চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
দেশের প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে নিরাপত্তা ও পণ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। জালিয়াতি ও জাল নথিপত্র ব্যবহার করে একের পর এক মূল্যবান পণ্যবোঝাই কনটেইনার গায়েব হয়ে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, গত দুই বছরে বন্দর থেকে অন্তত ১০টি কনটেইনার পাচার বা গায়েব হলেও এখন পর্যন্ত একটিরও হদিস মেলেনি। বন্দর, কাস্টমস এবং অসাধু সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের একটি সংঘবদ্ধ চক্রের যোগসাজশেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে ব্যবসায়ী ও বন্দর ব্যবহারকারীরা অভিযোগ করছেন।
সর্বশেষ ঘটনা: ২ কোটি টাকার কাপড়ের কনটেইনার গায়েব
সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরের সিসিটি ইয়ার্ড থেকে গাজীপুরের ‘গোল্ড স্টার গার্মেন্টস’ নামের একটি তৈরি পোশাক কারখানার প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের আমদানি করা কাপড়ের কনটেইনার উধাও হয়ে গেছে। চীন থেকে আমদানি করা এ চালানের বিপরীতে ৪৫ লাখ টাকা পরিশোধের পর গত ৩০ আগস্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ডেলিভারি নিতে গেলে কনটেইনারটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১১ আগস্ট ‘আফরিনা ট্রেডিং’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে কনটেইনারটি বন্দর থেকে বের করে নেওয়া হয়। এ চালানের কাপড় দিয়ে ফ্রান্সে ৫ লাখ পিস পোশাক রপ্তানির কথা ছিল, যা অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বিপুল আর্থিক ক্ষতি ও রপ্তানি আদেশ বাতিলের মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
নিয়মের ফাঁক নাকি অভ্যন্তরীণ যোগসাজশ?
বন্দর থেকে একটি কনটেইনার খালাস করতে প্রায় ২০টি ধাপে যাচাই-বাছাই ও অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। তবে গোল্ড স্টার গার্মেন্টসের ঘটনায় দেখা গেছে চরম অসংগতি। নামানো সংক্রান্ত কিপডাউন স্লিপে ‘আফরিনা ট্রেডিং’-এর নাম থাকলেও ১১ সেপ্টেম্বর রাতে কনটেইনারটি বের করে নেয় ‘প্যারামাউন্ট ট্রেডিং’ নামের আরেকটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান। আবার কাস্টমসে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে ‘সোনারগাঁও অ্যাসোসিয়েটস’ নামের তৃতীয় এক প্রতিষ্ঠান, যেখানে পণ্যের বিবরণ দেওয়া ছিল ‘ফল’। ফলের বিল অব এন্ট্রি ও ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে কীভাবে কাপড়ের কনটেইনার খালাস হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক গোলাম রব্বানি রিগ্যান জানান, বন্দরের মেকানিক্যাল ও ট্রাফিক বিভাগের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ছাড়া ২০টি ভেরিফিকেশন ধাপ পার হওয়া অসম্ভব। দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় এই অসাধু চক্রটির বিরুদ্ধে তদন্ত হলেও ভুক্তভোগীরা প্রতিকার পাচ্ছেন না।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও ব্যবসায়ীদের দাবি
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, ঘটনা তদন্তে কাস্টমস প্রতিনিধি সহ ৬ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তবে কেবল তদন্ত কমিটি গঠনেই সীমাবদ্ধ না থেকে গায়েব হওয়া কনটেইনার উদ্ধার ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা। এ ধরনের ধারাবাহিক ঘটনায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বন্দরের পুরো ট্র্যাকিং ও খালাস প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ে শতভাগ ডিজিটালাইজ করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
