অজয় বাঙালী
গত বছরের ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পরবর্তী সময় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে রেলওয়ের বিভিন্ন দায়িত্বে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র (বৈছা) আন্দোলন থেকে যেসব ছাত্র প্রতিনিধিদের পাঠানো হয়েছিল, সেই তাদের বিরুদ্ধেই উঠছে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ। টিকিট কালোবাজারি, বদলিতে ঘুষ লেনদেন ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠার পর ইতোমধ্যে এই ছাত্র প্রতিনিধিদের ‘ফ্রি পাস’ বাতিল করেছে রেল কর্তৃপক্ষ।
এক ছাত্র প্রতিনিধি বিডি ডাইজেস্ট-এর কাছে দাবি করেন, তারা অনিয়মের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন বলেই একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী এখন তাদের বদনাম করতে চাইছে।
যদিও রেলওয়ের মহাপরিচালক অনিয়মের অভিযোগে ফ্রি পাস বাতিলের বিষয়টি বিডি ডাইজেস্টকে নিশ্চিত করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এখনও চার ছাত্র প্রতিনিধি রেলের বিভিন্ন কাজে সম্পৃক্ত। অতীত অভিজ্ঞতা না থাকলেও এমন সব কারিগরি দায়িত্বে তাদের রাখা হয়েছে, যেগুলোর জন্য প্রযুক্তিগত জ্ঞান জরুরি।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বে পেয়েই গত বছর ফাওজুল কবির খানের সুপারিশে চার বৈছা কর্মীকে রেলের সংবেদনশীল দায়িত্বে যুক্ত করা হয়। তারা হলেন: রেজাউল ইসলাম (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাস্টার্স), আশিকুর রহমান (বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি), মেহেদী হাসান বাপ্পী (ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ) এবং নাজিব আহমেদ (রাজউক কলেজ)।
তাদের হাতে দেওয়া হয় অবকাঠামো উন্নয়ন, কালোবাজারি প্রতিরোধ, জমি উদ্ধার, এমনকি ইঞ্জিন ডিজাইন ও ত্রুটি বিশ্লেষণ–এর কাজ।
‘তারা ছাত্র, এমনকি যন্ত্র প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনাও করেননি, কোন যোগ্যতায় এই দায়িত্বে?’—এমন প্রশ্নের জবাবে রেজাউল ইসলাম বিডি ডাইজেস্টকে বলেন, “আমাদের বিষয়ে তদন্ত চলছে, সেটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত মন্তব্য করব না।”
আবার জমি উদ্ধারে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমরা জমি বেদখলের রিপোর্ট করেছি, কিন্তু কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেয়নি—এটা উপদেষ্টাকে জানালে তিনিই হস্তক্ষেপ করেন।’
ফ্রি পাসে অপব্যবহার: একদিনে একাধিক যাত্রার প্রমাণ!
বিনামূল্যে এসি ও স্নিগ্ধা কোচে যাতায়াতের সুবিধা ছিল এই ছাত্র প্রতিনিধিদের। কিন্তু দেখা গেছে, কেউ একই দিনে ঢাকা-কক্সবাজার ও রাজশাহী-ঢাকা রুটে ভ্রমণের টিকিট সংগ্রহ করেছেন এবং তা ব্যবহারও হয়েছে।
সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবির মিলন জানান, নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দুই লাখ টাকারও বেশি টিকিট অপব্যবহার হয়েছে। তার মতে, তুলনামূলকভাবে নাজিব আহমেদের সম্পৃক্ততা কম, কিন্তু তিনিও একেবারে মুক্ত নন।
এই অভিযোগ প্রসঙ্গে রেলের বাণিজ্যিক পরিচালক মিজানুর রহমান বিডি ডাইজেস্টকে বলেন, “ছাত্র প্রতিনিধিদের বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না।”
তবে বাণিজ্যিক শাখার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তাদের ব্যাপারে কেউ মুখ খুলতে চান না। তবে তাদের টিকিট পাস বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।”
জুলাই ফাউন্ডেশনের নামে ট্রেন চালাতে চায় ছাত্ররা
এই চার ছাত্র প্রতিনিধি এবার জুলাই ফাউন্ডেশন–এর নামে বেসরকারি ট্রেন চালানো এবং বড় বড় স্টেশনে দোকান বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেছে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহে বিডি ডাইজেস্ট অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে।
অডিও ফাঁস: কমান্ড্যান্টের সঙ্গে ঘুষের আলোচনা
সম্প্রতি একটি অডিও ক্লিপে রেল নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) ঢাকা অঞ্চলের কমান্ড্যান্ট শফিকুল ইসলাম এবং দুই ছাত্র প্রতিনিধি মেহেদী হাসান বাপ্পী ও রেজাউল ইসলাম–এর মধ্যে ঘুষ লেনদেন নিয়ে আলোচনা ধরা পড়ে।
মেহেদী বলেন, “ওটার কী অবস্থা?”—উত্তরে কমান্ড্যান্ট বলেন, “আমি কল বাজিয়ে শোনালাম। কোর্টের টাকা না পেলে আপনাকে দুই লাখ টাকাও দিতে পারব না।”
পরে রেজাউলকেও ফোনে যুক্ত করা হয়। রেজাউল বলেন, “আপনি যা বলছেন, সেটা করলেই তো হচ্ছে, আমাদের কিছু বলার নাই।”
এই বিষয়ে জানতে চাইলে রেজাউল ইসলাম বিডি ডাইজেস্টকে বলেন, “আমাদের পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে।”
অন্যদিকে কমান্ড্যান্ট শফিকুল ইসলাম বিডি ডাইজেস্টকে বলেন, “আমাকে ঘুষ দিতে চাপ দেওয়ার কারণেই ফোন রেকর্ড করেছি।”
রেলের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন বিডি ডাইজেস্টকে বলেন, “চার ছাত্র প্রতিনিধির ফ্রি পাস বাতিল করেছি। অভিযোগগুলো সম্পর্কে অবগত আছি, তবে তদন্তের দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের।”
