আওয়ামী লীগ-পরবর্তী বাংলাদেশ: সংস্কৃতি-ধর্মনিরপেক্ষতা-নিরাপত্তা— কী টিকে থাকবে?

আওয়ামী লীগ-পরবর্তী বাংলাদেশ: সংস্কৃতি-ধর্মনিরপেক্ষতা-নিরাপত্তা— কী টিকে থাকবে?
শেয়ার করুন

-মাহমুদুল হাসান উৎস
ইঞ্জিনিয়ার ও অ্যাক্টিভিস্ট

কেমন আছে আওয়ামী লীগ-পরবর্তী বাংলাদেশ? শান্তির সুবাস বইছে, নাকি সবকিছু উল্টে-পাল্টে গুঁড়িয়ে গেছে? আওয়ামী লীগ নামক ‘নিয়ন্ত্রক শক্তি’ মাঠ থেকে সরে যেতেই যে ভ্যাকুয়াম তৈরি হয়েছে, সেই ফাঁকটা দ্রুত দখল করে নিচ্ছে উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী। পুরনো শাসকের ছায়া ঠিকমতো মাটিতে মিশে যেতেও পারেনি, অথচ এরই মধ্যে বদলে গেছে বাতাসের গন্ধ। এই গন্ধ আর সেই চেনা গন্ধ না — এটা বারুদের, পুড়তে থাকা শহরের, আর ভেঙে পড়া প্রাচীন দেয়ালের। চারপাশে যেন শুধু ধোঁয়া আর অপেক্ষা—আরেকটা বিস্ফোরণের।

হিন্দুরা, বৌদ্ধরা, খ্রিস্টানরা তো এই বাংলার বুকে জন্ম থেকে শংকিত। সংখ্যায় কম বলেই শিকার হয়েছে সহস্রবার। কিন্তু এবার নতুন পালা শুরু হয়েছে। এবার নিশানা হয়েছে নিজেরাই — এই মাটির সুফি মুসলমানরা, যারা শত শত বছর ধরে গানের মধ্য দিয়ে আল্লাহকে ডেকেছে, মাজারে ফুল দিয়ে শান্তি চেয়েছে। আজ তারাই তাদের জন্মভূমিতে ‘অপরাধী’।

দিনাজপুর থেকে শুরু, নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এই আগুন। যে মাজারে একদিন আলোকসজ্জা হতো ওরসের রাতে, সেখানে আজ জ্বলছে খাকি রঙের লাঠি, উড়ছে ‘তৌহিদি জনতার’ স্লোগান। প্রশাসন? চোখ বুঁজে আছে। রাষ্ট্র? নিশ্চুপ।

জানুয়ারি মাসের হিসেব অনুযায়ী, ড. ইউনুস সরকারের প্রথম ছয় মাসেই অন্তত ৮০টির মতো মাজারে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ হয়েছে — নেত্রকোনা, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, সিরাজগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, নারায়ণগঞ্জ—বাংলার প্রায় প্রতিটি প্রান্ত ছুঁয়ে গেছে এই তাণ্ডব। এখন মে মাসে এসে এই সংখ্যা কমপক্ষে ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। ঠাকুরগাঁওয়ের তিনশ বছর পুরনো বিবি সখিনার মাজার, নারায়ণগঞ্জের দেওয়ানবাগ, সিরাজগঞ্জের পাগলা মাজার — সব জায়গায় একই দৃশ্য: প্যান্ডেল পুড়ছে, তোরণ গুঁড়িয়ে যাচ্ছে, পশু লুট হচ্ছে। আর এইসবের পেছনে রয়েছে এক সূক্ষ্ম প্রকল্প — বাংলা মুসলমানকে আরবের ছাঁচে ঢেলে সাজানো। বৈচিত্র্য নয়, একরেখা একরঙা ইসলাম প্রতিষ্ঠার অভিযান চলছে।

সুফি-মাজার তো শুধু ধর্ম ছিল না; ছিল বাংলার সংস্কৃতি, ছিল গ্রামীণ জনতার মিলনস্থল। আজ সেই শিকড়ই উপড়ে ফেলা হচ্ছে, প্রশাসনের নীরব সম্মতিতে। বাংলাদেশের মাটিতে যে অদৃশ্য ক্ষমতা এখন ক্রিস্টালের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তার প্রথম আঘাত এসে পড়েছে আমাদের ঐতিহ্যের বুকে। এবং প্রতিটি হামলার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন আছে, আছে একটি বার্তা, যা নির্ধারণ করছে কেমন হবে আগামী দিনের বাংলাদেশ।

বাংলাদেশে নতুন জিহাদের টার্গেট: মাজার ও সুফি ঐতিহ্য

সিলেটের শাহপরান মাজারে যা ঘটেছে, তা নিছক ঘটনা নয়—বরং রীতিমতো শিরশীতল করার মতো বিষয়। মাজারের এক খাদেম বলেছেন, এখানে নাকি গানের আড়ালে মাদক ব্যবসা চলে, তাই তারা গানের অনুষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা আসলে একটু ভিন্ন। শাহপরান থানার ওসি হারুন অর রশীদ চৌধুরী বিবিসিকে বলেন, “এটা ঐরকম কোনো ইস্যু না। এখানে এলাকাবাসী মিলে গতকাল একটা প্রতিবাদ করেছে।”

যখন শাহপরানের মতো ঐতিহাসিক মাজারে গান-বাজনা নিষিদ্ধের ঘোষণা আসে, তখন এটা আর শুধু সংস্কারের বিষয় থাকে না। এটা হয়ে ওঠে ক্ষমতার ভাষ্য নির্মাণের অংশ। সেই ভাষ্যটা বলছে—বাংলাদেশের মুসলিম সমাজ এখন ওয়াহাবি ধারায়‘শুদ্ধিকরণে’র পথে হাঁটছে। আর এই শুদ্ধি অভিযানে জড়িত এক নতুন প্রজন্ম, যারা মাদ্রাসা শিক্ষার সঙ্গে ফেসবুক-টিকটকের ‘জিহাদি ভাষা’ রপ্ত করেছে। খোলাখুলি মাজার ভাঙার ডাক, টুপি-জোব্বা পরে লাঠি হাতে মিছিল, দিনের আলোয় হামলা—সবকিছুই বুঝিয়ে দেয় রাষ্ট্রযন্ত্র নিশ্চুপ, আর সমাজের প্রতিরোধ শক্তি ছত্রভঙ্গ।

সিরাজগঞ্জের ঘটনা তারই আরও একটি প্রমাণ। বিবিসি বাংলার রিপোর্ট বলছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে মাজারে হামলার আগে মাদ্রাসা ছাত্রসহ কয়েক হাজার লোক স্থানীয় কান্দাপাড়া হাটে জড়ো হয়েছিল। সেখান থেকে মিছিল নিয়ে তারা মাজারে গিয়ে হামলা চালায়। দানবাক্স, খাদেমের ঘর ভেঙে নগদ টাকা আর মালামাল লুটে নেয়।

এবার পাঠকের জন্য প্রশ্ন— যদি তথাকথিত অশালীন কাজকর্ম বন্ধই তাওহিদী জনতার উদ্দেশ্য হয়, তাহলে লুটপাট, চুরি, ডাকাতি কারা করল?

পুলিশ পরিদর্শক আনোয়ার হোসেন বিবিসিকে জানান, তিনি ইসমাইল পাগলার মাজারে হামলার খবর জানেন, তবে আলী পাগলার মাজারে হামলার ব্যাপারে কিছু জানেন না। ইসমাইল পাগলার মাজারে ভাঙচুরের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মাজারে গাঁজা খায়। বাদ্যবাজনা বাজায়। তা পারিপার্শ্বিকতার জন্য ডিসগাস্টিং পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে।”

এখন পাঠকের কাছে আমার সরল প্রশ্ন—বাদ্যবাজনাকে পুলিশ যখন ‘ডিসগাস্টিং’ বলে, তখন মাজারে হামলার এই মবকে কি পুলিশ পরোক্ষভাবে ছাড়পত্র দেয় না? রাষ্ট্র কি এইক্ষেত্রে নিজেই নীরব মদতদাতা হয়ে দাঁড়ায় না?

দেশে মাজার ভাঙার যে হিড়িক চলছে, তাতে নতুন সংযোজন ছিল দেওয়ানবাগ। ভোরের দিকে কিছু লোক হঠাৎ মাজারে ঢুকে ভাঙচুর চালায়। ভেতরে থাকা লোকজন তাদের থামাতে গেলে হামলাকারীরা উল্টো তাদের পেটায়।

কারা করল এই হামলা? এই প্রশ্নের জবাবে থানার ওসি আবু বকর সিদ্দিক বিবিসি বাংলাকে যা বলেন, সেটা কিন্তু চোখে পড়ার মতো: “সর্বশ্রেণির মাজার বিদ্বেষী, পীর বিদ্বেষী লোকজন এটা করেছে।”

এ কথা শুনে পাঠকের বোঝা উচিত—এই হামলার পেছনে শুধু ‘ধর্মান্ধ গ্রামবাসী’ নেই, আছে আরও বড় কোনো ছায়া। পুলিশ যখন বলে, “সব শ্রেণির মাজার বিদ্বেষীরা এটা করেছে,” তখন স্পষ্ট হয়—মাঠে শুধু গাঁয়ের জোয়ানরা নেই, আছে রাজনৈতিক পরিকল্পনাও। আওয়ামী লীগের পতনের পর যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তার প্রথম শিকার হচ্ছে এই বাংলা মরমী ঐতিহ্য। যে ঐতিহ্য একসময় সংস্কৃতির অংশ ছিল, আজ সেটাকেই ‘হারাম’ তকমা দিয়ে সমাজ থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে।

নেত্রকোনার কেন্দুয়াতেও তালিকায় যোগ হয়েছে আরেকটা নাম। মাসকা বাজারসংলগ্ন হজরত শাহ নেওয়াজ ফকিরের (ল্যাংটা পাগলা) মাজারে যখন ৬৪তম ওরসের প্রস্তুতি চলছিল, তখন রাতে হঠাৎ লাঠিসোঁটা হাতে ‘তৌহিদি জনতা’ মিছিল করে এসে সব তছনছ করে দিলো। তোরণ ভাঙলো, প্যান্ডেল ভাঙলো, আলোকসজ্জা ছিঁড়ে দিলো। পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনল—মানে মিছিলটা থামাল, ক্ষতিটা হয়ে যাওয়ার পর।

মাজার কমিটির দাবি, রমজান মাস হওয়ায় এবারের ওরস সীমিত করা হয়েছিল, শুধু দোয়া-মাহফিল। কিন্তু তারপরও হামলা হয়েছে। কমিটির সভাপতি আলী উছমান বলছেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমরা এখানে এই আয়োজন করে আসছি, এবারও তাই করছিলাম।’

কিন্তু এবার খেয়াল করার মতো জায়গাটা হলো থানার ওসি মিজানুর রহমানের বক্তব্য। তিনি বলছেন, “মাজারের ওরসের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল, কিন্তু আমাদের কাছ থেকে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি।”

এই বাক্যটা একবার ভালো করে ভাবুন। পুলিশের বক্তব্য যেন অদৃশ্যভাবে ইঙ্গিত করছে—অনুমতি না নেওয়াই কি হামলার পরোক্ষ বৈধতা? তাহলে কি এ দেশে এখন মাজারে দোয়া-মাহফিল করতে গেলেও অনুমতির কাগজ না থাকলে, লাঠিসোঁটা নিয়ে মিছিল এসে ভাঙচুর করাটা ‘বোধগম্য’ বা ‘সম্ভবপর ঘটনা’ হয়ে গেছে?

এখানেই প্রশ্নটা ওঠে—তৌহিদি জনতা যখন হামলা করে, তখন তাদের বিরুদ্ধে ওসি সাহেবের কোনো তেমন কড়া বক্তব্য নেই। বরং মাজার কমিটির অনুমতি না নেওয়াকেই নীরবে সামনে এনে রাখা হচ্ছে। ঠিক এই ন্যারেটিভটাই আমরা সিলেটে, সিরাজগঞ্জে, নারায়ণগঞ্জে আগেও দেখেছি। মাজার-সংস্কৃতি এখন শুধু ‘বিদ্বেষীদের’ নয়, প্রশাসনিক ভাষ্যের মধ্যেও প্রশ্নবিদ্ধ।

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট। আফসারাবাদ কলোনির রহিম শাহ বাবা ভান্ডারি মাজারে হামলার চিত্রটা যেন আগুনের আঁচে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠে। শুধু আগুন নয়, লাঠি, হাতুড়ি আর লুটপাটও। মাজারের প্যান্ডেল খুলে নেওয়া হচ্ছে, বাঁশ আর দড়ি নিয়ে যাচ্ছে মানুষ। কেউ কেউ আবার হাতুড়ি মেরে মাজারের দেয়াল ভেঙে রড বের করছে। এ যেন মাজার ধ্বংসের ওপেন মার্কেট।

এদিকে সিরাতে মুস্তাকিম পরিষদ ব্যানারের ‘লাঠিমিছিল’ থেকে অভিযোগ তোলা হয় মাজারে ‘অশ্লীল কার্যকলাপ’ চলে—গান-বাজনা, মাদক সেবন। আর ঠিক এই অভিযোগের পরেই উত্তেজিত ‘তৌহিদি জনতা’ হামলা করে মাজারে। শুধু হামলাই নয়, অগ্নিসংযোগ করে, কবরের ঢাকনা ভাঙে, রান্নার হাঁড়িপাতিল, গরু-ছাগল পর্যন্ত লুট করে নিয়ে যায়। যেন এটা ধর্মের নামে না, বরং কোনো দস্যুবৃত্তির মহড়া।

মাজারের ভাণ্ডারি জয়নাল আবেদীন বলছেন, প্রতি বছর ১৮ ফাল্গুনে এই ওরস হয়। দেশ-বিদেশ থেকে ভক্তরা আসেন, এবারও জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু হামলার পরে তাঁর প্রশ্ন—”এখানকার যে অবস্থা, কার কাছে অভিযোগ দেব?” এই প্রশ্নটা শুধু তাঁর নয়, বাংলার সেই আদি সুফি ঐতিহ্যের প্রতি যাঁরা আস্থা রাখেন, তাঁদের সবার।

আর এখানেই মনোয়ারের বক্তব্যটা গুরুত্বপূর্ণ। সিরাতে মুস্তাকিম পরিষদের উপদেষ্টা মুফতি মনোয়ার হোসেন বলছেন, মাজারের লোকজন নাকি “ইসলামের মৌলিক কাঠামো নিয়ে কটূক্তি করেন।” এবং এই বেদাত-শিরকের অভিযোগে মানুষ এতটাই বিরক্ত ছিল যে স্বৈরাচারী আমলের সময় দমন হওয়া রাগ এখন যেন ফেটে পড়েছে। তাঁর বক্তব্যের শেষটা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ—”তবে সেটা করতে গিয়ে অতিরিক্ত যা হয়েছে, সেটা নিন্দনীয়। এটাকে কখনো সমর্থন করা যায় না।”

তাহলে প্রশ্ন উঠে: এই ‘অতিরিক্ত যা হয়েছে’—যেখানে কবরের ঢাকনা পর্যন্ত হাতুড়ি দিয়ে ভাঙা হলো, গরু-ছাগল লুট করা হলো, সেটা কি শুধু ‘নিন্দনীয়’ বলেই শেষ হবে? নাকি এটাও সেই পরিকল্পিত শুদ্ধিকরণের অংশ, যেটা এখন প্রশাসনিক মৌনতা আর ধর্মীয় উত্তেজনার যৌথ প্রজেক্ট হয়ে উঠেছে?

এখানে দুইটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে:

  • সরকার হয় এই হামলাকারী গোষ্ঠীগুলোকে খুশি রাখতে ইচ্ছাকৃতভাবে নীরব।
  • অথবা, সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়েছে, বিশেষত গ্রাম-উপশহর পর্যায়ে যেখানে এসব গোষ্ঠীর প্রভাব বেড়েছে।

বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক সন্ত্রাস: হারিয়ে যাবে কি লালন-রবীন্দ্রনাথের বাংলা?

২০২৫ সালের এই ফেব্রুয়ারি, ঢাকার বাতাসে বসন্ত আর ভালোবাসার হাওয়া বইছিল। কিন্তু সেই হাওয়ার মাঝে ছুরি চলে গেল সাংস্কৃতিক মুক্তচিন্তার বুকে। উত্তরায় বসন্ত উৎসব পণ্ড হওয়ার ঠিক পরদিনই ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে—রমনার মহিলা সমিতি মিলনায়তনে—বাধার মুখে বন্ধ হলো ‘ঢাকা মহানগর নাট্য উৎসব’। প্রস্তুতি ছিল দুই মাসের, শ্রম ছিল প্রায় ৮৫টি নাট্যদলের, কিন্তু শেষমুহূর্তের এক ‘আপত্তি’ সবকিছু থামিয়ে দিল।

উৎসব আয়োজকরা বললেন, “সব ঠিকঠাক ছিল, থানার কাছেও নিরাপত্তার আশ্বাস চেয়েছিলাম। কিন্তু ওসি সাহেব এসে বললেন, নাটক চলুক, তবে শুধু ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটকটা বাদ দিতে হবে।”

আর তখনই ঘটে সেই পুরনো দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। আয়োজকরা থানা থেকে বের হতেই, একদল ‘মব’ মহিলা সমিতিতে ঢুকে চিৎকার করে, গালাগাল করে, আর চাপ দেয় অনুষ্ঠান বন্ধ করতে। ভয়ে মহিলা সমিতি রাতারাতি মঞ্চের বরাদ্দ বাতিল করে। পুলিশ অবশ্য বিবৃতি দেয়, “আমরা কিছু বন্ধ করিনি। সৃজনশীল কাজকে আমরা সবসময় উৎসাহিত করি।” কিন্তু বাস্তবে উৎসব থেমে যায়, নাটকের আলো নিভে যায়।

এই ঘটনা শুধু ঢাকায় না। চট্টগ্রামের সিআরবি মাঠে প্রমা’র বসন্ত উৎসবও শেষ মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের হঠাৎ নির্দেশে। আয়োজকেরা প্রশ্ন করে না, শুধু বেরিয়ে যায়—ঝামেলায় যেতে চায় না। যেন এটাই নতুন নিয়ম হয়ে গেছে।

উত্তরাতেও একই চিত্র। বসন্ত উৎসবের অনুমতি নিয়েও তারা অনুষ্ঠান করতে পারেনি। মঞ্চের নাম নিয়ে আপত্তি, আয়োজকদের পছন্দ না হওয়া—এইসব তুচ্ছ অজুহাত দেখিয়ে উচ্ছৃঙ্খল একদল মানুষ পুরো আয়োজন বন্ধ করিয়ে দেয়। এই দলের পরিচয়? কেউ বলছে তারা ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’র, কেউ বলছে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’।

আর টাঙ্গাইলের মধুপুর? সেখানে লালন স্মরণোৎসবের আয়োজন থেমে  গিয়েছে হেফাজতে ইসলাম আর কওমী ওলামাদের আপত্তিতে। শেষ পর্যন্ত আয়োজকেরা সমঝোতা করতে বাধ্য হন—”আমরা আপত্তিকর কিছু বলব না, গাইব না!” একপ্রকার আত্মসমর্পণ করে তারা নতুন তারিখ ঠিক করে।

ঘটনার পেছনে যে ছায়া কাজ করছে, তার নাম সবাই বলে না। কখনও তারা ‘তৌহিদী জনতা’, কখনও ‘একদল লোক’। কিন্তু সবার মুখে একটাই প্রশ্ন—সরকার পতনের পর এই দলগুলোর সাহস এত বেড়ে গেল কীভাবে? স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ—সবাই যেন নিরপেক্ষ দর্শক।

এইরকম ঘটনার আসলে শেষ নেই, বললে হাজারটা বলা যাবে। চলুন, আরও ইন্টারেস্টিং কিছু তথ্য আমরা জেনে নেই। চট্টগ্রামে চলছিল আবৃত্তির অনুষ্ঠান। পূর্বনির্ধারিত সূচি মেনেই শিল্পীরা আসছেন, কবিতার ছন্দে গলা ছাড়ছেন, দর্শক তাল মিলিয়ে শুনছে। যেন সবকিছুই সাজানো গোছানো।

যখন একজন শিল্পী মঞ্চে দাঁড়িয়ে পড়ছিলেন কবি রবিউল হুসাইনের কবিতা—তখনই কবিতার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে কয়েকটা শব্দ। “বঙ্গবন্ধু।” “জয় বাংলা।” “একাত্তর।” “মার্চের সাত।” “ভাসানী।”

শব্দগুলো তো শুধু শব্দ ছিল। কিন্তু সেদিন মনে হলো, যেন মঞ্চের বাতাসে আগুন জ্বলে উঠেছে। যেন সুপ্ত আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়েছে।

পুলিশ প্লাজার পাশ থেকে দৌড়ে এলো জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা–জাসাসের নেতা-কর্মীরা। তাদের চোখে কবিতার এই শব্দগুলো আর কবিতা নয়, এটা নাকি রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র। তাদের মতে, এসব বলা মানে দেশের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করা।

আর শিল্পী? যিনি শুধু মাইক হাতে কবিতা পড়ছিলেন?

তাঁকে মঞ্চের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে হেনস্তা করা হলো। চাপ দিয়ে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হলো। পুলিশ ছিল, কিন্তু তারা শিল্পীর পাশে নয়। তারা এসে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিলো। যেন শব্দের অপরাধের বিচার তাদের হাতেই পড়েছে।

জাসাসের সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশিদ গলা চড়িয়ে বললেন, “রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড চলছিল, তাই প্রতিবাদ করেছি।”

কিন্তু এখানেই আসে প্রশ্নটা।

রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড কি শুধু বঙ্গবন্ধুর নাম নিলেই শুরু হয়?

“স্বাধীন দেশে পাকিস্তানি শকুন” বললে কারা ব্যথা পায়?

তারা কি নিজেদের মধ্যে সেই শকুনের ছায়া দেখতে পায়?

পুলিশ জানালো, তারা গিয়ে অনুষ্ঠান বন্ধ করেছে। জাসাস নেতারা দাবি করলেন, “আমরা কাউকে হেনস্তা করিনি, শিল্পী স্বেচ্ছায় ক্ষমা চেয়েছেন।” কিন্তু যারা ঘটনাস্থলে ছিলেন, তারা বলেন ভিন্ন কথা।

বাংলাদেশে হিন্দু নিপীড়নের রাজনীতি: জঙ্গিবাদের নতুন কৌশল?

শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর সেই ঝড় থেমে যায়নি—বরং ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামেগঞ্জে, শহরে। সেই ছায়ায় আবারও আক্রান্ত হয়েছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খবর আসছে: হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানদের উপাসনালয়, বাড়িঘর আর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চলছে।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানাদাশ গুপ্ত জানান, মাত্র দুই দিনে—৯৭টি জায়গায় সংখ্যালঘুদের বাড়ি-দোকানে হামলা হয়েছে, লুটপাট হয়েছে, ভাঙচুর হয়েছে। হামলা হয়েছে ১০টি মন্দিরেও।

প্রথম আলো বলছে, নাটোর, ঢাকার ধামরাই, পটুয়াখালীর কলাপাড়া, শরীয়তপুর আর ফরিদপুরে মন্দিরে হামলা হয়েছে। যশোর, নোয়াখালী, মেহেরপুর, চাঁদপুর আর খুলনায় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে আগুন, ভাঙচুর। এমনকি ঢাকার প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী রাহুল আনন্দের বাড়িতেও হামলা হয়েছে—ঘর ভাঙা, আগুন লাগানো।

এ প্রশ্নটা বারবার ওঠে: বাংলাদেশে যখনই ক্ষমতার পালাবদল হয়, তখন কেন হিন্দুদের আতঙ্ক আরও বাড়ে?

গত চার দশকের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতা হারায়, তখনই বেশি করে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ সামনে আসে।

রানাদাশ গুপ্তের কথায়, বড় আকারে সংখ্যালঘুদের ওপর প্রথম হামলা হয় ১৯৯২ সালে, বাবরি মসজিদ ভাঙার সময়। তখন খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকার ছিল। এরপর ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার সময় আরও ভয়ংকর হামলা হয়। তখন দেশে নির্বাচন শেষ হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল, বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে। কিন্তু ফল প্রকাশের দিন থেকে শুরু করে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের আগপর্যন্ত—হামলা চলতেই থাকে। বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত অনেকের বিরুদ্ধে তখন এসব হামলার অভিযোগ উঠেছিল।

২৪ এ এসেও ঘটনার ব্যতিক্রম হয়নি। শুধু শেখ হাসিনার পতনের পরই জাতীয় হিন্দু মহাজোটের দাবি অনুযায়ী ৪৮ জেলায় ২৭৮টি হামলা হয়েছে। আর ঐক্য পরিষদের হিসেবে ৫২ জেলায় অন্তত ২০৫টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। সংখ্যালঘু অধিকার আন্দোলন এর মধ্যেই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা তদন্তে একটি ‘সংখ্যালঘু কমিশন’ গঠনের দাবি জানিয়েছে।

কিন্তু প্রশ্নটা একই রয়ে গেছে: কেন হিন্দুরা এতটা আতঙ্কে আছে?

রানাদাশ গুপ্ত বলেন, এটা দায়মুক্তির সংস্কৃতি। হামলাকারীরা বারবার পার পেয়ে যায়। কেউ বিচার পায় না। ফলে বারবার এটা ঘটে। তিনি আরও বলেন, যারা ধর্মীয় সহাবস্থান মানে না, তারাই এই হামলার পেছনে। এটা পাকিস্তান আমল থেকে চলে আসছে।

প্রথম আলোর অনুসন্ধান বলছে, ৫ থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত সময়ের মধ্যেই সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি আর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার সংখ্যা ১,০৬৮। চোখ বন্ধ করে ভাবুন—মাত্র ১৫ দিনে হাজারের ওপরে হামলা।

সরকারি মহল অবশ্য এর মাঝেও বলছে—অনেক ‘ভুল তথ্য’ ছড়ানো হচ্ছে। কেউ কেউ বলছে বহু মৃত্যু হয়েছে, কেউ বলছে সংখ্যা বাড়িয়ে বলা হচ্ছে। অথচ মাঠের ছবিটা অন্য কথা বলছে। দিনাজপুরের ৪০টা হিন্দু দোকান ভেঙে ফেলা হয়েছে, শরীয়তপুরের ধানুকা মনসা বাড়ির কৃষ্ণ মন্দির গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। রংপুরের তারাগঞ্জে আহমদিয়া উপাসনালয়ে হামলা চালানো হয়েছে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আতিয়ার রহমানের রাসায়নিক সারের গোডাউনে হামলা চালানো হয়। এ সময় হামলাকারীরা গোডাউনে থাকা ৪৬০ বস্তা সার লুটপাট করে নিয়ে যায়। নাটোর, ধামরাই, কলাপাড়া, ফরিদপুরে মন্দির আর বাড়িঘরে হামলা—সবই একসাথে ঘটেছে।

পাঠক, এবার যা জানবেন স্তম্ভিত করে দিবে। দিনাজপুরের বনতারা গ্রামের কথা মনে আছে আপনাদের? মনে করিয়ে দিচ্ছি—সেখানে স্থানীয় হিন্দুদের প্রায় সাত দিন ধরে একঘরে করে রাখা হয়েছিল। হ্যাঁ, এই ২০২৫ সালেও। মাইকে ঘোষণা দিয়ে বলা হয়েছিল—হিন্দুদের দোকানপাট বন্ধ থাকবে, গাড়ি চলবে না, এমনকি হিন্দু জেলেরা মাছ ধরবে না!

আসুন, এবার জেনে নিই পুলিশের ভূমিকা। বাংলাদেশ পুলিশ তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ঢাকঢোল পিটিয়ে জানিয়েছে—সব মিথ্যা, দেশে এমন কিছু ঘটেনি! অথচ বিবিসি বাংলার রিপোর্ট বলছে—বনতারা গ্রামের হিন্দুরা আজও আতঙ্কে। তাদের ঘরবাড়ি এখনো সেই ভয় আর শঙ্কার ঘেরাটোপে বন্দী।

বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর হামলা এখন প্রায় স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এত বেশি ঘটছে যে এসব ঘটনার সংখ্যা গুনে শেষ করা যায় না। ভাবুন, ২০২৫ সালের এই আধুনিক সময়েও গ্রামের হিন্দু পরিবারদের একঘরে করে দেওয়া হচ্ছে — ঠিক যেন শত বছর আগের কোনো বিভীষিকাময় অধ্যায় নতুন করে ফিরে এসেছে!

আদতে বাংলাদেশ চলছে একধরনের নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায়। সংখ্যালঘু সহ নারীদের নিয়ে সহিংসতা আজ আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। শুধু পোশাকের কারণে কত নারী জনতার রোষানলে পড়েছেন, জনসম্মুখে লাঞ্ছিত হয়েছেন। সিগারেট খাওয়ার মতো ব্যক্তিগত বিষয়েও নারীদের সামাজিকভাবে অপমান করা হচ্ছে। নারীদের ঘরে বন্দি করে রাখার যেন এক অঘোষিত ষড়যন্ত্র চলছে দেশজুড়ে।

এই চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে নারীদের ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনায়। মাঠের খেলা ছাড়িয়ে তৌহিদি জনতা রাস্তায় মিছিল করেছে, প্রতিবাদ জানিয়েছে — নারীদের ফুটবলারদের আতঙ্কের ভেতর ফেলে দিয়েছে।

এই হামলার দৌরাত্ম্য শুধু শহরের সংখ্যালঘু বা হিন্দু সম্প্রদায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি — আদিবাসীরাও রেহাই পায়নি। পাহাড় থেকে সমতল পর্যন্ত, নিজেদের ন্যায্য অধিকার চাওয়ার অপরাধেই তারা আজ চরম নিপীড়নের শিকার।

বাংলাদেশের সামাজিক অবক্ষয় কোন দিকে যাচ্ছে, তার আরেকটা প্রকট উদাহরণ আমাদের সামনে। ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন দেখি—তিন বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই টিপ-কাণ্ডের ঘটনায় এখন উল্টো মানহানির মামলা হয়েছে। হ্যাঁ, লতা সমাদ্দার—যিনি টিপ পরার অপরাধে রাস্তায় পুলিশ কনস্টেবলের হাতে হেনস্তার শিকার হয়েছিলেন—তাকেই এখন আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে। শুধু তিনিই নন, আরও ১৭ জনের নাম এসেছে তালিকায়। অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফা, সায়মন সাদিক, আনিসুর রহমান মিলন, জ্যোতিকা জ্যোতি—তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলা হয়েছে।

আর মামলার বাদী কে জানেন? সেই পুলিশ কনস্টেবল নাজমুল তারেক। আদালতও মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশে নির্যাতিতরা অভিযুক্ত হয়, আর নির্যাতকদের জন্য আদালতের দরজা সবসময় খোলা থাকে।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠবেই—রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহের বাড়ির দেয়ালে কালেমা লেখা হলো, দেশে যখন ভাস্কর্য ভাঙা হচ্ছে, তখন কেন কোনো মামলা হয় না? তখন কেন ধর্মের নাম ভাঙানো পাহারাদাররা নীরব থাকে?

আরেকটু পেছনে তাকালেই দেখি—স্বাধীনতার স্লোগান ‘জয় বাংলা’ বলার অপরাধে প্রকাশ্যে নারীদের পিটিয়ে আহত করা হয়েছে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের আতুড়ঘর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ভাঙচুরের প্রতিবাদ করায় নারীদের রাস্তার মাঝখানে ফেলে নির্মমভাবে মারা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের ওপরও চলছে নির্যাতনের বন্যা—জামায়াত নেতারা প্রকাশ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করছে। কুমিল্লায় তো মুক্তিযোদ্ধাকে জুতার মালা পর্যন্ত পরানো হয়েছে। এই লজ্জা আসলে কার?

তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে: যে দেশে সুফিরা নিরাপদ নয়, হিন্দুরা ভয়ে থাকে, বাউলের গান নিষিদ্ধ হয়, নারীরা নির্যাতনের শিকার হয়— সেই দেশ আসলে কার?

 

Visited 109 times, 1 visit(s) today