নিজস্ব প্রতিবেদক।
ঢাকা, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন-২০২৫ সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়েছে। সকাল ৯টার মধ্যেই ভোটার লাইনে ভিড় জমে উঠেছে, এবং স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে ভোট গ্রহণ চলছে। তবে, ভোট কারচুপি, ভোটার লাইনে প্রচারণা, শিবিরের প্রার্থীদের নামে টিক দেওয়া ব্যালট পেপারের মতো বিভিন্ন অভিযোগ নির্বাচনকে ঘিরে উঠে এসেছে। এই অভিযোগগুলো সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের উৎসাহে নির্বাচন পরিচ্ছন্ন ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ৮টি ভোটকেন্দ্রে ভোট গ্রহণ চলছে। ডাকসুতে ২৮টি পদের জন্য ৪৭১ জন প্রার্থী এবং ১৮টি হল সংসদে ২৩৪টি পদের জন্য ১,০৩৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এবার প্রতিটি ভোটারকে ৪১টি ভোট দিতে হচ্ছে, যার মধ্যে কেন্দ্রীয় সংসদের জন্য পাঁচ পৃষ্ঠার এবং হল সংসদের জন্য এক পৃষ্ঠার ব্যালট পেপার ব্যবহৃত হচ্ছে। অপটিক্যাল মার্ক রিকগনিশন (ওএমআর) শিটের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ হচ্ছে, যা ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রবর্তিত।
তবে, ভোট গ্রহণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিভিন্ন অভিযোগ উঠে এসেছে। একজন ভোটার প্রথম আলোর সাংবাদিককে জানান, “ভোটকেন্দ্রের কাছে শিবিরের সমর্থকরা প্রচারণা করছে। কিছু ব্যালট পেপারে ইতিমধ্যে তাদের প্রার্থীদের নামে টিক দেওয়া ছিল।” আরেকজন শিক্ষার্থী বলেন, “ভোটার লাইনে প্রার্থীদের সমর্থকরা নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিতে চাপ দিচ্ছে। এটা নির্বাচনের স্বচ্ছতার জন্য ক্ষতিকর।” এই অভিযোগগুলোর মধ্যেও ভোটারদের উৎসাহ কমেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীরা সকাল থেকেই ভোট দিতে হলের বাইরে নির্ধারিত কেন্দ্রগুলোতে উপস্থিত হয়েছেন।
নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে। ভোটকেন্দ্রগুলোতে পুলিশ, র্যাব এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের চিফ রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীদের সক্রেটিভ ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে সব ব্যবস্থা নিয়েছি। অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করা হবে এবং প্রয়োজনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য এবার ব্রেইল পদ্ধতিতে ব্যালট পেপারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যারা ব্রেইল পড়তে পারেন, তারা এই পদ্ধতিতে ভোট দিতে পারবেন। যারা ব্রেইল পড়তে পারেন না, তারা অন্যের সহায়তায় সাধারণ পদ্ধতিতে ভোট দিতে পারবেন। ভোটারদের পরিচয় নিশ্চিত করতে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা পে-ইন স্লিপ বা লাইব্রেরি কার্ড এবং অন্যান্য বর্ষের শিক্ষার্থীরা হল আইডি কার্ড, বিশ্ববিদ্যালয় আইডি কার্ড বা লাইব্রেরি কার্ড দেখাতে পারবেন। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর ভোটারদের আঙুলে অমোচনীয় কালি দেওয়া হচ্ছে।
নির্বাচনের প্রচারণা ২৬ আগস্ট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলেছিল। এই সময়ে বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীরা তাদের ব্যালট নম্বর উল্লেখ করে ফেসবুকে এবং হলের কক্ষে কক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। তবে, কিছু প্যানেলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছিল। উদাহরণস্বরূপ, জুলিয়াস সিজার তালুকদার ও বায়েজিদ বোস্তামীকে নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ততার অভিযোগে ভোটার ও প্রার্থী তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, কিছু প্রার্থীর বিরুদ্ধে মনোনয়নপত্র বাতিলের অভিযোগে আপিল ও তদন্ত চলেছিল।
একজন ভোটার বলেন, “অভিযোগ থাকলেও এবারের নির্বাচন অনেক বেশি স্বচ্ছ মনে হচ্ছে। ওএমআর শিট এবং ব্রেইল ব্যালটের ব্যবস্থা ইতিবাচক।” তবে, আরেকজন শিক্ষার্থী মত প্রকাশ করেন, “ভোটকেন্দ্রে প্রচারণা বন্ধ করতে হবে। এটা ভোটারদের স্বাধীন পছন্দের ওপর প্রভাব ফেলে।” নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন-২০২৫ বিভিন্ন অভিযোগের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের উৎসাহে এগিয়ে যাচ্ছে। ভোট কারচুপি, প্রচারণার অপব্যবহার এবং ব্যালট পেপারের কারচুপির অভিযোগ নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, তিন স্তরের নিরাপত্তা এবং ওএমআর পদ্ধতির ব্যবহার নির্বাচনকে আরও নির্ভরযোগ্য করেছে। শিক্ষার্থীরা আশা করছেন, এই নির্বাচন জাতীয় রাজনীতির একটি শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক মডেল হিসেবে কাজ করবে।
