❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
চলন্ত ট্রেনে যাত্রীদের নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধা দিতে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা উচ্চগতির স্যাটেলাইটভিত্তিক স্টারলিংক ওয়াই-ফাই সেবা বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে। সেবা চালুর মাত্র ছয় মাসের মধ্যে চারটি আন্তঃনগর ট্রেনে একাধিকবার চুরি হয়েছে মূল্যবান স্টারলিংক ডিভাইস ও সংযোগ সরঞ্জাম।
সর্বশেষ ঢাকা-সিলেট রুটের উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদ থেকে স্টারলিংকের ফ্ল্যাট অ্যান্টেনা বা স্যাটেলাইট টার্মিনাল খুলে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। ঘটনাস্থলে গিয়ে ট্রেনের ছাদে অ্যান্টেনা স্থাপনের খালি হোল্ডার পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
শুধু উপবন এক্সপ্রেস নয়, পরীক্ষামূলকভাবে স্টারলিংক সেবা চালু করা পারাবত, পর্যটক ও বনলতা এক্সপ্রেসেও একই ধরনের চুরির ঘটনা ঘটেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চুরি যাওয়া যন্ত্র নতুন করে স্থাপন করার পরও তা আবার চুরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম স্টারলিংকের যন্ত্রপাতি চুরির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, চারটি ট্রেনেই পরীক্ষামূলকভাবে স্টারলিংক ইন্টারনেট চালু করা হয়েছিল। এর মধ্যে উপবন এক্সপ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু যন্ত্রপাতি চুরি হয়েছে এবং অন্য ট্রেনগুলোতেও একই ধরনের ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।
সচিব বলেন, বিষয়টি কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায়, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে দ্রুত সমন্বিত বৈঠক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে তিনি জানান, প্রতিটি ট্রেনে স্টারলিংক সেবা স্থাপনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং মূল্যবান এসব যন্ত্রপাতি রক্ষায় সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে।
ছাদ থেকে অ্যান্টেনা চুরি, অচল ইন্টারনেট
গত ১৩ই মার্চ দেশে প্রথমবারের মতো চলন্ত ট্রেনে কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক উচ্চগতির স্টারলিংক ইন্টারনেটের পরীক্ষামূলক সংযোগ চালু হয়। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের যৌথ নির্দেশনায় এতে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল)।
প্রাথমিক পর্যায়ে পর্যটক এক্সপ্রেস, পারাবত এক্সপ্রেস, উপবন এক্সপ্রেস ও বনলতা এক্সপ্রেসে যাত্রীদের জন্য বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই সেবা চালু করা হয়।
চলন্ত ট্রেনে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট কতটা কার্যকর এবং দীর্ঘপথের যাত্রীরা এ সেবা কীভাবে গ্রহণ করছেন, তা যাচাই করাই ছিল পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি সেবা পরিচালনার কারিগরি ও ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল।
যাত্রীরা প্রতিটি বগিতে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিনামূল্যে ইন্টারনেটে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চারটি ট্রেনে পরীক্ষামূলক সময়ে যাত্রীরা সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৮ টেরাবাইট ডেটা ব্যবহার করেছেন।
বিশেষ করে যেসব দূরপাল্লার রুটে মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল বা অনুপস্থিত, সেখানে স্যাটেলাইটনির্ভর এই ইন্টারনেট কার্যকর বিকল্প হিসেবে সাড়া ফেলেছে। তবে যাত্রীদের ইতিবাচক সাড়ার মধ্যেই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দামি প্রযুক্তি সরঞ্জামের নিরাপত্তা।
বারবার প্রতিস্থাপন, ফের চুরি
উপবন এক্সপ্রেসের ছাদে স্থাপিত স্টারলিংকের ফ্ল্যাট অ্যান্টেনা বা স্যাটেলাইট টার্মিনালটি স্যাটেলাইট থেকে সংকেত গ্রহণের প্রধান মাধ্যম। এটি চুরি হয়ে যাওয়ায় ট্রেনটির ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে।
প্রযুক্তিবিদদের মতে, ছাদের অ্যান্টেনার মাধ্যমে মহাকাশে থাকা স্টারলিংক স্যাটেলাইট থেকে ইন্টারনেট সংকেত গ্রহণ করা হয়। পরে ট্রেনের ভেতরের নেটওয়ার্ক সরঞ্জামের মাধ্যমে সেই সংযোগ ওয়াই-ফাই হিসেবে যাত্রীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
ফলে অ্যান্টেনা কিংবা অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক সরঞ্জামের যেকোনো একটি অংশ চুরি বা নষ্ট হলে পুরো সেবা ব্যাহত হতে পারে।
বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. ইমাদুর রহমান বলেন, মাঝে মাঝে কিছু যন্ত্রপাতি চুরি হলেও সেবা সচল রাখতে সেগুলো দ্রুত প্রতিস্থাপনের কাজ চলছে। সরকারের ‘সবার জন্য ইন্টারনেট’ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্য মেলেনি
চুরি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রেলওয়ের মহাপরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে এডিজি (অপারেশন)-এর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরে এডিজির সঙ্গে একাধিকবার ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
একই বিষয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
