নিজস্ব প্রতিবেদক
ময়মনসিংহ শহরের ঐতিহাসিক হরিকিশোর রায়ের প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো বাড়িটি ভেঙে ফেলছে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি। ভবনটি ভেঙে সেখানে নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সংস্থাটি।
এই ঘটনায় প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ইতিহাস সচেতন মহলে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
অনেকে অভিযোগ করছেন, ময়মনসিংহে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসন— বিশেষ করে জেলা শিশু কর্মকর্তা মো. মেহেদী জামান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুমোদনেই এই ভাঙচুর চলছে।
এই বাড়িটি উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায় এবং সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষ হরিকিশোর রায়ের স্মৃতিবিজড়িত।
হরিকিশোর রায় ছিলেন কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া জমিদারবাড়ির জমিদার। তিনি বাংলা শিশুসাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায় ও সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষ। এ সড়কে প্রাচীন একতলা ভবনটি ১৯৮৯ সাল থেকে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ব্যবহার করা শুরু করে। বাড়ির সামনে ছোট মাঠ আছে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত বাড়িটি আগাছায় ছেয়ে যায়। কয়েক দিন ধরে বাড়িটি ভাঙতে শুরু করেছে শিশু একাডেমি।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভবনটি এখনও তালিকাভুক্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন না হলেও চলতি বছরের জরিপে তালিকাভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সংরক্ষণের পক্ষে থাকলেও জেলা প্রশাসনের তেমন উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
শিশু একাডেমির জেলা কর্মকর্তা দাবি করছেন, দীর্ঘদিন ধরে ভবনটি পরিত্যক্ত ছিল এবং সেখানে মাদকসেবীদের আস্তানা গড়ে উঠেছিল।
তিনি জানান, সরকারি অনুমতি নিয়েই ভবনটি ভাঙা হচ্ছে। ভাঙার কাজটি করছে মেসার্স ময়ূর বিল্ডার্স।
অন্যদিকে লেখক ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘এই ঐতিহাসিক স্থাপনার ভাঙন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দুঃখজনক বার্তা বহন করবে। রাজকীয় শহর হিসেবে পরিচিত ময়মনসিংহ তার পরিচয় হারাতে বসেছে।’
সরেজমিনে দেখা যায়, কাঁটাতারে চারপাশ ঘেরা বাড়িটির। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ শিশু একাডেমি লেখা একটি সাইনবোর্ড লতাগুল্মে ঢেকে আছে। ভেতরে গিয়ে দেখা গেল, ভবনটির সামনের অংশসহ বেশ কিছু অংশ ও ছাদ ভেঙে ফেলা হয়েছে।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক ও লেখক স্বপন ধর বলেন, মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী তার সমমনা হিতাকাঙ্ক্ষীদের নিজের কাছাকাছি নিয়ে আসেন। তাদের মধ্যে ছিল হরিকিশোরদের পরিবার। ভবনটির পাশেই হরিকিশোরের ভবন। বাড়িটি সর্বশেষ প্রখ্যাত সমাজসেবক রণদা প্রসাদ সাহা কিনে নিয়েছিলেন। স্থাপত্যশৈলী দেখে বোঝা যায়, ভবনটি ১৭৮৭ সালের পর গড়ে ওঠে।
বাড়িটি ভাঙার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, বাড়িটির জরাজীর্ণ অবস্থা, তবুও দাবি জানাই, বাড়িটি যে আদলে ছিল ঐতিহ্য রক্ষা করে সেই আদলেই সংরক্ষণ করা হয়।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রেজা মো. গোলাম মাসুম প্রধান জানান, বিষয়টি জানতে শিশু একাডেমিকে ডাকা হয়েছে এবং কাগজপত্র পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
