বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় প্রমাণে পরীক্ষা দিতে হলো রণাঙ্গনের যোদ্ধা আপেল মাহমুদকে!

বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় প্রমাণে পরীক্ষা দিতে হলো রণাঙ্গনের যোদ্ধা আপেল মাহমুদকে!
শেয়ার করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের প্রেরণাদায়ী যে কয়েকটি গান সাহস ও শক্তি যুগিয়েছিল, তার অন্যতম ছিল “মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি…” এই কালজয়ী গানটির সুরকার ও গায়ক আপেল মাহমুদ, যিনি শুধু সংগীতে অবদান রাখেননি, সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী এবং দেশপ্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত।

তবে সম্প্রতি তার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে (জামুকা) একটি অভিযোগ করেন এক ব্যক্তি। এই অভিযোগের ভিত্তিতে জামুকা থেকে তাকে শুনানির জন্য তলব করা হয়, যেখানে তিনি নিজেকে একজন সম্মুখযোদ্ধা বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণ করেন।

শুনানিটি অনুষ্ঠিত হয় গতকাল কুমিল্লা সার্কিট হাউজে, যেখানে আপেল মাহমুদ উপস্থিত হয়ে নিজের যুদ্ধকালীন অংশগ্রহণের প্রমাণ উপস্থাপন করেন।

জামুকার মহাপরিচালক শাহিনা খাতুন সাংবাদিকদের জানান, “গীতিকার আপেল মাহমুদ নিজেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যথাযথভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।”

তিনি আরও বলেন, “২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর কুমিল্লা জেলা থেকে ৩১ জনের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা না হওয়ার অভিযোগ আসে। এসব অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য দুটি শুনানি কমিটি গঠন করা হয়, যেখানে আপেল মাহমুদ তার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় প্রমাণ করেন।”

জানা গেছে, এই অভিযোগটি করেন স্বাধীন বাংলা বেতার কর্মী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার হোসেন, যিনি আপেল মাহমুদের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়কে চ্যালেঞ্জ করেন।

শুনানির পর সাংবাদিকদের সামনে আপেল মাহমুদ বলেন, “আমি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেটা আমাকে জীবিত থাকতেই প্রমাণ করতে হলো। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছিল তা ভুল প্রমাণিত হওয়ায় জামুকার সদস্যরা দুঃখ প্রকাশ করেছেন।”

তিনি জানান, “আমি ৩ নম্বর সেক্টরে ক্যাপ্টেন মতিউর রহমানের কমান্ডে নরসিংদীতে যুদ্ধ করেছি। পরে আশুগঞ্জে ক্যাপ্টেন নাসিমের নেতৃত্বে ভৈরব-রামনগর ব্রিজে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিই। সেই যুদ্ধে আমার বাঁ চোখের পাশে আঘাতপ্রাপ্ত হই। এরপর আশুগঞ্জ, হবিগঞ্জ, চুনারুঘাট, চানপুর টি স্টেট, তেলিয়াপাড়া টি স্টেটে যুদ্ধ করি। তেলিয়াপাড়া ছিল আমার যুদ্ধের শেষ ফ্রন্ট।”

তিনি আরও জানান, আহত অবস্থায় তাকে আগরতলায় নিয়ে যাওয়া হয়, পরে ২৫শে মে কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পর, তাকে এবং আব্দুল জব্বারকে শরণার্থীদের উদ্দেশ্যে একটি অনুষ্ঠান করতে বলা হয়। সে সময় তিনি অনেক শিল্পীকে উৎসাহ দেন। ১লা জুন থেকে ২০০৬ সালে অবসর নেওয়া পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ বেতারে দায়িত্ব পালন করেন।

আপেল মাহমুদ বলেন, “আমি মনোয়ার হোসেনের কোনো ক্ষতি করিনি, জানি না তিনি কেন এই ভিত্তিহীন অভিযোগ করলেন। তার কারণে আমাকে জীবিত থাকতে এই অপমান সইতে হলো।”

শুনানিতে তার সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী নাসরিন মাহমুদ, একুশে পদকপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা শব্দসৈনিক মনোরঞ্জন ঘোষাল, বাংলাদেশ বেতারের সাবেক পরিচালক আশরাফুল আলম, বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর হায়াত খান, বীর মুক্তিযোদ্ধা সুভাষ সাহা প্রমুখ।

আপেল মাহমুদ কুমিল্লা জেলার মেঘনা উপজেলার বাসিন্দা হওয়ায় তার বিষয়ে কুমিল্লা সার্কিট হাউজে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। জামুকার মহাপরিচালক শাহিনা খাতুনসহ সাত সদস্যের প্রতিনিধি দল শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, আপেল মাহমুদ শুধু “মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি…” গানের জন্যই নয়, বরং “তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবো রে…” সহ অসংখ্য দেশাত্মবোধক গান এবং রবীন্দ্রসংগীত, লালনগীতি, গণসঙ্গীত ও আধুনিক সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে তিনি দেশের সংগীতাঙ্গনে অনন্য অবদান রেখেছেন। ২০০৫ সালে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

Visited 89 times, 1 visit(s) today