নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান বিন হাদীর ওপর গুলির ঘটনার তদন্তে ভয়াবহ বিভ্রান্তি ও সাংঘর্ষিক তথ্য সামনে এসেছে। একদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) হামলাকারীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের সর্বাত্মক চেষ্টা চালানোর কথা বলছে, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক সূত্র জানাচ্ছে—মূল অভিযুক্তরা ইতোমধ্যে দেশের সীমান্ত পেরিয়ে বিদেশে পালিয়ে গেছে।
রোববার বিকেলে ডিএমপি সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত কমিশনার নজরুল ইসলাম জানান, হাদীর ওপর গুলি চালানোর ঘটনায় দুইজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর শেখ। তার ভাষ্যমতে, মোটরসাইকেলের পেছনে বসে ফয়সাল গুলি চালায় এবং আলমগীর মোটরসাইকেল চালকের ভূমিকায় ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে এবং তারা যেন দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে, সে জন্য বিজিবি ও দেশের সব স্থল, নৌ ও বিমানবন্দরকে সতর্ক করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি অনুযায়ী, তাদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার কোনো তথ্য নেই। তবে তিনি এ ও বলেছেন যে, শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী এলাকার সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে লোক পারাপারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে দুজনকে আটক করেছে ডিএমপি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ওসমান হাদীর ওপর হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
পুলিশের নিজেদের বক্তব্যের মধ্যেই এই সাংঘর্ষিক তথ্যের পাশাপাশি আরেক তথ্য দিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র। সূত্রগুলোর দাবি, শনাক্ত হওয়া ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর শেখ ইতোমধ্যে সীমান্ত পার হয়ে দেশ ছেড়েছে। তাদের পালিয়ে যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল বলে জানা গেছে।
গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্তে ফয়সাল ও আলমগীরের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব নেতার নাম ও পরিচয় যেন প্রকাশ্যে না আসে, সে কারণেই প্রশাসনের ভেতরে থাকা জামায়াত-ঘনিষ্ঠ একটি অংশের সহায়তায় মূল আসামিদের দ্রুত দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একবার বিএনপি, আরেকবার আওয়ামী লীগকে দায়ী করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে জামায়াত-শিবির সমর্থকরা। কিন্তু হামলার ঘটনায় নিজেদের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে দলটি প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য দিচ্ছে না।
গত শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় রিকশায় করে যাওয়ার সময় ওসমান হাদীর ওপর মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা গুলি চালায়। গুলিতে গুরুতর আহত হাদীকে তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, তিনি এখনও আশঙ্কামুক্ত নন।
ঘটনার আগে একাধিকবার হত্যার হুমকি পাওয়ার কথা নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছিলেন হাদী। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ মহল থেকে বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে তাকে নিয়মিত নজরদারি ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে তার ওপর হামলার ঘটনাকে নিছক ব্যক্তিগত শত্রুতা নয়, বরং রাজনৈতিক হত্যাচেষ্টা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশ মনে করছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই হত্যাচেষ্টা চালানো হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে স্বতন্ত্র ও আন্দোলনঘনিষ্ঠ প্রার্থীদের ভয় দেখিয়ে মাঠ ছাড়া করার কৌশল হিসেবেই হাদীর ওপর হামলা হয়ে থাকতে পারে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুলিশের পক্ষ থেকেও গোয়েন্দা সূত্রের এই তথ্য নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান এখনো আসেনি।
ঘটনাটি এখন কেবল একটি গুলির মামলা নয়; বরং এটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশ্বাসযোগ্যতা, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
