নিজস্ব প্রতিবেদক
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ভবনে এখন আর আগের মতো ভিড় নেই। সাক্ষ্যগ্রহণ বা যুক্তিতর্কের জন্য আদালতে হাজির হচ্ছেন না রাষ্ট্র কিংবা আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারব্যবস্থায় যেন নেমে এসেছে দীর্ঘ নিস্তব্ধতা।
এক সময় যে ট্রাইব্যুনাল ছিল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রতীক, এখন সেখানে অগ্রাধিকার পাচ্ছে নতুন সরকারের দৃষ্টিতে ‘গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের’ নতুন কিছু মামলা—যেগুলোর উৎপত্তি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সরকার পতন আন্দোলনের সময়।
এই পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে একাত্তরের অপরাধের বিচার কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ৯ মাসে মুক্তিযুদ্ধকালীন কোনো মামলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
আপিল বিভাগে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামের রায় পুনর্বিবেচনার শুনানি ছাড়া অন্য সব মামলায় কার্যক্রম বন্ধের পথে। এই মামলার রায় ঘোষণা হবে ২৭ মে।
পুরনো মামলার অগ্রগতি নেই, নতুন মামলায় ব্যস্ততা
২০১০ সালে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের ১০৮টি মামলা দায়ের হয়। এর মধ্যে ৫৫টির রায় হয়েছে, বাকি ৫৩টি মামলার ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।
দায়িত্বশীলদের কেউ স্বীকার করছেন—পূর্ববর্তী প্রসিকিউশন দলের কাছ থেকে নথিপত্র বুঝে না পাওয়ায় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী গাজী এম এইচ তামিম বলেন, “আগের প্রসিকিউশনের কাছে থাকা কাগজপত্র আমাদের বুঝিয়ে দিয়ে যায়নি। এ কারণে আমরা আদালত থেকে এখন শুধু সময় নিচ্ছি।”
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে নিয়োজিত প্রসিকিউটরদের অনেকেই ২০২৪ সালের আগস্টে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তদন্ত সংস্থাও পুনর্গঠিত হয়। সেই জায়গা পূরণে নিযুক্ত হয়েছেন নতুন ব্যক্তিরা। তবে ট্রাইব্যুনালে চলমান মামলার অগ্রগতি নির্ভর করছে পুরনো দলিলপত্র, সাক্ষ্য ও প্রমাণের ওপর—যেগুলোর হস্তান্তরে স্পষ্ট সংকট আছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে যে নতুন মামলাগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে, সেগুলোর বেশিরভাগই করা হয়েছে সরকার পতনের সময় সংঘটিত ‘গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ’ নিয়ে। প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম জানান, এই সময়ের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত সংস্থার কাছে জমা পড়েছে ৩৩৯টি অভিযোগ। তার মধ্যে ২২টি মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে ১৪১ জনকে।
এই তালিকায় আছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার সরকারের ৮ জন সাবেক মন্ত্রী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তারা। ইতোমধ্যে ৫৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, বাকি ৮৭ জন পলাতক। শেখ হাসিনাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করতে ইন্টারপোলকে অনুরোধও পাঠানো হয়েছে।
প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, শুধু গুলির ঘটনায় নয়—আন্দোলনের সময় লাশ পোড়ানো, ছাদ থেকে গুলি, গণআবরোধে হত্যাসহ একাধিক ঘটনায় তদন্ত চলছে এবং অনেক মামলার জবানবন্দি ও ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে।
প্রসিকিউটর বিতর্ক ও বিচারপ্রক্রিয়ার প্রশ্ন
এক সময় জামায়াত নেতাদের আইনজীবী হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে এখন ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর তার নিয়োগ নিয়ে তৈরি হয় বিতর্ক, যা আরও প্রবল হয় যখন দেখা যায় তিনি এটিএম আজহারুল ইসলামের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিনিধি হয়ে আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি টক শো-তে এই নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। উপস্থাপক জানতে চান, যিনি জামায়াত নেতাদের পক্ষে মামলা লড়েছেন, তাকে কেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর করা হলো। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এর জবাবে বলেন, “তিনি তো বিচারক না, একজন দক্ষ আইনজীবী। আগে যারা জামায়াতের বিপক্ষে লড়েছেন, তারাও তো আওয়ামী লীগপন্থী ছিলেন। তখন তো কেউ প্রশ্ন তোলেনি।” আইন উপদেষ্টাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তাহলে বিএনপির কোন আইনজীবিকে কি পাওয়া যায় নাই রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবি হিসাবে? সেই প্রশ্নের উত্তরে আসিফ নজরুল জানিয়েছিলেন “বিএনপির যদি দক্ষ কোন আইনজীবি পাওয়া যায়, আমাকে জানান, আমি ব্যাক্তিগত ভাবে তার নিয়োগের ব্যাবস্থা করবো”। তার এই উত্তরের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, জামায়েতের আইনজীবি বাদে কোন দক্ষ আইনজীবি নেই, এমনকি বিএনপির কোন আইনজীবিও দক্ষ নন।
এদিকে বিচারক এবং প্রসিকিউশনের নতুন গঠনের মধ্যেও একাত্তরের মামলাগুলোর অগ্রগতি না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. ওমর ফারুক। তিনি বলেন, “পুরনো মামলায় স্থবিরতা মানুষকে হতাশ করছে। নতুন মামলায় গতি পেলেও মুক্তিযুদ্ধের ন্যায়বিচারের প্রশ্নে শৈথিল্য কাম্য নয়।”
এখন পর্যন্ত একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে ট্রাইব্যুনালে রায় পাওয়া ১৮৮ জন আসামির মধ্যে ১৫৫ জনকে সাজা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ১০৬ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। কার্যকর হয়েছে ছয়জনের ফাঁসি, যাদের মধ্যে পাঁচজন জামায়াত নেতা এবং একজন বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী।
বাকি থাকা ৫৩টি মামলার মধ্যে কোনটি কোন পর্যায়ে আছে—তদন্ত, চার্জ গঠন, শুনানি—তা নিয়ে কর্তৃপক্ষ মুখ খুলছে না। কেউ কেউ বলছেন, এসব তথ্য ‘গোপনীয়’।
