নিজস্ব প্রতিবেদক
গত কয়েকমাস ধরেই রাজধানীতে তীব্র গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত ঢাকাবাসীর জীবন। মিরপুর, পল্লবী, মগবাজার, রামপুরা, বনশ্রী এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট দেখা দিলেও, এ নিয়ে সরকারের তরফ থেকে কোনো উদ্যোগই নেওয়া হচ্ছে না। ১৯ জুন (বৃহস্পতিবার) খিলগাঁও-বাসাবো এলাকার বাসাবাড়িতে গ্যাসের কোনো সরবরাহই ছিল না সারাদিন। রাত ১১টায় এই প্রতিবেদন যখন লেখা হচ্ছে, তখনও খিলগাঁও, তিলপাপাড়া, বাসাবো, সবুজবাগ, রাজারবাগ, নন্দীপাড়া, দক্ষিণগাঁও, মেরাদিয়া, মুগদা এলাকায় গ্যাসের সরবরাহ চালু হয়নি।
গ্যাস সরবরাহ না থাকায় তীব্র দুর্ভোগে পড়েছেন এসব এলাকার বাসিন্দারা। নন্দীপাড়ার চাকুরিজীবী নারী ফাতেমা ইয়াসমিন বিডি ডাইজেস্টকে জানান, “সকালে গ্যাস না থাকায় নাশতা বানানোর উপায় ছিল না। অফিস সেরে বাড়ি ফিরেও দেখি গ্যাস নেই। অগত্যা বাইরে থেকে খাবার এনে খেতে হচ্ছে।”
গত কয়েকমাস ধরেই তীব্র গ্যাস সংকটে ভুগছেন রাজধানীবাসী। কিন্তু খিলগাঁও-বাসাবো এলাকাতে আজ সারাদিন গ্যাসের কোনো সরবরাহই ছিল না। খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ার গৃহিনী তাসনিমা খাতুন জানান, “গ্যাস নাই তো ঈদের আগ থেকেই। আগে তো তবুও বিকেলের দিকে গ্যাস আসতো। এখন সারাদিনেও গ্যাস আসে না। আজ তো মনে হচ্ছে লাইনে গ্যাসই নাই।”
হঠাৎ করে গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়াতে বিপাকে পড়েছেন এলাকাবাসী। কোনো নোটিশ ছাড়াই এমনভাবে গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাকে নজিরবিহীন বলছেন তারা। বাসাবো পাটোয়ারি লেনের বাসিন্দা মোখলেসুর রহমান জানান, “কোনো কারণে লাইনের কাজ থাকলে সেটা তো আগে মাইকিং করা হতো। এবার কিছুই জানানো হয় নাই। সারাদিন বাড়িতে চুলা জ্বলে নাই। খাওয়াদাওয়া বন্ধ। এমন ঘটনা আগে ঘটে নাই।”
এলাকাবাসীর অনেকেই সন্দেহ করছেন, সরকার কি ইচ্ছে করেই আবাসিকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে? এর কারণ হিসেবে তারা কিছুদিন আগে গণমাধ্যমে প্রচারিত জ্বালানি উপদেষ্টার এক বক্তব্যের সূত্র তুলে ধরছেন। গত ১৩ জুন (শুক্রবার) সিলেটের গোলাপগঞ্জে কৈলাসটিলা এমএসটিই প্ল্যান্ট পরিদর্শনের সময় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছিলেন, “সুযোগ থাকলে ঢাকার সব বাসার গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দিতাম।” সরজমিনে প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহের সময় খিলগাঁও তালতলা এলাকার বাসিন্দা স্কুল শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম মোবাইলে সংবাদটি দেখিয়ে প্রতিবেদককে জানান, “জ্বালানি উপদেষ্টা কি তবে খিলগাঁও-বাসাবো এলাকা দিয়েই কাজটি শুরু করলেন? সারাদিন গ্যাস নেই, কিন্তু গ্যাসের বিল তো দিতে হচ্ছে। ডাবল বার্নারে আমরা মাসে ১০৮০ টাকা করে বিল দিচ্ছি। কিন্তু গ্যাস তো পাচ্ছি না।”
বাড়িতে গ্যাস সংকটের কারণে জনজীবন আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে এলাকাবাসী জানান, একদিকে গ্যাসের বিল গুণতে হচ্ছে, অন্যদিকে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় বাইরে থেকে খাবার এনে খেতে হচ্ছে। এতে জীবন নির্বাহের ব্যয় বাড়ছে। বৌদ্ধমন্দির এলাকার বাসিন্দা নূরজাহান বেগম জানান, “ গ্যাস সরবরাহ না থাকায় আমি ইনডাকশন চুলা কিনতে বাধ্য হয়েছি। এদিকে গ্যাসের বিলও দিচ্ছি, আবার বিদ্যুতের খরচও বাড়ছে। এমন বেকায়দায় তো আগে কখনও পড়িনি।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন এলাকাবাসী প্রতিবেদককে জানান, আগে এসব সমস্যা নিয়ে কাউন্সিলর বা কমিশনারের সাথে কথা বলা যেত। এখন কারও কোনো দায়িত্ব নেই। তিতাসের বৈধ সংযোগ থাকার পরও অনেকে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। এজন্য খরচও বাড়ছে। এসব দেখার কেউ নেই।
তিতাসের হেল্পলাইনে (১৬৪৯৬) এ বিষয়ে একাধিকবার ফোন করা হলেও কেউ ফোন ধরেননি। খিলগাঁও-বাসাবো এলাকার জন্য তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির ওয়েবসাইটে থাকা মতিঝিল টিমের মোবাইল নম্বরে (০১৯৫৫৫০০১৮৮-৮৯) বহুবার কল করা হলেও, কেউই ফোন ধরেনি। অবশেষে সশরীরে এই প্রতিবেদক তিতাসের অফিসে যোগাযোগ করলে তাকে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করতে বলা হয়। খিলগাঁও-বাসাবো এলাকার গ্যাস সরবরাহ কি সরকার বন্ধ করে দিয়েছে—এই প্রশ্নের জবাবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিতাসের এক কর্মকর্তা বলেন, “মন্ত্রণালয়ে খবর নেন। উনারা অর্ডার দেন। আমরা কিছু জানি না।”
