নিজস্ব প্রতিবেদক। ঢাকা, ৩রা আগস্ট, ২০২৫।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ২০% প্রতিশোধমূলক শুল্ক এড়াতে দেশটি থেকে তুলা আমদানি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। তবে, মার্কিন তুলার তুলনামূলক দাম এবং কটন ব্যতীত অন্য পণ্যের রপ্তানিতে এই শুল্কের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মার্কিন তুলার তুলনামূলক দাম
বাংলাদেশ বর্তমানে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের তুলা আমদানি করে, যার মধ্যে ৫০ কোটি ডলারের তুলা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে, যা মোট আমদানির প্রায় ১০%। বাকি তুলা প্রধানত আফ্রিকা (৫১%), ব্রাজিল (১৬%), এবং ভারত (১২%) থেকে আমদানি করা হয়। মার্কিন তুলার গুণগত মান উচ্চ, বিশেষ করে এর ফাইবারের দৈর্ঘ্য এবং স্থায়িত্বের কারণে, তবে দাম তুলনামূলকভাবে বেশি।
উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলার প্রতি টনের ফ্রি-অন-বোর্ড (এফওবি) মূল্য প্রায় ২৩৫ মার্কিন ডলার, যেখানে ভারত বা আফ্রিকার তুলার দাম ২০০-২২০ ডলারের মধ্যে থাকে। সমুদ্রপথে পরিবহন, বিমা, এবং অন্যান্য খরচ যোগ করলে মার্কিন তুলার মোট খরচ প্রতি টনে ৩০২.৬২ ডলারে পৌঁছায়, যা অন্যান্য উৎসের তুলনায় ১৫-২০% বেশি। ফলে মার্কিন তুলায় কটনজাত পণ্যের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে ২০% এর উপর।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, “মার্কিন তুলার দাম বেশি হলেও, শুল্ক ছাড়ের সুবিধা আমাদের রপ্তানি খরচ কমাতে সাহায্য করবে। আমরা পরিকল্পনা করছি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বাড়িয়ে ২০০ কোটি ডলারে নিয়ে যেতে, যা বর্তমানের চারগুণ।” এই কৌশল বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।“
কিন্তু বিজিএমইএর সভাপতির বক্তব্যে মার্কিন তুলার দামের কারনে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, আর মার্কিন তুলা আমদানীতে অতিরিক্ত সময় ও পরিবহন ব্যায়ের ব্যাপারে উল্লেখ করা হয় নাই। বাংলাদেশে বাৎসরিক তুলার চাহিদা প্রায় ১৬ লাখ মেট্রিকটন। এই তুলা থেকে ৪৩৩টি স্পিনিং মিলে ১৯ লাখ মেট্রিকটন সুতা বা ইয়ার্ন তৈরি করা হয়, যা আরএমজি খাতে কাপড় তৈরীতে ব্যাবহার হয়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্প, বিশেষ করে রেডি-মেড গার্মেন্টস (আরএমজি) খাত, কটন সুতার উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ২০২৩-২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কটন সুতার বাৎসরিক চাহিদা প্রায় ২৯ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে দেশীয় উৎপাদন থেকে প্রায় ১৯-২০ লাখ মেট্রিক টন সরবরাহ করা হয়, এবং বাকি ৯-১০ লাখ মেট্রিক টন আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। তবে, উচ্চমানের সুতার চাহিদা এবং উৎপাদন খরচের কারণে আমদানির প্রয়োজন হয়। এই সুতা মুলত আমদানি হয় ভারত, চীন, পাকিস্তান থেকে। এবন আই আমদানী সুতায় প্রস্তুতকৃত গার্মেন্টস অতিরিক্ত শুল্ক ছাড়ের অন্তর্ভুক্ত হবে না।
মার্কিন তুলায় শুল্ক ছাড় শুধুমাত্র কটন পোষাকের জন্য প্রযোজ্য হবে। অথচ বাংলাদেশের আরএমজি সেক্টরে কটন ছাড়াও আরো বিভিন্ন মিশ্র সুতার পোশাক প্রস্তুত হয় এবং আমেরিকায় রপ্তানি হয়, যেগুলোর উপর ৫২% পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে নতুন বাণিজ্য চুক্তির অধীনে।
কটন ব্যতীত অন্য পণ্যের রপ্তানিতে শুল্কের প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশোধমূলক শুল্ক কাঠামো অনুযায়ী, বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে গড়ে ১৬.৫% শুল্কের সঙ্গে অতিরিক্ত ২০% পাল্টা শুল্ক যোগ হলে মোট শুল্ক দাঁড়ায় ৩৬.৫%। পোশাক ছাড়াও বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে জুতা, টেক্সটাইল সামগ্রী, এবং কৃষিপণ্য রপ্তানি করে। এই শুল্ক বৃদ্ধির ফলে এসব পণ্যের দাম মার্কিন বাজারে বেড়ে যাবে, যা চাহিদা কমাতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, পুরুষদের আন্ডারপ্যান্টে শুল্ক ৬% থেকে বেড়ে ২৬% এবং কিছু পোশাকে ১% থেকে ২১% হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এই শুল্ক বৃদ্ধি পোশাক ব্যতীত অন্য পণ্যের রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে। জুতা এবং কৃষিপণ্যের মতো খাতে প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে, কারণ মার্কিন ভোক্তারা দাম-সংবেদনশীল।” তিনি আরও জানান, চীন (৩৫%) এবং ভারত (২৫ %) এর তুলনায় বাংলাদেশের শুল্ক হার (৩৬.৫%) কিছুটা বেশী বলে, এটি এখনও রপ্তানির পরিমাণ কমাতে পারে।
মার্কিন তুলার উচ্চ দাম স্বল্প মেয়াদে উৎপাদন খরচ বাড়াতে পারে, যা পোশাকের দামে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে, শুল্ক ছাড়ের সুবিধা এই খরচের কিছুটা ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে। কটন ব্যতীত অন্য পণ্যের ক্ষেত্রে, বাংলাদেশকে নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে শুল্কের প্রভাব কমাতে হবে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, শুল্ক বৃদ্ধির ফলে মার্কিন বাজারে চাহিদা কমলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এবং অন্যান্য রপ্তানি খাত এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৌশলগত পদক্ষেপ নিচ্ছে, তবে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে কূটনৈতিক আলোচনা এবং বাজার বহুমুখীকরণের ওপর।
