নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে ইয়াবার পর একের পর এক নতুন ধরনের মাদক ছড়িয়ে পড়ছে, যার মূল লক্ষ্য তরুণ প্রজন্ম। বিশেষ করে জুলাইযোদ্ধারা প্রচন্ড পরিমাণে আসক্ত এসব মাদকে। বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা গেছে, তরুণদের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে প্রভাবিত করার নেপথ্যে এসব ভয়াবহ মাদকের ব্যবহার করা হয়েছিল আগে থেকেই। ভয়াবহ এসব নতুন মাদকের দ্রুত বিস্তার ঘটছে তরুণদের মাঝে। মাদক ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে ইংরেজি মাধ্যমের সাবেক শিক্ষার্থীরাও।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সূত্র বলছে, দেশে এখন প্রায় দেড় কোটির বেশি মাদকসেবী রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, মাদক কারবারের গডফাদার ও তাদের চেইন ধরে নিচের দিকে সক্রিয় রয়েছে প্রায় এক হাজার ২৩০ জন চিহ্নিত চক্র। কিন্তু সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা সত্ত্বেও এই তালিকা এখনো হালনাগাদ করা হয়নি। মাদক গডফাদারদের অনেকেই থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনের তরুণ গোষ্ঠীদের একটি বড়ো অংশই মাদকসেবী। তাদের মাদক সেবনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রকাশ পেয়েছে।
২০২৩ সালের জুলাই আন্দোলন ছিল তরুণদের একটি বড় অংশ ছিল। কিন্তু আন্দোলনের ছত্রছায়ায় বহু সমন্বয়কারী ও অংশগ্রহণকারী তরুণ-তরুণীর মধ্যে মাদকাসক্তির প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের বাড়ির সামনে একটি মব চালানোর সময় আশপাশের তরুণদের মধ্যে নেশাগ্রস্ত আচরণ উদ্বেগজনকভাবে চোখে পড়ে। বিশেষ করে ইনকিলাব মঞ্চের ওসমান হাদী একজন চিহ্নিত মাদকসেবী বলে জানিয়েছে তারই সহযোদ্ধারা।
সম্প্রতি ধরা পড়েছে ‘এমডিএমএ’ নামে নতুন এক ভয়াবহ মাদক। যুক্তরাজ্য থেকে ডাকযোগে পাঠানো এই মাদক দেশে সরবরাহ করছিল একটি শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক সংঘবদ্ধ চক্র। ডিএনসি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে পাঁচজনকে, যাদের মধ্যে দুজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সৈয়দ শাইয়ান আহমেদ ও আসিফ মাহবুব চৌধুরী।
এ ছাড়া জি এম প্রথিত সামস ও অপূর্ব রায় নামে দুজন ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং জুবায়ের নামে একজন মধ্যস্থতাকারীও গ্রেপ্তার হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, পাঁচটি এমডিএমএ বড়ির পার্সেল পৌঁছে দিতে প্রথিত সামসকে ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার চুক্তি হয়, যার মধ্যে অগ্রিম হিসেবে সে পেয়েছে তিন দফায় ১৫-১৬ হাজার টাকা।
এ ছাড়া মাদক হিসেবে ব্যবহৃত ‘কেটামিন’এর ভয়াবহ ব্যবহার ধরা পড়েছে। টঙ্গী থেকে কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে ৬.৪৪ কেজি কেটামিন পাচারের সময় জব্দ করা হয়। তোয়ালের ভেতরে বিশেষভাবে লুকোনো এই চালান যাচ্ছিল ইতালির উদ্দেশে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে চাঁদপুরের মো. মাসুদুর রহমান জিলানীকে।
ডিএনসি বলছে, বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক মাদকের ট্রানজিট হাব হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মাত্র এক মাসে ধরা পড়েছে কোকেন, কেটামিন, আইস, এমডিএমএ, হেরোইনসহ নানা মাদকদ্রব্য।
গত ২৬শে আগস্ট, শাহজালাল বিমানবন্দরে গায়ানার নারী এম এস ক্যারেন পেটুলা স্টাফলি গ্রেপ্তার হন ৮ কেজির বেশি কোকেনসহ। অন্যদিকে, আদাবর থেকে গ্রেপ্তার হওয়া খাইরুল ইসলাম ওরফে রিয়ান’র কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে ৪ হাজার পিস অ্যাম্ফিটামিনযুক্ত ইয়াবা এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা কুশ ও ১.৬ কেজি আইস।
খুচরা মাদক ব্যবসায় অর্থ ভাগাভাগি নিয়েও সহিংসতা বাড়ছে। সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীর আদর্শনগরে সন্ত্রাসীরা বাসায় ঢুকে একজন নারীকে ছুরিকাঘাত ও তার ভাইকে গুলি করে।
পুলিশ জানিয়েছে, ভুক্তভোগী লাভলী বেগম ও সুমন মিয়া মাদক চক্রের সক্রিয় সদস্য। এছাড়াও সমন্বয়করা দেশব্যাপী চাদাবাজি ও মব চালাচ্ছে মাদক সেবন করে এমন অভিযোগ আছে।
এ ছাড়া মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় মাদকের ভাগ নিয়ে বিরোধের জেরে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছে, যা মাদকের ভয়াবহ সামাজিক প্রভাবেরই প্রতিচ্ছবি।
ডিএনসির মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ জানান, এখনকার মাদকচক্র অত্যন্ত পরিকল্পিত ও আধুনিক। ডিজে পার্টি, অভিজাত এলাকার বাসা, কুরিয়ার সার্ভিস, এমনকি অনলাইন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেও মাদক কেনাবেচা হচ্ছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদকের ভয়াবহতা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শুধু অভিযান নয়, নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি, প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রিহ্যাব কর্মসূচি চালাতে হবে।
