখতে পাচ্ছে, নাকি এটি কেবল কূটনৈতিক সৌজন্যের আড়ালে নতুন ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের চেষ্টা!
