নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন্স নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে চরম ক্ষোভ আর হতাশা বিরাজ করছে স্থানীয়দের মধ্যে। তারা অভিযোগ করছেন, ‘প্রকৃতি রক্ষার’ নামে বাস্তবে দ্বীপবাসীকে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করা হচ্ছে।
স্থানীয় এক ভুক্তভোগী এ প্রতিবেদককে বলেন, “বিদেশিদের কাছে দ্বীপ বিক্রি হয়নি ঠিকই, কিন্তু আমাদের জিম্মি করে রাখা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আপনারা আমাদের ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ করে দিয়েছেন, মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত করে দিয়েছেন, হাসপাতাল চালু নেই, স্কুলে শিক্ষক নেই, বিদ্যুৎ নেই — এসব করে কি প্রকৃতি রক্ষা হচ্ছে, নাকি মানুষ ধ্বংস হচ্ছে?”
সরকারের নির্দেশে সেন্ট মার্টিন্স-টেকনাফ রুটে চলাচলকারী সি-ট্রাক ‘এসটি খিজির’ ও ‘ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বার’ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গত ২০ বছর ধরে এই রুটে চলা বাহন হঠাৎ করে কক্সবাজার-মহেশখালী রুটে দিয়ে দেওয়া হলো কেন? আমরা তাহলে কীভাবে চলাচল করব?”
দ্বীপের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট, হাইস্কুলে আবাসন সংকট, হাসপাতালেও নেই কোনো সরকারি চিকিৎসক। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা পিডিবির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দ্বীপের বাসিন্দাদের প্রশ্ন, “সরকার যদি সত্যিই পরিবেশ ও জনগণের কথা ভাবত, তবে কেন এই ন্যূনতম নাগরিক সেবা থেকেও বঞ্চিত করা হলো?”
দ্বীপে বেসরকারি হোটেল বা ঘরবাড়ি সংস্কারে বিধিনিষেধ থাকলেও সরকারি সংস্থাগুলোর রিসোর্ট ও ভারী স্থাপনা রয়েছে নির্বিঘ্নে। এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকারি স্থাপনার জন্য কি এই দ্বীপের মাটি শক্ত, আর আমাদের জন্যই নরম?”
ক্ষমতায় আরোহনের পর থেকে ইউনূস সরকারের নির্দেশে পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকার অজুহাতে পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে দ্বীপবাসীর প্রধান জীবিকা পর্যটন ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিকল্প কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেয়নি সরকার।
“এই ছয় মাসে আপনারা কর্মসংস্থান বন্ধ করলেন, কিন্তু একটা বিকল্পও দিলেন না। সরকার বলেছিল কাজ চলছে, আমরা জিজ্ঞেস করি — কে করছে, কোথায় করছে, আমরা কবে দেখব?” — এমনই ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয়রা।
সরকারপন্থী গণমাধ্যমগুলোতে পরিবেশের উন্নতি হয়েছে বলে নানা প্রতিবেদন প্রকাশ পেলেও স্থানীয়দের বক্তব্য সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা বলেন, “এই ছয় মাসে প্রকৃতির কোনো উন্নতি হয়নি বরং দ্বীপের অর্থনীতি ও মানবিক অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়েছে। এগুলো না বলে কেন ‘প্রকৃতি ফিরেছে’— এমন আজগুবি প্রচার চালানো হচ্ছে?”
অন্তর্বর্তী সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্ত কতটা সাংবিধানিক—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তারা বলেন, “জোর করে আইন বানিয়ে আমাদের ওপর চাপিয়ে দিলে আমরা কার কাছে বিচার চাইব? এটা কি কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সম্ভব?”
সেন্ট মার্টিন্সের বাসিন্দারা এখন বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নেমেছেন। সীমিত খাদ্য, নেই বিদ্যুৎ, নেই চিকিৎসা, বন্ধ ব্যবসা—সবমিলিয়ে তারা আজ নিঃস্ব। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে পরিবেশ ও নিরাপত্তার কথা বলে নেওয়া হয়েছে একের পর এক দমনমূলক পদক্ষেপ।
দ্বীপবাসীর প্রশ্ন— “এই ভূমি কি শুধু আমাদের জন্যই নিষিদ্ধ? সরকার ও সামরিক বাহিনীর জন্যই কি সব সুযোগ?” এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে সেই সরকারকেই, যারা পরিবেশের অজুহাতে এক সমৃদ্ধ জনপদকে অস্তিত্ব সংকটে ঠেলে দিয়েছে।
এ প্রতিবেদন স্থানীয়দের বক্তব্য ও মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তৈরি। স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বশীল কেউ এ প্রসঙ্গে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
