আয়নাল কারিগর
জুলাই-আগস্টের প্রধান স্ট্রাইকিং ফোর্স কিশোর গ্যাংয়ের ১৩৮টিম-এরাই হাজার হাজার শিক্ষার্থী-মানুষ-পুলিশ হত্যা করেছে….
আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর যে ক’টি বিষয় মানুষকে চমকে দিয়েছিল, তার মধ্যে রয়েছে তরুণদের রক্তপিপাসা এবং বিভিন্ন চিপাচাপা থেকে শিবিরের আত্মপ্রকাশ। শিক্ষাঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে ছদ্মবেশে তাদের কর্মকান্ড পরিচালনার স্বীকারোক্তি অনেককে হতভম্ব করে দিয়েছিল। শিক্ষার্থীরা শিবিরের নেতৃত্বে সরকার পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে, এটা অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। আওয়ামীপন্থীরা অবশ্য শুরু থেকেই আন্দোলনের উদ্দেশ্য এবং এর নেপথ্যে শিবিরের অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে। কিন্তু সুশীল সমাজ তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। যদিও পরে কেউ কেউ নিজেদের ভুল স্বীকার করেছেন। শিক্ষার্থীদের হিংস্রতার পেছনে শিবিরকে দায়ী করেছেন তাই।
একটু পেছনে ফেরা যাক।
আশির দশকের রাজনীতি সম্পর্কে জানেন যারা, তাদের মনে আছে হিংস্রতা ও নির্মমতার স্বরূপ সম্পর্কে। শিক্ষাঙ্গনে তখন ভয়ানক মারণাস্ত্রের ব্যবহার ছিল। হাত-পায়ের রগ কেটে, কুপিয়ে, ধড়-মাথা বিচ্ছিন্ন করে, শরীর খণ্ড-বিখণ্ড করে লাশ ম্যানহোলে ঢুকিয়ে রাখা, কানে রিকশার চাকার স্পোক ঢুকিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মগজ বের করে আনা, হাত-পা, মাথায় ড্রিল করে, মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে খুলি চূর্ণকরা- এমন হত্যাকাণ্ড ঘটাতো শিবির। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রদলসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের কর্মী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে শিবির জিয়া এবং এরশাদ আমলে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ইসলামী ছাত্রসংঘ নামে এভাবেই মানুষ হত্যা করত তারা। তাদের রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ সশস্ত্র প্রশিক্ষণ, যা সবসময় চলমান। সাংগঠনিকভাবে শেখানো হয় কৌশল। শিবিরের বাছাইকৃত কর্মীরা এই প্রশিক্ষণের সুযোগ পায়।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে ক্যাম্পাসে সুযোগ না থাকলেও জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি বন্ধ হয়ে যায়নি। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী সংগঠন, এনজিও, ভিন্ন রাজনৈতিক দল, ফোরাম থেকে শুরু করে মহল্লার দোকান মালিক সমিতি পর্যন্ত সর্বত্র তারা নিজেদের লোকদের ঢুকিয়েছে। একই মানসিকতার লোকদের বেছে তাদের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। অর্থব্যয়ে, ব্রেনওয়াশ করে, চাপ দিয়ে প্রভাব বিস্তার করেছে। কখনো আওয়ামীপন্থী সেজে, কখনো ধর্মের নামে, কারো বিপদে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করে দীর্ঘদিনের চেষ্টায় দেশের প্রতিটি জায়গায়, অলিতে-গলিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।
জামায়াতের নারী সংগঠন ছাত্রী সংস্থার মেয়েরাও অভিন্ন লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে ঢুকে গেছে প্রতিটি বাড়ির অন্দরমহলে। নারীদের পর্দা করা, বাইরে ঘুরে বেড়ানোর চেয়ে এলাকার মহিলারা মিলে ঘরে বসে (তালিম) করছে, এমন দৃশ্য পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নব্বই’র দশকের মত এ কালেও কদর পেয়েছে। বিনা বাধায় ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে নিয়েছে জামায়াত, নারীদের মাধ্যমে। এর বাইরে তারা আরো একটা কমিউনিটিতে ঢুকেছে, বেড়ে উঠতে সহযোগিতা করেছে, প্রতিপালন করেছে, তারপর ব্যবহার করেছে সময়মত। আর সেটা হলো কিশোর গ্যাং। অবাক হলেন? অবাক হওয়ার কিছু নাই। কিশোরদের গ্যাং হয়ে ওঠার পেছনে জামায়াত-শিবিরের দীর্ঘদিনের ইন্ধন রয়েছে। অনেকটা কাকের বাসায় কোকিলের ডিমের ছানা ফোটানোর মত ব্যাপার।
স্থানীয় রাজনীতির সাথে যাদের পরিচয় আছে, তারা জানেন কিশোর গ্যাং পাতি নেতাদের জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ। পাড়া, মহল্লায় রেডিমেড কিছু গ্রুপ যদি থাকে, যাদের কিছু খরচাপাতি দিলেই তারা আপনার পেছনে স্লোগান দিবে, আপনাদের চারপাশে বাকবাকুম করে ঘুরবে, গলা ফুলিয়ে ভাই ডেকে বেড়াবে, আপনার ডাকে প্রতিপক্ষের মাথা ফাটিয়ে দিয়ে আসবে, বিনিময়ে তারা আপনার সাথে সেলফি তুলবে, আপনাকে নিয়ে টিকটক করবে, দিন-রাত যখন তাদের ডাক দিবেন, দুই মিনিটে হাজির হয়ে যাবে। আপনার নেতা হয়ে ওঠার জন্য তারা অপরিহার্য। শুধু মাঝে মাঝে তাদের কিছু খরচ দিলেই হবে। আপনি তর তর করে এগিয়ে যেতে পারবেন তাদের ব্যবহার করে। মোটামুটি এক দশকে এই গ্যাং কালচার ভাইরাসে পরিণত হয।
এলাকায় যদি কয়েকটি গ্রুপ থাকে এবং এক গ্রুপ কোনো নেতার আস্থাভাজন হলে অপর গ্রুপগুলো আলাদা নেতা বেছে নেয় কিংবা তাদের কেন্দ্র করে নতুন নেতা তৈরি হয়। এভাবে নেতাও যেমন তৈরি হয়েছে, তৈরি হয়েছে গ্যাংও। যত নেতা, তত গ্যাং, তত গ্যাঞ্জাম, তত হানাহানি, তত ধান্দা। প্রতিটি ওয়ার্ডে, ইউনিয়নে একই রাজনৈতিক দলের একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী নেতা, বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতারা আছে। নেতাদের অনুসারী হিসেবে প্রতিনিয়ত এলাকায় আধিপত্য ধরে রাখতে গিয়ে সংঘাতে লিপ্ত হতে হতে একসময় সংঘাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এই প্রজন্ম। এক দলের দুই নেতার অনুসারীদের অনৈক্যকে কেন্দ্র করে, অন্য নেতার এলাকায় নিজ নেতার নামে স্লোগান দেওয়া নিয়ে মারামারি করা, আবার দুই দলের সংঘাত নিয়ে খুনাখুনি তো আছেই।

গ্রুপিংয়ের কারণে কোণঠাসা হয়ে পড়া কোনো গ্যাং এলাকায় আধিপত্য হারায়। তখন দেখা যায় লেটেস্ট মডেলের বাইক, ফোনসহ হাতখরচ দিয়ে তেমন একটি গ্যাংয়ের দখল নেয় অন্য নেতা। তারপর এলাকায় শো-ডাউন দিতে গিয়ে ঝরে কিছু প্রাণ। এভাবে গ্যাংগুলো এলাকাভিত্তিক অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত থাকে সারাবছরই, হাত পাকে তাদের। আবার ভাসমান কিছু গ্যাং আছে, যারা যেদিকে টাকা, সেদিকে কাজ করে। এদের মধ্যে উৎখাত হওয়া হকার, মাদকসেবী, অন্য জেলা থেকে অপরাধ করে আত্মগোপনে থাকা দাগি আসামি, বিভিন্ন বয়সী লোকজনও রয়েছে। এরা রাজনৈতিক জনসভায় ভাড়া খাটে। এদের দিয়ে যা ভাঙচুর, আগুন দেওয়ানোর মত ঘটনা ঘটানো হয়। মোটামুটি এটাই গ্যাংগুলোর কাজ।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এখানে জামায়াত-শিবিরের অবস্থান কোথায়?
কিশোর গ্যাংয়ের কারণে আওয়ামী লীগের অনেক স্থানীয় নেতা বিতর্কিত হয়েছেন বিগত বছরগুলোতে। গ্যাং ভিত্তিক মারামারি-কাটাকাটির জন্য নেতাদের নামও চলে আসে। ফলে আওয়ামী লীগের অনেক নেতার নাম হাইকমান্ডের ব্ল্যাকলিস্টে উঠে যায়। বিএনপি গ্যাং ব্যবহার করেছে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে। গত কয়েক বছর বিএনপি তাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে। এদের দিয়ে সফলভাবে নাশকতা চালানো গেছে দেখে মেটিক্যুলাসলি ডিজাইনড প্ল্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এদের রাখা হয়েছে অনেক ভেবেচিন্তেই। এটা কিন্তু হাইপোথিসিস নয়। তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুসের বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মোল্লা ফারুক ও ডাকসু নেতা আখতার রাজধানীর বেশিরভাগ কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করে বলে তথ্য-প্রমাণ মিলেছে। মোল্লা ফারুক তার এক স্ট্যাটাসে বাহাদুরি দেখাতে গিয়ে ফাঁস করেছেন কথাগুলো। তিনি বলেছেন-
“গত ছয় মাসে ঢাকার কিশোর গ্যাংগুলোর কোন মারামারির খবর পেয়েছেন? পাবেন না, কারণটা হচ্ছে ১৩৮। ঢাকার ওয়ার্ড সংখ্যা হলো ১২৯ আর বাকি ৯টা হলো পার্শ্ববর্তী এলাকা। সব মিলিয়ে ১৩৮। আমরা একটা প্ল্যান করেছিলাম যে, এই ওয়ার্ডগুলো থেকে একটা করে কিশোর গ্যাংকে আমরা টার্গেট করব। সব মিলিয়ে ১৩৮। যদিও পরবর্তীতে সংখ্যাটা বেড়েছে। এরপর আমরা কিশোর গ্যাং ফেডারেশন টাইপের বানাবো। এই আইডিয়ার মাস্টারমাইন্ড হলো আরাফাত রহমান শৈশব। এরপর ঢাকা নিয়ন্ত্রণ করব আমরা। আপনারা এই কিশোর গ্যাংগুলোর শক্তি জুলাই বিপ্লবের সময় দেখেছেন। এখনো আমাদের প্রধান শক্তি হলো ১৩৮। ঢাকার অসংখ্য কিশোর গ্যাংস্টার, যারা ব্রাদারহুডের জন্য যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত সবসময়।”
এই মোল্লা ফারুক অন্তত ৮-১০টি পোস্ট দিয়েছিলেন ১০ই নভেম্বর নূর হোসেন দিবস উপলক্ষ্যে জড়ো হওয়া আওয়ামী লীগ কর্মীদের কোপানোর ডাক দিয়ে। তিনি তার অনুগত গ্যাং সদস্যদের রামদা ও অস্ত্রে শান দিতে বলেছিলেন যেন আওয়ামী লীগ কর্মীদের দেখলেই কুপিয়ে মেরে ফেলা হয়। যার ফলশ্রুতিতে অনেক নেতাকর্মী সেদিন আহত হয়েছিলেন।
এ থেকে একটা পরিস্কার ধারণা পাওয়া যায়, আমাদের অগোচরেই সমাজে একটা পরিবর্তন ঘটে গেছে। আমরা যারা সভ্য মানুষ, উঁচু সমাজের অংশ, রাস্তায় চলাফেরার সময় চোখ থাকে উপর দিকে। রাস্তার আশপাশে, শপিং মলের সামনে, অলি-গলিতে অদ্ভূত কাটিংয়ের চুল ও পোশাক পরিচ্ছদে দলবেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা, তুচ্ছ ব্যাপারে মারামারি, হানাহানি করা ছেলেদের দিকে বলতে গেলে তাকাই না, পাশ কাটিয়ে যাই উটকো ঝামেলা ভেবে। এদের থেকে দূরে থাকাই স্বাস্থ্যকর ভেবে আমরা এড়িয়ে যাই। এরা আমাদের ভাবনার বাইরে থেকে গেছে। সুযোগসন্ধানীরা এদের ব্যবহার করেছে দারুণভাবে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন, কোটাবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন সময় এদের ট্রায়াল দেওয়া হয়েছে, তারা পরীক্ষায় উতরে গেছে ভালোভাবে। সেসময়কার অনেক ভিডিও বা ছবিতে দেখা যায় ধারালো অস্ত্রসহ নিয়ে, স্কুল-কলেজের ভুয়া আইডি কার্ডসহ ধরা পড়েছিল যারা, এরাই সেই গ্যাং সদস্য, যাদের অনেকেই ‘ছাপড়ি’ বলে ডাকে। এরাই ছিল জুলাই আন্দোলনের মূল স্ট্রাইকিং ফোর্স।
