চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম বন্দরে গতকাল থেকে গেট ফি বৃদ্ধির প্রভাবে পণ্যবাহী ট্রেইলার চলাচল স্থগিত হয়েছে। ৫৭ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ২৩০ টাকায় ফি বাড়ানোর ফলে প্রাইম মুভার মালিকরা বিক্ষোভ করে বন্দরে কনটেইনার পরিবহন বন্ধ রেখেছে। এতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড রপ্তানিকারকদের আরও বিপাকে ফেলেছে। এতে খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) গত ১৪ই অক্টোবর রাত ১২টা থেকে নতুন ট্যারিফ কার্যকর করেছে, যাতে সামগ্রিকভাবে ৪১ শতাংশ পর্যন্ত মাশুল বৃদ্ধি হয়েছে। এর মধ্যে ভারী যানবাহন যেমন ট্রাক, কভার্ড ভ্যান এবং প্রাইম মুভার ট্রেইলারের গেট ফি ৩০০ শতাংশ বেড়েছে।
চবকের অর্থ ও হিসাব রক্ষণ বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক জানান, এই বৃদ্ধি বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সেবা উন্নয়নের জন্য।
কিন্তু ব্যবসায়ীরা এতে তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলছেন, এটি শুধুমাত্র আসন্ন ডিপি ওয়ার্ল্ডের স্বার্থে করা হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বিশ্বের অন্যতম বড় বন্দর পরিচালক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ড চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং অন্যান্য টার্মিনালের দায়িত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নভেম্বরের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। এর আগে এই বৃদ্ধি করে বন্দরকে আরও লাভজনক করে তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ করছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নেতারা।
চট্টগ্রাম চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই)-এর সাবেক সভাপতি আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “বন্দর লোকসানের মুখে নেই, তবু ৪১ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এতে লাভ পাবে শুধু ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো বিদেশি কোম্পানি, আর আমরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হব।”
চট্টগ্রাম প্রাইম মুভার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন জানান, প্রতিদিন ৬ থেকে ৮ হাজার ট্রেইলার বন্দরে প্রবেশ করে। নতুন ফির কারণে প্রতি ট্রেইলারে অতিরিক্ত ১৭২ টাকা খরচ বাড়ছে, যা মাসে লক্ষাধিক টাকার অতিরিক্ত বোঝা। “এমন হঠাৎ বৃদ্ধি সহ্য করা সম্ভব নয়, তাই আমরা চলাচল বন্ধ রেখেছি,” তিনি বলেন।
এতে কনটেইনার আটকে পড়ায় আমদানিকারকরা ডিমারেজ চার্জ দিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এমনিতেই আমেরিকার অতিরিক্ত ট্যারিফের কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সংকুচিত হয়ে আসছে। পোশাক, চামড়া, পাটজাত পণ্যের রপ্তানি কমছে, যাতে বছরে ৪০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, “বন্দর খরচ বাড়লে আমাদের পণ্যের প্রতিযোগিতামূল্য কমে যাবে। কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনামের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী বন্দরগুলোর তুলনায় চট্টগ্রাম আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। কে দেখবে রপ্তানিকারকদের স্বার্থ? সরকারকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে ট্যারিফ পুনর্বিবেচনা করতে হবে।”
চট্টগ্রামের সর্বস্তরের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো যৌথ বিবৃতি জারি করে বলেছে, এই বৃদ্ধি প্রত্যাহার না করলে বন্দর অবরোধের হুমকি দেবেন। নৌপরিবহন উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেনের কার্যালয় এ বিষয়ে এখনও কোনো বক্তব্য দেয়নি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংকট সমাধান না হলে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে গুরুতর ধাক্কা লাগবে, যা অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করবে।
