নিরাপদ সড়ক-বৈছা বিপ্লবের পর ট্রান্সপোর্ট টাইকুন: আড়াইশ বাসের পারমিট চান ছাত্রনেতা

নিরাপদ সড়ক-বৈছা বিপ্লবের পর ট্রান্সপোর্ট টাইকুন: আড়াইশ বাসের পারমিট চান ছাত্রনেতা
শেয়ার করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক | ৪ঠা মে, ২০২৫

শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে রাজপথে সরব তরুণ—কখনো ‘নিরাপদ সড়ক’, কখনো ‘হাফ ভাড়া’, কখনো বা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র (বৈছা) আন্দোলন’-এর ব্যানারে—কখন কীভাবে রাতারাতি হয়ে উঠলেন পরিবহন উদ্যোক্তা? কারা বা কোন শক্তি এই শিক্ষার্থীদের পেছনে বিপুল অর্থের জোগান দিলো?

নিরাপদ সড়ক, কোটা সংস্কার, বৈষম্যবিরোধী, সরকারবিরোধী আন্দোলনের পর রাতারাতি ছাত্রনেতারা কীভাবে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক বনে গেলেন- এ এক রহস্য। এমনই এক ছাত্রনেতা এখন ঢাকা শত শত বাস নামানোর উদ্যোগ নিচ্ছেন। চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে পরিবহন খাতসহ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে।

ঢাকায় নতুন পরিবহন কোম্পানি চিত্রা পরিবহন লিমিটেড সম্প্রতি ২৪০টি বাসের রুট পারমিট চেয়ে আবেদন করেছে। ২০২৩ সালের ২রা সেপ্টেম্বর ট্রেড লাইসেন্স পাওয়া এ কোম্পানির নেতৃত্বে রয়েছেন কয়েকজন তরুণ, যাদের অনেকেই এখনো শিক্ষার্থী। তাদের একজন মহিদুল ইসলাম দাউদ, যিনি পরিচিত ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়কসহ ছাত্রদের বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। বর্তমানে তিনি বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ‘গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল’-এর কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক।

দাউদের এই কোম্পানি ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন রিজিওনাল ট্রান্সপোর্ট কমিটি’র কাছে দুটি রুটের জন্য আবেদন করা হয়—একটি কালিয়াকৈর-নারায়ণগঞ্জ এবং অন্যটি সাভার-গাজীপুর। প্রতিটি রুটে ১২০টি করে মোট ২৪০টি বাস চালানোর অনুমতি চাওয়া হয়েছে।

২০২১ সালে ছাত্রদের আন্দোলনে

তথ্যটি বাইরে আসতেই প্রশ্ন উঠছে—এই বিপুল বিনিয়োগের আশ্বাস দিচ্ছে কে বা কারা? আর্থিক যোগান আসবে কীভাবে?

চিত্রা পরিবহনের সাত পরিচালকের মধ্যে তিনজনের বয়স ২৫ বছরের নিচে এবং দুজন এখনো শিক্ষার্থী। অথচ তারা মালিক-পরিচালক হিসেবে নাম লিখিয়েছেন একটি শত কোটি টাকার ব্যবসায়।

নথি ঘেঁটে দেখা যায়, কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছে মহিদুল ইসলাম দাউদের স্বাক্ষর।

যদিও মালিকানার বিষয় অস্বীকার করে দাউদ বলেন, “আমি তো কোনো বাস কোম্পানির মালিক না।” কোম্পানির সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, ‘সেলিম ভাই’ তাকে সহযোগিতা চাইতে বলেছেন বলে কিছুটা যুক্ত হয়েছেন।

তবে এ বক্তব্যের সত্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয় সরকারি দপ্তরে জমা দেয়া চিত্রা পরিবহনের নথিপত্র দেখে। যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তরে কোম্পানির মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশনর রেজিস্ট্রেশনে দাউদের নাম, স্বাক্ষর ও পদবি পরিষ্কারভাবে উল্লিখিত। এমনকি রুট পারমিটের আবেদনটিও তার নামে করা।

এদিকে মূল উদ্যোক্তা হিসেবে উঠে আসছে জনৈক সেলিম সরদারের নাম। তিনি বলেন, বর্তমানে অন্য কোম্পানির অধীনে থাকা ৯টি বাস চিত্রা পরিবহনের নামে চালানো হবে, আর বাকিগুলো নতুন করে কেনা হবে।

শিক্ষার্থীদের কোম্পানির পরিচালক বানানো নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, “ব্যবসা করবে, নতুন গাড়ি কিনবে—এমন কথা বলেই যুক্ত হয়েছে।”

শিক্ষার্থীদের আর্থিক উৎস কিংবা বিনিয়োগের বিষয় নিয়ে জানতে চাওয়া হলে সেলিম সরদার এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা জানান।

এই “ব্যবসা” কাদের টাকায়, কার পরিকল্পনায় এবং কোন রাজনৈতিক প্রভাবশালী ছত্রছায়ায় হচ্ছে— তার উত্তর এখনও অস্পষ্ট। আন্দোলন করা সাধারণ শিক্ষার্থীরা কীভাবে এমন অসাধারণ হয়ে উঠলেন, কীভাবে তারা শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগের বাণিজ্যিক পরিবহন খাতে ঢুকে পড়ছেন, এটা অবাক করা বিষয়। প্রশ্ন উঠছে—এই রূপান্তরের পেছনে কোনো গোপন আর্থিক বা রাজনৈতিক শক্তি কাজ করছে কি না? আন্দোলনই কি ছিল তাদের বিপুল অর্থবিত্তের উৎস?

সরকারি দপ্তরগুলোতেও গুঞ্জন রয়েছে, কিছু উপদেষ্টার নাম ব্যবহার করে চিত্রা পরিবহনের পক্ষে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

আদর্শিক অবস্থানকে পুঁজি করেই যদি বাণিজ্যিক বাস কোম্পানির জন্ম হয়, তাহলে জনমনে প্রশ্ন উঠবেই—এটি কি ছাত্র রাজনীতির নতুন রূপ, না কি আদর্শের নামে ধান্দাবাজি?

Visited 280 times, 1 visit(s) today