বিশ্লেষণ || কী ঘটেছিলা শাপলা চত্বরে, মিথ বনাম বাস্তবতা

বিশ্লেষণ || কী ঘটেছিলা শাপলা চত্বরে, মিথ বনাম বাস্তবতা
শেয়ার করুন
আমিনুল হক

২০১৩ সালের ৫ই মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অনুষ্ঠিত হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করে সেই ঘটনার বিচারের বিষয়টি নতুন করে আলোচিত হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে।

৩রা মে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হেফাজতের সমাবেশে আমার দেশ পত্রিকার সাংবাদিক মাহমুদুর রহমানসহ হেফাজতের নেতৃবৃন্দ এই ঘটনার বিচারের দাবি তোলেন জোরেসোরে। জামায়াতে ইসলামের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির একই দাবিতে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। যদিও ইতোমধ্যেই এই ঘটনায় হেফাজতের পক্ষ থেকে দায়েরকৃত মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হতে শেখ হাসিনা ও ইমরান এইচ সরকারসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে গত ১২ই মার্চ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস গত ২রা মার্চ বাংলাদেশে কর্মরত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী গুয়েন লুইস এবং আবাসিক সমন্বয়কারী কার্যালয়ের সিনিয়র মানবাধিকার বিষয়ক উপদেষ্টা হুমা খানের সাথে যমুনায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে শাপলা চত্বরের সমাবেশে যে “হত্যাকান্ড” হয়েছে সেটি নথিভুক্ত করতে জাতিসংঘকে অনুরোধ করেন।

উগ্রবাদী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডবের খণ্ডচিত্র

লক্ষ্যনীয় যে, উক্ত বৈঠকের ১০ দিন পরেই হেফাজতের পক্ষ হতে দায়ের করা মামলায় আইসিটি থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এদিকে গত ৩রা মে ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে ড. ইউনূসের উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম মজুমদার দাবি করেন ২০১৩ সালে হেফাজতের সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে ৫৮ জন নিহত হয়েছিল।

উগ্রবাদী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডবের খণ্ডচিত্র

হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে হেফাজতের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা নিয়ে সর্বপ্রথম বিতর্ক তৈরি করেছিল বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের শিল্প, গৃহায়ন ও গনপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এবং মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ এর সম্পাদক আদিলুর রহমান। তার প্রতিষ্ঠান ‘অধিকার’ এর ওয়েবসাইটে ১০ই জুন, ২০১৩ তারিখে ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ এর সমাবেশ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন’ শিরোনামে একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংস প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। বাংলা এবং ইংরেজী উভয় ভাষায় প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে দাবি করা হয় হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ৬১ জন নিহত হয়েছে যাদের বিস্তারিত তথ্যাদি তাদের অধিকার সংগ্রহ করেছে।

উগ্রবাদী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডবের খণ্ডচিত্র, ছবি সংগ্রহ: বিডিনিউজ

এছাড়া, এই রিপোর্টে আরো দাবি করা হয় প্রায় আড়াই হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়েছে। অধিকারের প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর সেটিকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমসমূহে এই নিয়ে সংবাদ প্রচার করে।

অধিকারের ৬১ জন নিহত হবার দাবিকে যাচাই বাছাই করার জন্য তথ্য মন্ত্রণালয় হতে ১০ই জুলাই, ২০১৩ তারিখে তথ্য অধিকার আইনে নিহতের তালিকা চাওয়া হয়। কিন্তু অধিকার তালিকা প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়ে তাদের উদ্দেশ্যমূলক অপ-প্রচার অব্যাহত রাখে। এর প্রেক্ষিতে ১০ই আগস্ট, ২০১৩ তারিখে গুলশান থানায় ডিবি পুলিশের পরিদর্শক আশরাফুল ইসলাম একটি জিডি করে সেই জিডির আলোকে অধিকারের কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করে আদিলুর রহমানকে গ্রেপ্তার এবং প্রতিবেদন তৈরিতে ব্যবহৃত তিনটি ল্যাপটপ ও দুটি সিপিইউ জব্দ করা হয়।

উগ্রবাদী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডবে পুড়ে যাওয়া কোরান শরিফ

জব্দকৃত ডিভাইসমূহের ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ৬১ জন নিহতের নাম সম্বলিত একটি তালিকা পাওয়া যায়। পুলিশের পক্ষ হতে উক্ত তালিকা যাচাই বাছাই করার জন্য বিস্তারিত তদন্ত পরিচালনা করা হয়।

উগ্রবাদী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডবের খণ্ডচিত্র

তদন্তকালে দেখা যায়, নিহতের তালিকায় উল্লেখিত ৪ জন জীবিত। ভিন্ন ঘটনায় নিহত ৭ জনকে হেফাজতের সমাবেশে নিহত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, মৃত ৫ ব্যক্তির নাম দুবার করে উল্লেখ করা হয়েছে, ১১ জনের কাল্পনিক নাম যুক্ত করা হয়েছে যাদের কোন ঠিকানা উল্লেখ করা হয়নি, ৭ জনের নামের পাশে ভুল তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। আর ২৭ জনের নামের পাশে ‘ইয়েট টু কনফার্ম’ লিখা থাকলেও ‘অধিকার’ কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাদেরকে মৃত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

এতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির হীন উদ্দেশ্য নিয়ে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান এবং পরিচালক নাসির উদ্দিন এলান একটি বানোয়াট ও মিথ্যা প্রতিবেদন তৈরি এবং তা দেশে বিদেশে প্রচার করেছেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তা ৪ঠা সেপ্টেম্বর, ২০১৩ সালে ঢাকার সিএমএম আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন এবং ১১ই সেপ্টেম্বর, ২০১৩ সালে সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদালতে এটি মামলা (মামলা নং-০১/২০১৩) হিসেবে গৃহীত হয়।

সুনির্দিষ্ট অভিযোগে গ্রেপ্তার হবার সত্বেও আদিলুর রহমান দুই মাসের মাথায় উচ্চ আদালত হতে জামিন লাভ করেন এবং নাসির উদ্দিন এলান মামলার কার্যক্রম শুরুর আগেই আগাম জামিন পান। ২০১৪ সালের ৮ই জানুয়ারি সাইবার ট্রাইবুন্যাল আদালতে এই মামলার অভিযোগ গঠন করা হয়। আদিলুর রহমান অভিযোগ গঠনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে ‘লিভ টু আপিল’ আবেদন করলে উচ্চ আদালত মামলার কার্যক্রমের উপর স্থগিতাদেশ প্রদান করে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে চারবছর পর ২০১৭ সালের ৯ই জানুয়ারি উচ্চ আদালত হতে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়।

আদিলুর রহমান স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল আবেদন করেন। সেই আবেদনের শুনানি শেষ হতেও লাগে আরো ৪ বছরের বেশি সময়। ২০২১ সালের ১৮ই আগস্ট আপিল বিভাগ হতে আদিলুর রহমানে আপিল খারিজ হয়ে যাবার পর ৫ই অক্টোবর সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। অর্থাৎ আদিলুর রহমানের আবেদনের প্রেক্ষিতে উক্ত মামলাটি ৮ বছরের বেশি সময় স্থগিত অবস্থায় ছিল। উক্ত মামলায় মোট স্বাক্ষীর সংখ্যা ছিলো ২৮ জন। মোট ২২ জন স্বাক্ষী মামলায় সাক্ষ্য প্রদান করেন, ৪ জন স্বাক্ষী মারা যাওয়ায় সাক্ষ্য দিতে পারেননি। এছাড়াও সাক্ষ্য দিতে আসেননি আদিলুর রহমানের স্ত্রী এবং কর্মচারী।

প্রায় দুই বছর সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদালতে মামলা চলাকালীন সময়ে আদিলুর রহমান ও নাসির উদ্দিন এলান স্থায়ী জামিনে ছিলেন এবং তাদের আইনজীবীগণ মামলা দীর্ঘায়িত করার জন্য সম্ভাব্য সকল আইনি সুযোগ গ্রহণ করেছেন। অবশেষে ১৪ই সেপ্টেম্বর, ২০২৩ সালে মামলা দায়েরের সুদীর্ঘ ১০ বছর পর রায় ঘোষণা করেন সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদালত। উক্ত রায়ে আদিলুর রহমান এবং পরিচালক এ এস এম নাসিরুদ্দিন নাসিরুদ্দিন এলানকে ২  বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেয় ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদালত। যদিও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যেই সেই রায় বাতিল করেছে।

আল-জাজিরাসহ কয়েকটি বিদেশি গণমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে মৃতের অভিনয় করে শুয়ে থাকার পর পুলিশি অ্যাকশনে উঠে বসা হেফাজত কর্মীদের একাংশ

 

অর্থাৎ, হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ কথিত গণহত্যার অভিযোগটি যে মিথ্যা এবং বানোয়াট তা সুদীর্ঘ আইনিয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়েছে। দীর্ঘ ১০ বছর আইনি প্রক্রিয়ার কোন পর্যায়েই আদিলুর রহমান তার কথিত ৬১ জন নিহতের প্রমাণ দাখিল করতে পারেননি। হেফাজত কিংবা অন্য কোন সংবাদ মাধ্যমের পক্ষ থেকেও এমন কোন তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। অথচ সেই বিষয়টিকে পুনরায় সামনে আনা হচ্ছে এখন। এর লক্ষ্য মূলত দুটি। প্রথমতঃ হেফাজতকে হাতে রেখে দেশে মৌলবাদী গোষ্ঠীকে খুশি রাখা, এবং দ্বিতীয়তঃ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশোধ হিসেবে আওয়ামী লীগ ও গণজাগরণ মঞ্চের নেতাকর্মীদের শাস্তির আওতায় আনা। তাদের এই অপচেষ্টা কতটুক সফল হবে তা সময়ই বলে দিবে।

লেখক পরিচিতি: সাবেক কূটনীতিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক

Visited 306 times, 1 visit(s) today