সংবাদ প্রতিবেদন
সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে জমা টাকার পরিমাণ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ৩৩ গুণ বেড়ে গেছে। ২০২৪ সালে এই পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৮ কোটি ৯৫ লাখ সুইস ফ্রাঙ্ক, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা (ফ্রাঙ্কপ্রতি ১৫০ টাকা ধরে)।
এর আগের বছর, ২০২৩ সালে, জমা ছিল মাত্র ১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্রাঙ্ক বা ২৬৫ কোটি টাকা।
এই তথ্য উঠে এসেছে সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) বৃহস্পতিবার প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের এমন উচ্চমাত্রার জমা ২০১৫ সালের পর এবারই পঞ্চম সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২১ সালে সর্বোচ্চ ৮৭ কোটি ফ্রাঙ্কের বেশি জমা ছিল বাংলাদেশিদের নামে।
বিশ্বজুড়ে ধনীদের কাছে সুইস ব্যাংকের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো গোপনীয়তা। সুইজারল্যান্ডের আইন অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকের পরিচয় বা টাকার উৎস প্রকাশ করতে বাধ্য নয়। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছুটা ছাড় দিয়েছে তারা। প্রতিবছর বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের টাকার হিসাব দেয়ার পেছনে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী চুক্তির বাধ্যবাধকতা রয়েছে এসএনবির।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই টাকার সবটাই যে অর্থপাচার, তা বলা যায় না। কেউ কেউ মনে করেন—এটি ব্যবসা বা প্রবাসীদের বৈধ লেনদেনও হতে পারে। তবে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, এই অস্বাভাবিক পরিমাণে টাকা হঠাৎ করে জমা হওয়া মোটেই স্বাভাবিক নয়।
তার মতে, সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য নেই। তাই বাণিজ্যিক লেনদেনের যুক্তিও এখানে দুর্বল। বরং তিনি মনে করেন, এটি মূলত ‘ক্যাপিটাল ফ্লাইট’, অর্থাৎ অর্থপাচার।
তিনি প্রশ্ন তোলেন—বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া যদি এই টাকা বিদেশে গেছে, তাহলে সেটা কীভাবে সম্ভব হলো?
তিনি বলেন, “৮ হাজার কোটি টাকা ধাপে ধাপে পাঠিয়ে দিলে সেটা ধরা কঠিন না, যদি উপরমহলের সহায়তা থাকে।”
জাহিদ হোসেন আরও বলেন, “এই টাকা হয়তো টিউশন ফি, হাউজ রেন্ট, বা ব্যবসার নামে পাঠানো হয়েছে। নিয়মের ভেতরে থেকেও অনিয়ম করা গেলে, তখন মূল সমস্যা থাকে রেগুলেটরদের মধ্যে।”
প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশিদের জমা টাকার পরিমাণ কমে ২৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে গিয়েছিল, মাত্র ১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্রাঙ্কে। তার আগের বছর, ২০২২ সালে, জমা ছিল ৫ কোটি ৫২ লাখ ফ্রাঙ্ক।
এসএনবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর সুইস ব্যাংকের কাছে পাওনা ৫৮ কোটি ৯৫ লাখ ফ্রাঙ্ক ছাড়াও আমানতকারীদের নামে আলাদা করে জমা রয়েছে ১ কোটি ২৬ লাখ ফ্রাঙ্ক। এর বাইরে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের নামে রাখা রয়েছে আরও ৮৬ লাখ ফ্রাঙ্ক।
এ পর্যন্ত সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি টাকা জমা হয়েছিল ২০২১ সালে। তার পরেও এই বছর যেভাবে অর্থের প্রবাহ হয়েছে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও দুর্নীতিবিরোধী সংগঠনগুলো উদ্বিগ্ন। তাদের ভাষায়, “এগুলোর বড় অংশই অবৈধভাবে অর্জিত এবং পাচার করা টাকা।”
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সুইস ব্যাংকে জমার পরিমাণ বাড়া বা কমার সঙ্গে সরাসরি অর্থপাচার বাড়া বা কমার সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক নেই, তবে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ এক ধরনের ইঙ্গিত বহন করে—যা সুশাসন, নজরদারি এবং রেগুলেটরি ব্যবস্থার প্রশ্ন তোলে।
