ডেডলাইন ২১শে আগস্ট, ২০০৪ঃ হ/ত্যা পরিকল্পনা ও ঘটনা পরবর্তি বাস্তবতা

ডেডলাইন ২১শে আগস্ট, ২০০৪ঃ হ/ত্যা পরিকল্পনা ও ঘটনা পরবর্তি বাস্তবতা
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক। ঢাকা, ২১শে আগস্ট, ২০২৫, বৃহস্পতিবারঃ

২০০৪ সালের সারাদেশে জঙ্গিদের বোমা হামলা এবং গোপালগঞ্জে পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে ২১ আগস্ট বিকেলে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যালয়ের সামনে এক সমাবেশের আয়োজন করে।

২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই চলতে থাকে নির্বাচন উত্তর সহিংসতা ও নির্যাতন, সংখ্যালঘুদের উপর জুলুম, অত্যাচার আর ধর্ষণ। পরবর্তী সময়ে জাগ্রত মুসলিম জনতা, বাংলাদেশ নামক উগ্রপন্থী সংগঠনের নেতা বাংলাভাই সিদ্দিকুর রহমান ও শায়খ আব্দুর রহমানের উদ্ভব ঘটে, যারা বিচারক হত্যা, জঙ্গিবাদ সহ সারাদেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রাখে।

 

তারই প্রতিবাদে ২১শে আগস্ট সমাবেশের ডাক দেয় ততকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। সমাবেশের প্রধান অতিথি শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানস্থলে বিকেল পাঁচটায় পৌঁছালে, একটি ট্রাকের ওপর তৈরি মঞ্চে তিনি কুড়ি মিনিটের বক্তৃতা শেষে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করার ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা মঞ্চ থেকে নিচে নেমে আসতে থাকেন। ঠিক এমন সময় শুরু হয় মঞ্চ লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা। মাত্র দেড় মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরিত হয় ১১টি শক্তিশালী গ্রেনেড। এতে ঘটনাস্থলেই ১২ জন এবং পরে হাসপাতালে আরও ১২ জন নিহত হন। আহত হন শেখ হাসিনা নিজেও, এবং তাকে রক্ষা করতে গিয়ে গুলি ও গ্রেনেডের স্পিন্টারের আঘাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষী মাহবুব, আহত হন শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে মানব বর্ম তৈরি করে থাকা আমু, হানিফ সহ সিনিয়র নেতারা। শেখ হাসিনাকে নিরাপদে গাড়িতে পৌঁছে দিতে গিয়ে আততায়ীর গুলিবর্ষণের শিকার হয়ে সেখানেই লুটিয়ে পড়েন বিশ্বস্ত দেহরক্ষী মাহবুব। নিহত হন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের স্ত্রী ও বিসিবি প্রধান নাজমুল হোসেন পাপনের মা আইভি রহমান সহ ২৪ নেতাকর্মী। আহত হন শতাধিক। অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন, অনেকেই চিরতরে কর্মক্ষমতা আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার নিশ্চয়তা হারিয়েছেন।

গ্রেনেড হামলা পরবর্তী ঘটনাক্রম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসহযোগিতা:

কিন্তু ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরবর্তী ঘটনাগুলো ছিল আরও মর্মান্তিক। আহত ও নিহতদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসেনি কোনো পুলিশ বা নিরাপত্তায় নিয়োজিত সংস্থার কেউ, বরং লাঠিচার্জ করে কার্যালয় এলাকা খালি করা হয় ঘণ্টাখানেকের মধ্যে। আওয়ামী লীগের কর্মীরা নিজেরাই আহত ও নিহতদের নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালের দিকে রিকশা-স্কুটার নিয়ে দৌড়ে যান। কিন্তু সরকার ও নিরাপত্তা সংস্থার নির্দেশে কোথাও তৎক্ষণাৎ চিকিৎসা পাননি আহতরা। চিকিৎসার অভাবে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা গেছেন হাসপাতালের বারান্দাতেই, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যথায় কাতরেছেন আহতরা, কেউ এগিয়ে আসেনি, না কোনো ডাক্তার, না কোনো নার্স। মামলা নেয়নি কোনো থানা।

ঘটনা পরবর্তী বিএনপি-জামাতের রাজনৈতিক নোংরামি:

এর পরবর্তী রাজনৈতিক নোংরামিগুলো ছিল আরও ভয়াবহ। সেই একই বছরের ১৫ই সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে বিএনপি-জোট সরকারের সাংসদরা ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার জন্য খোদ আওয়ামী লীগকেই দায়ী করে বক্তৃতা দেন। তারা বলেন, জনগণের ভোটে ক্ষমতায় যেতে ব্যর্থ হয়ে এখন নৈরাজ্যের মাধ্যমে জনগণের সহানুভূতি আদায় করে ক্ষমতায় যেতে চায় আওয়ামী লীগ এবং সেই উদ্দেশ্যে নিজেদের নেতাকর্মীদের উপর গ্রেনেড হামলা চালিয়েছে আওয়ামী লীগ, কারণ এতে কোনো বড় নেতার কোনো ক্ষতি হয়নি।

বিএনপি-জামাত জোট সরকার সারা দেশবাসীকে এটা বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করে যে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা আরএডব্লিউ-এর পরিকল্পনা অনুযায়ী এই গ্রেনেড হামলা ঘটে এবং শেখ হাসিনা নিজে ভ্যানিটি ব্যাগে করে সেই গ্রেনেড নিয়ে গিয়েছিলেন। চারদলীয় বিএনপি-জামাত জোট সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে ওই সব মিথ্যা তথ্য বিএনপি-জামাত সরকারের সমর্থক পত্রপত্রিকা প্রচারও করে। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সমর্থক বুদ্ধিজীবী সভা-সেমিনারে একই সুরে বক্তব্য দিয়ে, পত্রিকায় কলাম লিখে সেই মিথ্যা প্রচারে সহায়তা করেছিলেন। অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে ততকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতও একই সুরে কথা বলেছিলেন, “এটা আওয়ামী লীগের কাজ। এই ঘটনায় তারাই তো লাভবান হবে, তারা সহানুভূতি পাবে।”

তদন্তে বাধা ও ভিন্নখাতে প্রবাহের চেষ্টা ও স্কেপগোট:

১। শৈবাল সাহা পার্থ: ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় তৎকালীন বিএনপি-জামাত জোট সরকার সর্বপ্রথম ফাঁসিয়েছিল শৈবাল সাহা পার্থ নামে একজন নিরীহ হিন্দু ছেলেকে। ওই গ্রেনেড হামলার ঘটনার তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের হার্ডনেট সাইবার ক্যাফে থেকে শেখ হাসিনাকে হত্যার হুমকি দিয়ে একটি দৈনিকে ই-মেইল পাঠানোর ঘটনার নাটক সাজিয়ে ২৫ আগস্ট বোনের বাসা থেকে ঐ সাইবার ক্যাফেতে ডেকে এনে একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা শৈবাল সাহা পার্থকে আটক করে। ৪ দিন অজ্ঞাত স্থানে আটকে নির্যাতনের পর ২৯ আগস্ট সিআইডি ইন্সপেক্টর তাকে আদালতে পাঠিয়ে পর্যায়ক্রমে ১৪ দিন রিমান্ডে মালিবাগ সিআইডি অফিসে নিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য বর্বর নির্যাতন চালায়।

২৪ ঘণ্টা চোখ কালো কাপড়ে বেঁধে বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার পাশাপাশি লাঠিপেটাসহ সকল নির্যাতন চালানো হয়। টানা ১৮ দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকাকালীন সারাক্ষণ চলেছে অভিনব কায়দায় নির্যাতন আর সাজানো স্বীকারোক্তি আদায়ের চাপ। পার্থর মা ছেলের মুক্তির জন্য মন্দিরে নিজের রক্ত দিয়ে পূজা দেন। পার্থ যেহেতু ভারতে লেখাপড়া করেছেন তাই তাকে ভারতের চর হিসেবে প্রমাণেরও চেষ্টা করেছিল বিএনপি-জামাত জোট সরকার। দীর্ঘ ৭ মাস কারাভোগের পর হাইকোর্টের নির্দেশে ২০০৫ সালের ২৩ মার্চ কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।

২। জজ মিয়া: রমনা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোখলেসুর রহমানকে মূল পরিকল্পনাকারী সাজিয়ে জজ মিয়াকে মূল হামলাকারী বানিয়ে গ্রেফতার করে গ্রেনেড হামলার জন্য তার জবানবন্দি আদায়ের চেষ্টা করে বিএনপি-জামাতের পোষ্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থারা। ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার তদন্ত ও বিচারের জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের চাপের মুখে ২০০৫ সালের ৯ জানুয়ারি নোয়াখালির সেনবাগ থেকে জজ মিয়াকে গ্রেফতার করে গ্রেনেড হামলায় মামলার অপরাধী হিসেবে দেখানো হয়। পরে জজ মিয়ার দরিদ্র পরিবারের আজীবন ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়ার লোভ দেখিয়ে এবং দুই ভায়রা রানা ও শফিকুল ইসলামকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিতে বাধ্য করা হয়। সিআইডির কথামতো না চললে জজ মিয়াকে ফাঁসিতে ঝুলানোর ভয় দেখানো হয়। এতেও রাজি না হলে তাকে চোখ বেঁধে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে নিয়ে ক্রসফায়ারে হত্যার প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

এমন পরিস্থিতিতে ঘাবড়ে যান জজ মিয়া। শেষ পর্যন্ত জজ মিয়া সিআইডির প্রস্তাবে রাজি হন। তার পরিবারকে আজীবন ভরণপোষণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন সিআইডি কর্মকর্তা তৎকালীন এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান, এএসপি আব্দুর রশীদ এবং এসপি রুহুল আমিন। সিআইডির এই তিন কর্মকর্তাই জজ মিয়া নাটক ফাঁদেছিলেন বলে জানা গেছে। ২০০৭ সালে রাজনৈতিক পালাবদলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে মামলার তদন্ত নতুনভাবে শুরু হয়। নির্দোষ প্রমাণিত হন জজ মিয়া। ২০০৯ সালের ২৭ জুলাই কারামুক্ত হন তিনি। এরপর এ মামলার সাক্ষী হয়ে জবানবন্দি দেন। তাতে ‘জজ মিয়া নাটক’ সাজানোয় ওই তিন সিআইডি কর্মকর্তার নাম উঠে আসে।

 আলামত নষ্ট ও তদন্ত ভিন্নখাতে প্রবাহের চেষ্টা:

ততকালীন জোট সরকারের উচ্চপর্যায়ের পরামর্শে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা, সিআইডি ও পুলিশের তখনকার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলার তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছিলেন নানাভাবে। তারা পেশাদার খুনি চক্র, আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব এবং ভারতের উপর এই হামলার দায়-দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করে প্রকৃত অপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। ভারত সংশ্লিষ্টতা প্রমাণে ১৩ জনের নামে চার্জশিট দেয় তারা। উদ্দেশ্যমূলকভাবে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ পরিষ্কার করে মামলার আলামত নষ্ট করা হয়েছিল। লোক দেখানোর কৌশল হিসেবে আনা এফবিআই আর ইন্টারপোলের বিশেষজ্ঞদের ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল। জোট সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরকে সে সময় ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে কোনো তদন্ত করতে সরাসরি নিষেধ করেছিলেন। এবং নিজস্ব বিশ্বস্ত অফিসারদের দিয়ে তদন্ত করার নির্দেশ দেন, যার প্রতিবেদন আজও কোথাও প্রকাশিত হয়নি।

মূল হামলাকারী মুফতি হান্নান:

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার মূল হামলাকারী ছিল আফগানিস্তানে তালেবানদের হয়ে যুদ্ধ করা এবং ট্রেনিং নেওয়া এবং হারকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান ওরফে আবুল কালাম ওরফে আব্দুল মান্নান। এছাড়াও ২০০৫ সালের ২৭শে জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এমএস কিবরিয়া হত্যা, ২০০৪ সালের ২১শে মে সিলেটের শাহজালালের মাজারে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরির উপরে হামলা, ২০০০ সালে গোপালগঞ্জে কোটালিপাড়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভামঞ্চের কাছে বোমা পুঁতে রাখার শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টা ঘটনার নেতৃত্ব দেন এই মুফতি হান্নান। মুফতি হান্নানের জবানবন্দিতে উঠে শেখ হাসিনাকে হত্যা করার তার দীর্ঘদিনের ইচ্ছার কথা, যে উদ্দেশ্যে সে ১৯ বার শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করে, যার মধ্যে ৭ বার একক চেষ্টা ছিল। কিন্তু যথেষ্ট সহযোগিতা আর সুযোগের অভাবে সে বারে বারে ব্যর্থ হচ্ছিল। এই সুযোগ আর সহযোগিতার সেতুবন্ধনটা করে দেন মাওলানা তাজউদ্দিন, যে ছিল বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর ভাই।

হারকাতুল নেতা মুফতি হান্নানের সাথে হাওয়া ভবনের যোগসূত্র:

বাংলাদেশকে শরিয়াপন্থী ধারায় পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের বানানোর ভাবধারায় বিশ্বাসী মুফতি হান্নান এবং মাওলানা তাজউদ্দিনের উগ্র ইসলামপন্থী চিন্তা ছিল প্রথম যোগসূত্র। মুফতি হান্নানের শেখ হাসিনাকে হত্যার দীর্ঘদিনের লালায়িত স্বপ্ন আর মাওলানা তাজউদ্দিনের উগ্রপন্থী ইসলামের মিলিত চিন্তা এবং পরিকল্পনা নিয়ে তারা যায় তাজউদ্দিনের ভাই বিএনপির উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর কাছে। আব্দুস সালাম পিন্টু তাদের নিয়ে যায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের কাছে। শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা এবং তা করতে আগ্রহীদের ব্যাপারে আলোচনা করতে ২০০৪ সালের ১৪ই আগস্ট লুৎফুজ্জামান বাবর এবং কুমিল্লার বিএনপির নির্বাচিত সাংসদ কায়কোবাদ হাওয়া ভবনে তারেক রহমানের কাছে যান এবং মুফতি হান্নানের পরিকল্পনা আর আগ্রহ উপস্থাপন করেন। হাওয়া ভবন থেকে উক্ত পরিকল্পনা নিয়ে গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পরের দিনই মুফতি হান্নানের ডাক পড়ে সেখানে।

২০০৪ সালের ১৫ই আগস্টে হাওয়া ভবনে অনুষ্ঠিত হওয়া উক্ত বৈঠকে মুফতি হান্নানের পরিকল্পনা শুনতে উপস্থিত ছিলেন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, হারিস চৌধুরী, লুৎফুজ্জামান বাবর, ডিজিএফআই-এর তৎকালীন মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার (অব.) আব্দুর রহিম এবং তৎকালীন বিএনপি নেত্রী ও সরকারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান। মুফতি হান্নান তার জবানবন্দিতে এটাও উল্লেখ করেন যে, উক্ত মিটিংয়ে সকল পরিকল্পনা শুনে তারেক রহমান সায় দেন এবং বলেন, “আপনাদের হাওয়া ভবনে আর আসার দরকার নেই। এরপরে বাবর সাহেব এবং আব্দুস সালাম পিন্টুর সাথে যোগাযোগ রেখে কাজ করবেন। তারা আপনাদের সকল প্রকার সহযোগিতা করবে।” মুফতি হান্নান তারেক রহমানকে এও বলে আশ্বস্ত করে যে, আপনি সবসময় ক্ষমতায় থাকবেন।

মাওলানা তাজউদ্দিন গ্রেনেড সরবরাহকারী:

হাওয়া ভবন থেকে গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর পাকিস্তানি নাগরিক মাজেদ ভাটকে নির্দেশ দেন আরজিএস মিলিটারি গ্রেড গ্রেনেড সরবরাহ করার। মাজেদ ভাট থেকে সেই গ্রেনেড এসে পৌঁছায় আব্দুস সালাম পিন্টুর বাসায়। আব্দুস সালাম পিন্টুর বাসায় ২০০৪ সালের ১৮ই আগস্ট তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনের কাছ থেকে সেই সকল গ্রেনেড সংগ্রহ করেন মুফতি হান্নান। সেখানে মুফতি হান্নানের সাথে হারকাতুল জিহাদের সামরিক শাখার হরকাতুল জিহাদ নেতা আবু তাহের জান্দাল ও কাজল উপস্থিত ছিল। ২১শে আগস্টের পরে মাওলানা তাজউদ্দিনকে তড়িঘড়ি করে ভুয়া পাসপোর্টের মাধ্যমে পাকিস্তান পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেই ভুয়া পাসপোর্টে তার নাম ছিল বাদল। এই কাজে সহায়তা করেছিল তৎকালীন গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই-এর কর্মকর্তা এটিএম আমিন এবং সাইফুল ইসলাম ডিউক। মাওলানা তাজউদ্দিনকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আদতে বিএনপি সরকার এবং হাওয়া ভবনের সাথে ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা পরিকল্পনার সকল কানেকশন মুছে ফেলার একটা চেষ্টা করা হয়েছিল।

কে এই মাজেদ ভাট?

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার উদ্দেশ্য ছিল মূলত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে টুকরা টুকরা করা। এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা, ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ যেন ক্ষমতায় না আসতে পারে। এ মামলায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি তেহরিক-ই-জেহাদি, লস্কর-ই-তৈয়বা, জইশ-ই-মোহাম্মদ, হরকাতুল জিহাদ (আল আলিমী) নামের জঙ্গি সংগঠনগুলোর নেতৃত্বদানকারী হিজবুল মুজাহিদীনের ইসলামাবাদ (পাকিস্তান) প্রধান আবদুল মাজেদ ভাট ওরফে ইউসুফ ভাটের (৫০) জবানবন্দি থেকে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

২০০৯ সালে মাজেদ ভাট ধরা পড়েন। তাকে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়ার পর একই বছর ৬ ডিসেম্বর তিনি ঢাকা সিএমএম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

মাজেদ ভাট তার জবানবন্দিতে বলেন, বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা চালাতে তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করতেন মাওলানা তাজউদ্দিন। তাজউদ্দিন সাহস জোগাতেন আর বলতেন, তার আপন ভাই (আবদুস সালাম পিন্টু) মন্ত্রিসভার সদস্য; কোনো পুলিশি ঝামেলা হবে না। মুজাফফর শাহ ঢাকায় থাকা অবস্থায় দুটি কার্টনে কিছু গ্রেনেড ও বিস্ফোরক পদার্থ দিয়ে যান। পাকিস্তান থেকে জাহাজে করে চট্টগ্রামে আসার পর মুজাফফরই গ্রেনেড ও বিস্ফোরক ঢাকায় আনার ব্যবস্থা করেন। তাজউদ্দিন সেসব গ্রেনেড ভারতের কাশ্মীরে পাঠাবেন বলে রাখেন। কখনো মাজেদ ভাটের বাসায়, কখনো তাজউদ্দিনের বাসায় রাখা হতো গ্রেনেডগুলো। ওই সময়ের মধ্যে তাজউদ্দিনের মাধ্যমে মুফতি হান্নান, মাওলানা আবু তাহেরসহ বাংলাদেশের অন্য জঙ্গিদের সঙ্গে পরিচয় হয় মাজেদের। ওই সময় মাজেদ তাজউদ্দিনকে নিয়ে কয়েকবার পাকিস্তান থেকে আসা গুলির চালান সংগ্রহ করে বাসায় রাখেন। কিন্তু সেসব গুলি ভারতের সীমান্তে অতিরিক্ত কড়াকড়ির কারণে কাশ্মীরে পাঠানো সম্ভব হয়নি।

বোমা হামলায় মুফতি হান্নানের সহকারীরা:

২১শে আগস্ট বোমা হামলার আগের দিন মুফতি আহসানুল্লাহ কাজল ও আবু জান্দাল ২০ আগস্ট ঘটনাস্থল ও আশেপাশের এলাকা রেকি করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২১ আগস্ট সকাল ১০টার মধ্যে হামলার জন্য নির্বাচিত জঙ্গিরা মুফতি হান্নানের বাসায় জড়ো হয়, সেখানে যোগ দেয় আবু সাইদ জাফর, কথিত সামরিক শাখার ডেপুটি চিফ কমান্ডার জাহাংগির বদর, মহানগর আমীর আবু তাহেরসহ আরও বেশ কয়েকজন। তাদের ব্রিফিং দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয় সেই সমাবেশস্থলে।

এরপর ২১ আগস্ট ৫টা ২২ মিনিটে শুরু হয় সেই লোমহর্ষক লীলা নকশার বাস্তবায়ন। বেশ কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে হামলায় অংশ নেয় হামলাকারীরা। হামলাকারীদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর ১৫ জন কর্মী ছিল।

এতো কিছু করেও সত্যকে লুকিয়ে রাখা যায়নি। ২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ওই হামলার ঘটনায় পুনরায় তদন্ত হয়। সেখানে নিষিদ্ধ সংগঠন হরকাতুল-জিহাদ-আল-ইসলাম নেতা মুফতি আবদুল হান্নান এবং তৎকালীন বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর নাম আসে।

২০০৯ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে পুনরায় তদন্ত শুরু হয়। ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার সাথে জড়িত থাকার দায়ে বিএনপি নেতা সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এবং আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ঢাকার একটি বিশেষ দ্রুত আদালত। রায়ে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক रহমান ও হারিস চৌধুরীসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অন্য মামলায় ফাঁসির কারণে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মোজাহিদ (মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড- কার্যকর), মুফতি আব্দুল হান্নান মুন্সী (ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর গ্রেনেড হামলায় মৃত্যুদণ্ড- কার্যকর), শরীফ শাহেদুল আলম বিপুলকে এ মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ১০ অক্টোবর ২০১৮ সালে বেলা ১২টায় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন এই রায় ঘোষণা করেন। এই মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমান এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ৪৯ জনকে আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে ৪১ জনের সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।

Visited 16 times, 1 visit(s) today